মাতৃভাষার জন্য ভালোবাসা

আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২১:৪০

১.এই লেখাটি যেদিন প্রকাশিত হবে সেদিনের তারিখটি হবে ২১ ফেব্রুয়ারি। বাইরের দেশের যেসব মানুষ কখনো আমাদের ২১ ফেব্রুয়ারি দেখেনি তারা যখন প্রথমবার এদেশে এসে এই দিনটি দেখে তারা নিঃসন্দেহে অনেক অবাক হয়ে যায়। আমরা আবেগপ্রবণ জাতি হিসেবে ‘বিখ্যাত’ এবং ২১শে ফেব্রুয়ারিতে আমরা যথেষ্ট তীব্রতা দিয়ে সেই আবেগ প্রকাশ করি। মনে আছে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম তখন ফেব্রুয়ারির ২০ তারিখে কার্জন হলের মালীকে খুবই মলিন মুখে ক্যাম্পাসে হাঁটাহাঁটি করতে দেখতাম। তার কারণ সে বেচারা জানতো এতো যত্ন করে গড়ে তোলা তার বাগানের অসংখ্য ফুল এক রাতের ভেতর উধাও হয়ে শহিদ মিনারের বেদিতে স্থান নেবে। ২১ ফেব্রুয়ারি ভোরে আমরা তখন খালি পায়ে প্রভাত ফেরিতে বের হতাম। শুধু যে শহিদ মিনারের বেদিতে আমরা জুতো পায়ে উঠতাম না তা নয়, পুরো প্রভাত ফেরিতে আমাদের পায়ে জুতো থাকত না। শুধু তাই নয়, পুরো ফেব্রুয়ারি মাস আলকাতরা নিয়ে ছাত্ররা বের হতো ইংরেজি কিংবা উর্দুতে লেখা সাইনবোর্ডের লেখা ঢেকে দেওয়ার জন্য। ফেব্রুয়ারি মাসে সব সংগঠন তাদের নিজের মতো করে শহিদ সংকলন বের করত, সবাই তখন কবি, সবাই শিল্পী! আমি আমার জীবনে যতগুলো ২১ ফেব্রুয়ারি দেখেছি, তার মাঝে সবচেয়ে তীব্রটি ছিল ১৯৭১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিটি। তখনো বঙ্গবন্ধুর ডাক দেওয়া অসহযোগ আন্দোলনটি শুরু হয়নি, ৭ মার্চের ভাষণ দিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণাটিও দেওয়া হয়নি কিন্তু আকাশে বাতাসে তখন কীভাবে কীভাবে যেন আসন্ন স্বাধীনতার ঘোষণার বার্তাটি রটে গিয়েছিল। সেই দিনটিতে শহিদ মিনারে যেভাবে মানুষের ঢল নেমেছিল তার তুলনা পাওয়া কঠিন। সেই মানুষের ঢল দেখেই সম্ভবত পাকিস্তান মিলিটারি ২৫ মার্চের গণহত্যার পরিকল্পনা পাকা করে ফেলেছিল। সে কারণেই সম্ভবত গণহত্যার অংশ হিসেবে তারা সবার আগে শহিদ মিনারটি গুঁড়ো করে ফেলেছিল। ইটপাথরের শহিদ মিনারটি গুঁড়ো করে ফেললেই যে এই দেশের মানুষের বুকের ভেতর বাঁচিয়ে রাখা আসল শহিদ মিনারটি ধ্বংস করা যায় না, মাথা মোটা পাকিস্তান মিলিটারিরা সেটা তখনো জানতো না।

২.

কেউ যদি ২১ ফেব্রুয়ারির তারিখটি বাংলা ক্যালেন্ডারে দেখে, তাহলে দেখবে সেটা হচ্ছে ৮ ফাল্গুন। ১৯৫২ সনের ২১ ফেব্রুয়ারিটিও ছিল ৮ ফাল্গুন। যেহেতু ২১ ফেব্রুয়ারি আমাদের ভাষা আন্দোলনের শহিদ দিবস, একসময়ে অনেকে মনে করতেন দিবসটিকে ইংরেজি ২১ ফেব্রুয়ারি হিসেবে পালন না করে বাংলা ৮ ফাল্গুন হিসেবে পালন করা উচিত। তবে ২১ ফেব্রুয়ারি সারা পৃথিবীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করা শুরু হয়ে যাওয়ার পর আজকাল আর কাউকে সেই দাবিটি করতে দেখি না।

কেউ যেন মনে না করেন যে আমাদের ২১ ফেব্রুয়ারির বাংলা মাসের তারিখটি ঘটনাক্রমে এই বছর ৮ ফাল্গুন হয়ে গেছে। আসলে বাংলাদেশে বাংলা ক্যালেন্ডারে মাসগুলোকে এমনভাবে নেওয়া হয়েছে যেন আমাদের ঐতিহাসিক দিনগুলো প্রতি বছরই আসল বাংলা তারিখের সঙ্গে মিলে যায়। আমরা যারা শহুরে জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, তারা বিশেষ দিন না হলে ক্যালেন্ডারে বাংলা তারিখ নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামাই না। তবে আমার নিজের জন্য বাংলা মাসের একটা অন্য ধরনের গুরুত্ব আছে। আমি ইংরেজি  মাসের নাম শুনে মাসটি কেমন আন্দাজ করতে পারি না। জুন মাস শুধুই জুন মাস, জুলাই শুধুই জুলাই। কিন্তু যদি কোনো মাসের নাম বাংলায় বলা হয় তাহলে সঙ্গে সঙ্গে সেই মাসটি আমি অনুভব করতে পারি। বৈশাখ মানে শুধু কাঠ ফাটা রোদ নয় তার সঙ্গে সঙ্গে আকাশে কোনায় কালো মেঘ, কালবৈশাখী। আষাঢ় কিংবা শ্রাবণ মাসে ঝরঝর করে বৃষ্টি হচ্ছে, অগ্রহায়ণ মাসে শীত আসি আসি করছে। ধান কাটা শুরু হয়েছে, বাতাসে ধান মাড়াইয়ের গন্ধ!

এখানেই শেষ নয়। অনেকেই জানে না, বুঝে হোক না বুঝে হোক সারা পৃথিবীর মানুষ প্রেম-ভালোবাসার জন্য কিন্তু বাংলা মাসকে ব্যবহার করে! ১৪ই ফেব্রুয়ারি হচ্ছে ভ্যালেন্টাইন দিবস, কেউ কী কখনো চিন্তা করে দেখেছে, কেন ১৪ই ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইন কিংবা ভালোবাসা দিবস? তার কারণ এটি হচ্ছে আমাদের বাংলা ক্যালেন্ডারের বসন্ত ঋতুর প্রথম দিন! সারা পৃথিবীই শীতের শেষে বসন্ত কালকে ভালোবাসার কাল বলে ধরে নেওয়া হয়, সেই হিসেবে বসন্তের প্রথম দিনটি ভালোবাসার দিন হিসেবে ধরে নেওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়, কিন্তু সেই বসন্ত ঋতুটি কিন্তু অন্য দেশের নয়, আমাদের বাংলা ক্যালেন্ডারের বসন্ত ঋতু!

শুধু যে প্রেম-ভালোবাসার জন্য বাংলা ক্যালেন্ডার ব্যবহার করা হয় তা নয়, জ্যোতির্বিজ্ঞান করার জন্যও কিন্তু বাংলা ক্যালেন্ডার ব্যবহার করা হয়। গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান নির্দিষ্ট করার জন্য পুরো আকাশটিকে ১২টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, কোন রাশিটি কখন আকাশে উঠবে, সেটি কিন্তু আমাদের বাংলা ক্যালেন্ডার দিয়ে নির্ধারিত। কিংবা উলটোটা—বাংলা ক্যালেন্ডারটিই হয়তো একসময় এই জ্যোতির্বিজ্ঞানিক বিভাজন দিয়ে ঠিক করে নেওয়া হয়েছিল!

৩.

কিছুদিন আগে যখন একটা অনুষ্ঠানে শান্তিনিকেতন গিয়েছিলাম সেখানে আগরতলার একজন বুদ্ধিজীবীও আমাকে ঠিক এই বিষয়টির কথা বলেছিলেন। সেই বিষয়টি হচ্ছে, বাংলা নববর্ষের তারিখ। সবাই নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক বাংলা নববর্ষের তারিখের সঙ্গে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বাংলা নববর্ষ, কিংবা পাহাড়িদের বর্ষবরণের তারিখটি কিন্তু মেলে না। শুধু তাই না, পশ্চিমবঙ্গ কিংবা আগরতলার বাঙালিদের নববর্ষও আমাদের সঙ্গে মেলে না। শান্তিনিকেতনে আগরতলা থেকে আসা সেই বুদ্ধিজীবী ভদ্রলোক আমাকে অনুরোধ করে বলেছিলেন, আমি যেন বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষকে বলি তারা যেন পৃথিবীর সব বাঙালিদের নিয়ে বাংলা নববর্ষটি উদ্যাপন করেন। (স্কুল কলেজের শিক্ষকদের বেতন কিংবা পেনশন আটকে গেলে তারা অনেক সময় আমাকে এসে অনুরোধ করেন, আমি যেন পত্রপত্রিকায় একটু লিখি।  আমি এখন পর্যন্ত কাউকেই বোঝাতে পারিনি পত্রপত্রিকার লেখালেখি কেউ পড়ে না, পড়লেও সেটাকে কোনো গুরুত্ব দেয় না।) তবে বাংলা নববর্ষ নিয়ে পৃথিবীর বাঙালিদের মাঝে এই বিভাজনটি কিন্তু সত্যি সত্যি একটি হূদয়বিদারক ব্যাপার।

আমি যে বিষয়টি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের সাথে একেবারে কথা বলিনি তা নয়। তারা আমাকে বুঝিয়েছেন বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের অনেক বড় বড় বিশেষজ্ঞদের নিয়ে অনেক আলাপ আলোচনা করে এই তারিখটি নির্ধারণ করা হয়েছে। এই তারিখটি অনেক বিজ্ঞানসম্মত এবং এটাই সঠিক তারিখ। তারিখটি যতই বিজ্ঞান সম্মত হোক না কেন যদি সবাই এটা মেনে না নেয়, তাহলে সেটি তো আমাদের সত্যিকার উদ্দেশ্যটি বাস্তবায়ন করতে পারল না।

একটি ক্যালেন্ডারের একমাত্র বিজ্ঞান হচ্ছে, পৃথিবীর তার কক্ষপথে পুরো সূর্যটা ঘুরে আসতে ৩৬৫.২৪২২ দিন সময় নেয়। সংখ্যাটি যেহেতু অখণ্ড ৩৬৫ নয় তাই চার বছর পরপর একটা লিপইয়ার দিয়ে একটি দিন বাড়াতে হয়। সেটা আবার একটুখানি বেশি হয়ে যায়, তাই ১০০ বছর পরপর লিপইয়ার ছাড়া একটি বছর পালন করতে হয়। সেটাও পুরোপুরি নিখুত নয়, তাই ৪০০ বছর পরপর আবার একটা লিপইয়ার দিয়ে সেটা ঠিক করতে  হয়।

কেউ যদি এই নিয়মটা মেনে একটি ক্যালেন্ডার তৈরি করে, তাহলে আগামী কয়েক হাজার বছর ক্যালেন্ডারটি কাজ করে যাবে! অর্থাত্ ধীরে ধীরে বৈশাখ মাসে হাড় কাঁপানো শীত চলে আসবে না এবং কোনো এক সময় মাঘ মাসে কাঠ ফাটা রোদে কাউকে সিদ্ধ হতে হবে না। (এ ধরনের একটা ত্রুটি শোধরানোর জন্য পোপের নির্দেশে একবার ক্যালেন্ডার থেকে পুরো ১০ দিন উধাও করে দেওয়া হয়েছিল!)

যা-ই হোক আমি মনে করি একটা ক্যালেন্ডারের একমাত্র বৈজ্ঞানিক বিষয়টি ঠিক রেখে, বাংলাদেশের যতগুলো গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক তারিখ রয়েছে, তার ভেতর যতগুলো সম্ভব সেগুলো অক্ষুণ্ন রেখে পৃথিবীর সব বাঙালিদের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নববর্ষ পালন করা উচিত; যেন নববর্ষ নিয়ে কখনো কোনো বাঙালির আর মন খারাপ না হয়।

৪.

২১ ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনের কথা বলার সময় আমরা অনেক সময়েই বলে থাকি যে, শুধু আমরাই ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছি। কথাটি পুরোপুরি সত্যি নয়। যখন কোনো জাতিকে পদানত করতে হয় তখন প্রথম আঘাতটি করা হয় ভাষার ওপর, তাই ইতিহাসে ভাষার ওপর আঘাতের এবং তার প্রতিরোধের অনেক উদাহরণ আছে। আমার মনে হয় ভাষা নিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে হূদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছিল ১৯৭৬ সনের ১৬ জুন সাউথ আফ্রিকায়। সেখানে প্রায় ২০ হাজার কালো ছাত্রছাত্রীদের ভাষা আন্দোলনে শ্বেতাঙ্গ  পুলিশ গুলি করে অসংখ্য স্কুল ছাত্রকে মেরে ফেলেছিল। সরকারি হিসেবে মৃতের সংখ্যা ১৭৬, বেসরকারি হিসেব ৭০০ থেকে বেশি।

আমাদের বাংলা ভাষার জন্যও কিন্তু শুধু আমরা রক্ত দিইনি। আসামে শুধু অহমিয়া ভাষাকে দাপ্তরিক ভাষা করার প্রতিবাদে বাঙালিদের আন্দোলনে ১৯৬১ সালের ১৯ মে পুলিশের গুলিতে ১১ জন মারা গিয়েছিল। তার মাঝে একজন ছিল ১৬ বছরের কিশোরী কমলা। মাত্র ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দিয়ে এসে বড়ো বোনের শাড়িটি পরে আন্দোলনে অংশ নিতে এসে গুলি খেয়ে সে শহিদ হয়েছিল।

আমরা যখন একবার আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম তখন সেই ১১ জন ভাষা শহিদের স্মৃতিতে তৈরি করা শহিদ মিনারটিতে ফুল দিতে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে আমার একটু কষ্ট লেগেছিল, আমরা যেভাবে আমাদের ভাষা শহিদদের স্মরণ করতে পারি, তারা সেখানে সেভাবে পারে না। এমন কী তাদের শহিদ মিনারটিও তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের ভেতরে করার অনুমতি পায়নি, বাইরে করতে হয়েছে।

২১ ফেব্রুয়ারিতে পৃথিবীর সব ভাষা শহিদদের আমি গভীর ভালোবাসা নিয়ে স্মরণ করি। পৃথিবীর সবাই যেন তার নিজের ভাষায় কথা বলতে পারে, শিখতে পারে, গান গাইতে পারে, ভালোবাসতে পারে এমনকি মান-অভিমান করতে পারে। মাতৃভাষা তো শুধু আমার ভাষা নয়, এটি আমার আরো একজন মা!

n লেখক :শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক