রাজাকারের মা

আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২০:১১

ফিরোজা বেগমের স্বামী করীম শেখ একজন দিনমজুর ছিলেন। মানুষের জমিতে হাল চাষ করতেন। কখনো কখনো রাজমিস্ত্রির যোগালির কাজও করতেন। এছাড়া মানুষের গাছ থেকে ডাব-সুপারিও পেড়ে দিতেন। তাদের অবস্থা সব সময় এরকম খারাপ ছিল না। এক সময় তাদের বাড়িঘর এবং কয়েক বিঘা জমি ছিল। জমিতে যে ফসল হতো তাতে সারা বছরের খোরাকি হয়ে যেত। কিছু বিক্রি করা হতো। মোটামুটি ভালোই দিন কাটছিল করীম শেখের। কিন্ু্ত একদিন সর্বনাশা পদ্মা নদীর ভাঙনে বাড়িঘর জমিজমা সব বিলীন হয়ে যায়। কিছুদিন খোলা আকাশের নিচে রাত কাটান। সহায়-সম্বলহীন করীম শেখকে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নিতাই রায় চৌধুরী তার জমিতে ঘর তুলে দেন। বছর দুয়েক থেকে তারা এখানেই বসবাস করছেন। তাদের বারো বছরের একটি ছেলে আছে। নাম জাভেদ শেখ। মাদ্রাসায় পড়ে। মাদ্রাসায় পড়তে খরচ লাগে না। বই-খাতা মাদ্রাসা থেকেই দেয়া হয়। শুধু বছরে দু-একবার জামা কাপড় কিনে দিতে হয়। অনেক সময় তারও দরকার হয় না। বিত্তবান প্রতিবেশীরা তাদের পুরানো পোশাক ওদের দিয়ে থাকেন। করীম শেখ বছরে দ-একবার নিজের জন্য লুঙ্গি-গামছা কেনেন। ফজল ব্যাপারী তাকে বছরখানেক আগে একটা সাদা পাঞ্জাবি, একটা টুপি ও একটা কালো ওয়েস্টকোট দিয়েছিলেন। সারা বছর সেগুলো ঘরের বেড়ায় ঝোলানো থাকে। মিলাদ বা ওয়াজ মাহফিলে যেতে হলে সেগুলো পরা। ওয়েস্টকোটকে গ্রামের মানুষ ‘ছিদ্বিয়া’ বলে। মৌলবী সাহেবরা তাদের জামার উপর এটা পরে থাকেন।

বছরের বেশিরভাগ সময় করীম শেখ লুঙ্গি এবং গামছা পরেন। খালি গায়ে থাকার ফলে তার রং রোদে পুড়ে তামাটে হয়ে গেছে। ফিরোজা বেগমকে দুটো শাড়ি কিনে দিতেই হয়। কিছু শাড়ী ফিরোজা বেগম প্রতিবেশীদের কাছ থেকে জাকাত হিসাবেও পেয়ে থাকেন।

তাদের দিন ভালোই কাটছে। একদিন ফিরোজা বেগম গিয়েছেন প্রতিবেশীর বাড়িতে গল্প করতে। ছেলে জাভেদ শেখ মাদ্রাসায়। করীম শেখ নিতাই বাবুর গাছে উঠেছিলেন নারিকেল পাড়তে। হঠাত্ পা পিছলে গাছ থেকে পড়ে যান। তার ঘাড় ভেঙে যায়। এবং সঙ্গে সঙ্গেই মৃত্যু। খবর পেয়ে ছুটে আসেন ফিরোজা বেগম ও জাভেদ। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ হয়ে গেছে। মসজিদের পাশে  কবরস্থানে করীম শেখকে কবর দেয়া হয়।

ফিরোজা বেগমের সুখের দিন শেষ হয়ে গেছে। প্রতিবেশীদের বাড়িতে ছুটা কাজ নেন। তাদের ঢেঁকিতে ধান ভানেন, উঠোনে ধান শুকান। প্রয়োজনে রান্নার কাজও করেন। বিনিময়ে কিছু টাকা এবং এক বেলা খাবার পান। সেই ভাত গামছায় বেঁধে বাড়ি নিয়ে আসেন। মা ছেলে দুজনে একসঙ্গে খান। তাদের দেখে মনে হয় না তারা খুব কষ্টে আছেন। যারা ভালো থাকতে চায় তারা যে কোনো অবস্থাকে মেনে  নেয়। বছর একের পর এক গড়িয়ে যায়। ফিরোজা বেগমের একমাত্র ভরসা তার সন্তান জাভেদ শেখ। সামনের পরীক্ষায় পাশ দিলেই সে মসজিদের ইমামতির কাজটা পাবে। তখন তাদের আর কোনো কষ্ট থাকবে  না।

জাভেদ শেখ যখন মাদ্রাসার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হয়, ফিরোজা বেগম মুগ্ধ দৃষ্টিতে ছেলেকে দেখেন। উন্নত মাথা, চওড়া বুক, বিশালদেহী ছেলে কবে যে বড়ো হয়েছে টের পান না তিনি। মুখে চাপ দাড়ি। ফিরোজার মনে পড়ে করীম শেখের কথা। একদিন সেও তার পুত্রের মতো দেখতে এমন সুন্দর ছিল। জাভেদের মতোই গুরু গম্ভীর। কথা বলত কম। কিন্তু হাসলে খুব সুন্দর লাগত। সুপুরুষ ছিল। কিন্ত সেটা বেশি দিন স্থায়ী ছিল না। দারিদ্র্যের নির্মম কষাঘাতে তার স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে। তারপর হয়েছিল মরণব্যাধি ম্যালেরিয়া। অল্প কয় বছরে তার বয়স অনেক বেড়ে যায়। অকালে বুড়ো হয়ে পড়ে।

একদিন বিকেলে জাভেদ শেখ বাজারে যায় লবণ আর কেরোসিন তেল কিনতে। যাবার সময় মা বার বার বলেছিলেন, বাবা সাবধানে যাস। শুনেছি ঢাকায় গোলমাল হইতাছে। সৈন্যরা পাখির লাহান গুলি কইরা মানুষ মারতাছে।

বাজারে ঢুকতেই জাভেদ দেখতে পায় মানুষ ছুটাছুটি করছে। দৌড়ে পালাচ্ছে। দোকান লুটপাট হচ্ছে, ভাঙচুর হচ্ছে। কয়েকটি দোকান আগুনে পুড়ছে। কয়েকজন খাকি পোশাক পরা মানুষ গুলি ছুড়তে ছুড়তে এগুচ্ছে। জাভেদ বুঝতে পারছিল না কী করবে। সে দূরে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে। এমন সময় কোথা থেকে ছুটে এলো তার সহপাঠী শফিক। সে জাভেদের হাত ধরে বলল, চল আমরাও কিছু লুঠ করি। জাভেদ কিছু বলার আগেই শফিক তাকে টেনে নিয়ে চলল। তারা ভিড়ের ভিতর ঢুকে পড়ল। শফিক হাতের কাছে যা পায় তাই নিতে লাগল। তার লুঙ্গির কোঁচা ভরে গেছে। জাভেদ নিল একটা ক্যামেরা আর একটা টেবিলঘড়ি। দোকান থেকে বেরিয়ে দেখতে পেল সৈন্যরা তখনো দোকানে আগুন দিচ্ছে আর এলোপাথাড়ি গুলি ছুড়ছে। জাভেদ আর শফিক পালিয়ে কোনো রকমে প্রাণ বাঁচাল।

জাভেদ ক্যামেরা আর টেবিলঘড়িটা নিয়ে ঘরে ঢুকতেই মায়ের সামনে পড়ল। সে সেগুলো লুকাবার চেষ্টা করল। মা বললেন, তোর হাতে এগুলো কী? কোথায় পাইছিস? লবণ আর কেরোসিন তেল কই? জাভেদ বলল, লবণ আর তেল আনতে পারি নাই। মিলিটারিরা দোকান ভাঙচুর করছে। লুঠপাট করছে, দোকানে আগুন দিছে, মানুষ যে যা পারে লুঠপাট করছে। মা তাকে বাধা দিয়ে বললেন, আর তুইও লুঠপাটে যোগ দিয়েছিস? জাভেদ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। মা বললেন, এগুলো লুঠপাটের মাল। আমার ঘরে ঢুকাতে পারবি না। যেখান থেকে আনছস সেখানে ফেরত দিয়ে আয়। জাভেদ বলল, সেখানে যাওন যাইবো না। মিলিটারিরা গুলি ছুড়ছে। মা বললেন, তাহলে বাইরে কোথাও ফেলে দিয়ে আয়। জাভেদ কখনো মায়ের কথার অবাধ্য হয়নি, আজো হতে পারল না। তখন সন্ধ্যা  হয়ে গেছে। সে ক্যামেরা আর টেবিলঘড়িটা একটা থলিতে বেঁধে বাগানে লুকিয়ে রাখল।

প্রতিদিন একবার করে জাভেদ লুকিয়ে লুকিয়ে জিনিসগুলো দেখে আসে। ওদের উপর তার মায়া পড়ে গেছে।  ফেলে দিতে পারছে না, আবার মায়ের ভয়ে ঘরেও আনতে পারে না।

একদিন বন্ধু শফিকের কাছে তার সমস্যার কথা বলল। শফিক বলল, কোনো সমস্যা নাই। ঘড়ি আর ক্যামেরা আমার কাছে দে। খালার মাথা ঠান্ডা হইলে নিয়া আসবি।

প্রতিদিন সকালে জাভেদ ভাত খেয়ে মাদ্রাসায় যাবার নাম করে ঘর থেকে বের হয়। আর ফেরে সন্ধ্যায়। সারাদিন শফিকের সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়। কোনো দোকান বা বাড়িঘর ভাঙচুর কংবা লুঠপাট হতে দেখলে তারাও অংশ নেয়। জাভেদের লুণ্ঠিত দ্রব্যগুলো শফিকের কাছে গচ্ছিত থাকে। ঘরে নেয়া যাবে না।

একদিন হঠাত্ বলা নেই কওয়া নেই। জাভেদ উধাও। মা অনেক খোঁজাখুঁজি করলেন। সে কোথায় গেছে কেউ বলতে পারে না। অনেকে বলল মিলিটারির গুলিতে মারা পড়ছে। মা ঘরে বসে একা একা বিলাপ করে কাঁদে। সদ্য সন্তানহারা মায়ের মতো কান্নার শব্দে পাড়া-প্রতিবেশীদের ঘুম ভেঙে যায়।

চারদিন পর জাভেদ ফিরে এলো। তাকে চিনবার উপায় নেই। পরনে পায়জামা-পাঞ্জাবির পরিবর্তে খাকি পোশাক। কাঁধে বন্দুক। মা পুলিশ ভেবে ভয় পেয়ে গেলেন। জাভেদ হো হো করে হেসে উঠে বলল, মা ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি জাভেদ। তোমার ছেলে জাভেদ শেখ। মা বললেন, তোর গায়ে পুলিশের পোশাক কেন? জাভেদ বলে, মা আমি রাজাকারের দলে ভর্তি হয়েছি। মা বললেন, রাজাকার সেটা আবার কী? জাভেদ বলে, এটা এক ধরনের পুলিশের চাকরি। দেশে এখন মুক্তিযোদ্ধা ও হিন্দুদের সাথে সরকারের যুদ্ধ চলতাছে। ওরা পাকিস্তানকে ধ্বংস করতে চায়, ইসলামকেও ধ্বংস করতে চায়। পাকিস্তান মুলসমানের দেশ। ওদের বিরুদ্ধে জেহাদ করা মুসলমানদের ফরজ। এই জেহাদে যে মুসলমান মারা যাবে সে হবে শহিদ, বেহেশতের দরজা তার জন্য খোলা। তাই সরকার ইসলামকে রক্ষা করার জন্য রাজাকারের দল গঠন করেছে। মা বলেন, তোর অত লম্বা লম্বা কথা বুঝি না। চাকরি করলে বেতন দিবে তো? জাভেদ উত্সাহের সঙ্গে বলে, শুধু বেতন নয়, লুঠপাটের মালের ভাগ আমরাও পাব। মা চোখ কপালে তুলে বললেন, এই কইলি চাকরি করিস, তয় আবার লুঠপাট করবি কেন? কার বাড়িঘর লুঠপাট করবি? জাভেদ বলে, হিন্দু আর মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়িঘর। এই কামে আমরা পাকিস্তানিদের দেখাইয়া দিই। মা বললেন, মানুষের বাড়িঘর লুঠপাটে কাম নাই। লুঠপাট ছাড়া যদি পুলিশের চাকরি করতে পার তো কর। নইলে চাকরি ছেড়ে দাও। হারাম পয়সা আমার ঘরে ঢুকাতে দিমু না। পরের জিনিস কখনো আমার ঘরে আনবা না।

মায়ের বোকামিতে জাভেদের মন খারাপ হয়ে যায়। এটা যে একটা পবিত্র কাজ একথাটা মাকে কিছুতেই বোঝানো যায় না। মায়ের বিরুদ্ধে তার ক্ষোভ জেগে ওঠে। একদিন গভীর রাতে অনেক টাকা-পয়সা, গয়না আর জিনিসপত্র নিয়ে জাভেদ বাড়িতে আসে। ওগুলো দেখেই মা চিত্কার শুরু করেন, ওই হারামের জিনিস আমার ঘরে ঢুকাবি না। আমরা না খাইয়া মরুম সেটাও ভালো। দোজখি হইতে পারুম না। জাভেদ মাকে বোঝানোর চেষ্টা করে, মা এগুলো হারাম জিনিস না। এগুলো গনিমতের মাল। ইমাম সাব বলছেন, গনিমতের মালের উপর মুসলমানদের হক আছে। মা বলেন, গনিমতের মাল, সেটা আবার কী? জাভেদ বলে, যুদ্ধে পরাজিত শত্রুর মাল হলো গনিমতের মাল। হিন্দুরা বিধর্মী, আমাদের শত্রু। এগুলো হিন্দুবাড়ির মাল। মা বলেন, হিন্দুরা আমাদের শত্রু হইলো কবে? তাদের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধই বা শুরু হইলো কবে? নদী ভাঙনের পর নিতাই বাবু আমাদের দুই বিঘা জমি আর এই বাড়িঘর করে না দিলে আমরা থাকতাম কই? কোনো মুসলমান তো আমাদের সাহায্যে আসে নাই? যারা বিপদের দিনে আমাদের সাহায্য করেছে তুই তাদের বলিস শত্রু?

সারারাত মায়ে আর ছেলের ঝগড়া হয়। জাভেদ জিনিসপত্রগুলো তার ঘরে নিয়ে তালা দিয়ে রাখল। পর দিন জাভেদ শফিককে বলে, মা কিছুতেই গনিমতের মাল ঘরে রাখতে চাচ্ছে না। তার মতো একরোখা মানুষ আমি জীবনে দেখিনি। সব শুনে শফিক জাভেদকে বলে, বুড়িরে মাইরা ফ্যাল। সব ল্যাঠা চুকে যাবে। জাভেদ বিস্ময়ের সঙ্গে বলে, তুই কি মানুষ, না জানোয়ার? আমাকে বলছিস আমার মাকে খুন করতে! শফিক বলে, আমার মা এরকম করলে আমি তাকে খুন করতাম।

শফিকের কথা শুনে জাভেদের মন খারাপ হয়ে যায়। এই মা কত কষ্টে, কত আদর-যত্ন করে তাকে মানুষ করেছে। ছোটোবেলা থেকে মাকে ছেড়ে থাকার কথা কখনো কল্পনা করেনি। বাবার মৃত্যুর পর মা আর শাদি করেনি। কত ভালো ভালো প্রস্তাব এসেছে। সব মা ফিরিয়ে দিয়েছে। জাভেদের অযত্ন হবে ভেবে তিনি সারা জীবন বিধবা হয়ে কাটিয়েছেন।

জাভেদ দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগতে থাকে। একদিকে মায়ের কঠোর নির্দেশ, অপরদিকে লুণ্ঠিত দ্রব্যাদির প্রতি তার দুর্বার আকর্ষণ। মায়ের স্নেহ-মমতার কথা সে ভুলতে পারে না। শেষ পর্যন্ত লোভের কাছেই সে হার মানে। প্রতিদিন মায়ের সঙ্গে তার খিটমিট লেগেই থাকে। তার হাতে গড়া জাভেদ কখনো এরকম হবে, ফিরোজা বেগম ভাবতেই পারেননি। ছেলের দুর্ব্যবহারে মা খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দেন।

একদিন বিকেলে জাভেদ একটি মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করে। তার ‘পরনে ঢাকাই শাড়ি কপালে সিঁদুর’। ফিরোজা বেগম উঠানে বসে একটি ধারালো দা দিয়ে নারিকেল ছিলছিলেন। হাতের কাজ বন্ধ করে মা অবাক হয়ে বললেন, তুই কাকে ধরে এনেছিস? এই মেয়ে কে? জাভেদ পরিস্থিতির জন্যে প্রস্তুত হয়েই এসেছিল। সে দৃঢ় কণ্ঠে বলল, এ হিন্দু-মেয়ে বিধর্মী। গনিমতের মাল। একে আমি বিয়ে করব। একে বিয়ে করা জায়েজ আছে। ইমাম সাব মসজিদে বলেছেন, এক কালে মুসলমানারা বিধর্মীদের পরাজিত করে তাদের অন্যান্য মালের সাথে মেয়েদেরও ঘরে নিয়ে আসতেন। এতে কোনো গুনাহ নাই। এই মেয়ে গনিমতের মাল। আমি একে বিয়ে করবো।

মেয়েটি  ভাবলেশহীনভাবে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। ভীরু হরিণীর মতো তার পটলচেরা কালো দুটি চোখ অসহায় দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। মা ছেলের সঙ্গে তর্কে না গিয়ে কঠোর কণ্ঠে হুকুম দিলেন, তুই এই মেয়েকে এক্ষুনি এখান থেকে নিয়ে যা, যেখান থেকে নিয়ে এসেছিস সেখানে দিয়ে আয়। জাভেদ উদ্ধতভাবে বলল, আমি তোমার কথা অনেক শুনেছি, আর শুনব না। তার চোখ দুটো হিংস্র, ভীষণ লাল। সে বলল, আমি এই মেয়েকে বিয়ে করবোই। দরকার হলে তোমাকে আমি খুন করবো। বলেই সে মায়ের দিকে বন্দুক তাক করল। মা একটুও ভয় না পেয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, তুই এই মেয়েকে দিয়ে আয়। জাভেদ বলল, না। ফিরোজা বেগম মুহূর্তমাত্র দেরি না করে তার হাতে থাকা ধারালো দা দিয়ে ছেলের মাথায় আঘাত করলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে মুর্ছিত হয়ে পড়লেন।

পাশাপাশি মা-ছেলের দেহ মাটিতে পড়ে রইল। ডাবগাছের পাতার ফাঁক দিয়ে বিদায়ী সূর্যের আলোর ছটা এসে পড়েছে মা ও ছেলের মুখে। এ ঘটনার পর থেকে গ্রামের মানুষ ফিরোজা বেগমকে রাজাকারের মা বলে ডাকে। তার অপূর্ব আত্মত্যাগের কথা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।

দেশ স্বাধীন হবার পর সরকার ফিরোজা বেগমকে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়। দেশের জন্য তিনি নিজ সন্তানকে হত্যা করেছেন—এজন্যে একটি বড়ো অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়। অনেক বক্তা তার দেশপ্রেমের ভূয়সী প্রশংসা করে। মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদা পেয়ে ফিরোজা বেগম নিজেও খুশি হন। কিন্তু তার দুঃখ, ‘রাজাকারের মা’ দুর্নামটি লোকের মুখে রয়েই গেল। সন্তান হত্যার কষ্ট তার পদবি পাওয়ার সব আননন্দকে ম্লান করে দেয়।