জন্মগ্রহণের পর মায়ের কোলে পারিবারিক ও পারিপার্শ্বিক পরিমণ্ডল এবং আত্মীয়-স্বজনদের সান্নিধ্য সংশ্লিষ্টতায় শিশুর মুখে প্রথমে যে কথা ফুটে ওঠে সেটাই তার মাতৃভাষা অর্থাত্ মায়ের ভাষা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন জাতির পৃথক পৃথক ভাষা—যা তাদের মাতৃভাষা। এই মাতৃভাষার ভিত্তিতেই রাষ্ট্রভাষার সৃষ্টি। বাংলা ভাষা আমাদের বাংলাদেশের মাতৃভাষা, রাষ্ট্রভাষা।
মাতৃভাষা হলো একটি জাতির সঠিক পরিচয়ের বাহক। আর এর দ্বারাই ঐতিহ্যের সঠিক প্রতিফলন ঘটে। ভাষাই হলো মানুষের ভাব আর অনুভূতির আদান-প্রদান ঘটানোর অন্যতম মাধ্যম। তবে মাতৃভাষার সঠিক চর্চার অভাবে লুপ্ত হতে পারে একটি জাতির মূল কৃষ্টির বুনিয়াদ। আর তার গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য অনুভব করেই মাতৃভাষার প্রতি অবমাননাকারীদের পরিহাস করে কবি আব্দুল হাকিম বঙ্গবাণী কবিতায় উল্লেখ করেছিলেন—
‘যে-সবে বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী
সে-সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।’
প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বে বাংলা ভাষার জন্ম। অনেক বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে এ ভাষা সমৃদ্ধ হয়েছে। পৃথিবীর ৩০ কোটিরও অধিক লোক বাংলা ভাষায় কথা বলে। ফরাসি ভাষার চাইতেও বাংলাভাষী জনগণের সংখ্যা বেশি। পৃথিবীতে অনেক ভাষা আছে। সঠিক কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও ভাষাবিজ্ঞানীদের ধারণা অনুযায়ী এই সংখ্যা সাড়ে ছয় হাজারের মতো হবে। এর মধ্যে কিছু ভাষা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অনেক ভাষা বিলুপ্তির পথে। কারো কারো মতে, বর্তমান বিশ্বে ৬০০০ মাতৃভাষা চালু আছে। এর মধ্যে ১০টি ভাষায় বিশ্বের বেশির ভাগ লোক কথা বলে। পৃথিবীর শীর্ষ দশটি ভাষার মধ্যে জনসংখ্যার নিরিখে বাংলা ভাষার স্থান বর্তমানে পঞ্চম। বাংলা ভাষা শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং বৈজ্ঞানিকভাবেও স্বীকৃত একটি ভাষা। ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক গবেষণা পরিষদের মতে, শ্রুতিমধুর ভাষা হিসেবে পৃথিবীর সব ভাষার মধ্যে বাংলা ভাষাকে প্রথম স্থান দেওয়া যেতে পারে। এমনকি সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী লন্ডনে যেখানে ৩০৭টি ভাষায় মানুষ কথা বলে, সেখানেও বাংলা হচ্ছে দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাষা। জাতিসংঘে বর্তমানে ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিস, রুশ, চীনা ও আরবি দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃত। যেকোনো বিচারে এই ছয় ভাষার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে বাংলা ভাষা জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে। এ ব্যাপারে অবশ্য আমাদের কূটনৈতিক তত্পরতা চলছে। ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘে বাংলা ভাষায় ভাষণ দিয়ে যে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছেন তাতে আমাদের ভাষার মর্যাদা বিশ্ব রাষ্ট্রসভায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এরপর থেকে বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের প্রতি অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দিয়ে আমাদের ভাষার মর্যাদা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। সঙ্গত কারণে আমরা আশান্বিত যে ভবিষ্যতে বাংলাভাষা যথাযোগ্য মর্যাদায় জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করবে।
ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়ায় বহু পূর্ব থেকে বাংলা ভাষার বিস্তৃতি ঘটেছে। এখন আফ্রিকা মহাদেশেও তা ঘটছে। বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১৫ হাজার কিলোমিটার দূরের দেশ আফ্রিকার সিয়েরালিয়ন বাংলা ভাষাকে তাদের অন্যতম সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। শোনা যাচ্ছে, অন্য একটি দেশ গাম্বিয়াও বাংলাকে তাদের অন্যতম দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে গ্রহণ করতে যাচ্ছে। বাংলা ভাষার জন্য বাঙালিদের রয়েছে আত্মত্যাগের মহিমান্বিত এক অনন্য ইতিহাস। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালের চরম মুহূর্ত ও তত্পরবর্তী পর্যায়ে ১৯৫৬ সালে বিজয় অর্জন পর্যন্ত রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে বাংলাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য আত্মত্যাগের আন্দোলন আর পরবর্তী সময়ে এর ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সেই স্বাধীনতা যুদ্ধের রক্তঝরা আলোকিত পটভূমিকায় গড়ে উঠেছে আমাদের ভাষাভিত্তিক স্বাধীনতার ইতিহাস। আর এর বিশেষ গুরুত্ব সম্যক অনুধাবন করেই ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ইউনেস্কো সঙ্গত কারণে যথোপযুক্ত বিবেচনায় ঐতিহাসিক মহান ভাষা আন্দোলন দিবস তথা শহিদ দিবস ৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। বাংলা মায়ের দামাল ছেলেদের রক্তেভেজা একুশ আজ বিশ্বময় মাতৃভাষার অধিকারের স্বীকৃতির প্রতীক। মাতৃভাষা বাংলার সংগ্রামে ভাষা আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক বিজয়ের পর এটা বাঙালি জাতির আর একটি মহত্ বিজয় অর্জন। মে দিবস, নারী দিবস, মানবাধিকার দিবসের মতো বাঙালির ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের শহিদ দিবস বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে জাতিসংঘের অনুমোদনে জগত্বাসীর স্বীকৃতিপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বের মানুষ শহিদ মিনারে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করে। এটা বাঙালির জন্য পরম গৌরবের বিষয়।
এ বাংলা ভাষা তথা মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠার জন্যই দীর্ঘ প্রায় নয় বছর সক্রিয় অংশগ্রহণ করে আন্দোলন করেছি, নির্যাতিত হয়েছি, কারাভোগ করেছি। ভাষা শহিদদের রক্তের বিনিময়ে ভাষা সৈনিকদের ত্যাগের মাধ্যমে বাংলা ভাষার বিজয় অর্জন। ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে আমাদের স্বাধীনতা লাভ। মরণজয়ী ভাষা সংগ্রামের ফলশ্রুতিতে গণ-আন্দোলনের চেতনায় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ। এর মূলে হলো মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষার ভাষা আন্দোলন। তাই ভাষা আন্দোলনের অবদানে প্রতিষ্ঠিত মাতৃভাষা বাংলা আমাদের অহংকার।
লেখক :ভাষাসৈনিক
