সংস্কৃতি

ভালোলাগার ভাষা

আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২১:৪২

ফুলের সুবাস যেমন চিনিয়ে দেয় কোনটি কোন ফুল, তেমনি আঞ্চলিক ভাষার আঞ্চলিকতার সুরভি চিনিয়ে দেয় সেটি কোন অঞ্চলের কথ্য ভাষা। অর্থাত্ ভাষা দিয়ে চেনা যায় ব্যবহারকারী কোন এলাকার লোক। আমাদের মাতৃভাষা বাংলার রয়েছে বহু আঞ্চলিক রূপ। বলতে গেলে দেশের প্রত্যেক জেলার ভাষায় রয়েছে নিজস্ব আঞ্চলিক টান, সুর ও লয়ের ব্যঞ্জনা, আছে নিজস্ব আঞ্চলিক শব্দ। ঐ শব্দ ভাণ্ডার এতই সমৃদ্ধ যে তা নিয়ে আমরা অহংকার করতে পারি। আঞ্চলিক শব্দাবলি মূল বাংলাভাষাকে করেছে সমৃদ্ধ, বলায়-শোনায় এনেছে মাধুর্যময় বাকচাতুর্য। আসলে আঞ্চলিক ভাষা মূল ভাষাকে খাটো করে না, করে প্রাণবন্ত, দান করে লালিত্যময় সৌন্দর্য।

আঞ্চলিক বাংলা নিয়ে আমার এত উচ্ছ্বাসের অনেক কারণের মধ্যে অন্যতম একটি কারণ সম্প্রতি প্রচারিত একটি টেলিভিশন বিজ্ঞাপন। ঐ বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে শ্রোতাদের সারা বাংলাদেশকে, বাংলাদেশের বাংলা ভাষার আঞ্চলিক রূপকে শোনার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। ওতে আমরা শুনছি ময়মনসিংহ, সিলেট, চট্টগ্রাম, বরিশাল, রাজশাহী, যশোরের বিশুদ্ধ উচ্চারণে আঞ্চলিক সংলাপ। বক্তারা সবাই তাঁদের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে অত্যন্ত গৌরবান্বিত—তা তাঁদের চেহারা এবং বলার ভঙ্গিমায় ফুটে উঠেছে—কোনো জড়তা ছাড়াই অবলীলায় বলে যাচ্ছেন সংলাপ।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘বাঙ্গালা ভাষা’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘প্রায় সকল দেশেই লিখিত ভাষা এবং কথিত ভাষায় অনেক প্রভেদ।...বাঙ্গালার লিখিত এবং কথিত ভাষার যতটা প্রভেদ দেখা যায়, অন্যত্র তত নহে।’ সংস্কৃত সাধু ভাষার দাপটে বাঙ্গলা সাহিত্য যখন ‘অত্যন্ত নীরস, শ্রীহীন, দুর্বল এবং বাঙ্গলা সমাজে অপরিচিত হইয়া রহিল’ তখন ‘আলালের ঘরের দুলাল’কে তিনি স্বাগত না জানিয়ে পারলেন না। তাঁর উপলব্ধি হলো—‘সেই দিন হইতে বাঙ্গালা ভাষার শ্রীবৃদ্ধি। সেই দিন হইতে শুষ্ক তরুর মূলে জীবনবারি নিষিক্ত হইল।’

এ দিক দিয়ে আমাদের মরমি কবিরা অনেক এগিয়ে। তাঁরা নিজস্ব অঞ্চলের শব্দাবলি ব্যবহার করে এমন সাহিত্য সৃষ্টি করলেন যার আবেদন চিরন্তন। লালন, হাছন, সীতালং হালের শাহ আবদুল করিম; আমাদের ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, জারি, সারিতে ব্যবহূত শব্দাবলি নিয়ে আমরা অহংবোধ করি।

তবে সর্বক্ষেত্রে এক মন্তব্য অচল। প্রমিত বাংলার কাজ যেমন আঞ্চলিক বাংলা দিয়ে চলে না—তেমনি আঞ্চলিক বাংলা দিয়েও প্রমিত বাংলার কাজ সিদ্ধ হয় না। ক্ষেত্রবিশেষে অবশ্যই হেরফের হবে এবং বোধগম্যতাই এগিয়ে যাবে। কারণ মানুষের মন সহজ এবং সুন্দরের পূজারি।