/ ব্রত রায়
কাঁটাবনের সিগন্যাল থেকে বাসটা যখন নড়ে উঠল তখন আমার মনে পড়ল কন্ডাক্টর বাকি পয়সা ফেরত দেয়নি। কই গেছে লোকটা? সামনের দিকে নেই, আমি ঘাড় ঘুরিয়ে পেছন দিকে তাকালাম। শেষ রোয়ের সিটের কাছে এক যাত্রীর সঙ্গে তর্ক করছে। আমি ডাকলাম, ‘মামা, টাকা দিলা না যে?’
কন্ডাক্টর বলল, ‘আইতাছি মামা।’ বাসটা আজিজ সুপারের সামনে জ্যামে দাঁড়াল। আমি সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। হেল্পার ডাকছে, ‘শাহবাগ গেটে আসেন! শাহবাগ! মোড়ে গেট বন্ধ থাকব, নামা যাইব না।’ নতুন নিয়ম হয়েছে নির্দিষ্ট জায়গা ছাড়া বাসে যাত্রী ওঠানামা করা নিষিদ্ধ। ফাইন করে দেয় পুলিশ। নিয়মটা ভালো, তবে সুযোগ পেলেই ভাঙছে লোকজন।
সামনের দিকের সিট থেকে আরও এক তরুণী উঠে দাঁড়াল, ‘মামা দশ টাকা পাব আমি!’ এও নামবে।
আমি গেটের দিকে এগোচ্ছি। কন্ডাক্টর এসেছে। তার কাছে ভাঙতি নেই। হাতে সব কুড়ি, পঞ্চাশ, একশো টাকার নোট। বড়লোক কন্ডাক্টর। আমি পাদানিতে নেমেছি। সে বলল, ‘মামা, বিশ টাকা দিতাছি! আপনারা দুই ভাইবইনে ভাগ কইরা নিয়েন!’
আমি বললাম, ‘মানে?’
সে এক গাল হেসে বলল, ‘আমি যদি দুইজনেরই মামা হই তাইলে আপনেরা তো ভাইবইনই? আপন না হন, খালাতও হইতে পারেন!’
আমি হেসে ফেললাম! ‘অন্যকিছুও হতে পারি’—জবাবটা মাথায় এসেছিল কিন্তু মেয়েটির ভ্রু কোঁচকানো দেখে আর মুখে আনলাম না। অনেকেই বলে আমার ব্যক্তিত্ব কম। হাসার কথায় হাসি, রাগের কথায় রাগি। এইদেশে ব্যক্তিত্ব মানে হচ্ছে ভ্রু কুঁচকে থাকা, অল্প কথা বলা এবং একেবারে না হাসা। হাস্যরস ব্যক্তিত্বের প্রবল অন্তরায়!
কুড়ি টাকার ময়লা নোটটি নিয়ে রাস্তায় নেমে এলাম। পেছনে আমার খালাত বোন বা অন্যকিছু। কুড়ি টাকার বন্ধনে আমরা বাঁধা পড়েছি। এ বাঁধন কখনো যাবে না ছিঁড়ে...
আমি ঘুরে তাকিয়ে বললাম, ‘আপনি কোনদিকে যাবেন?’ খালাত বোন বলল, ‘কেন?’ আরে কি মুশকিল! এ দেখি চরম...! বললাম, ‘না, যদি পরীবাগের দিকে যান তাহলে এখানেই ভাঙানোর ব্যবস্থা করতে হবে আর ভার্সিটির দিকে গেলে রাস্তা পার হয়ে ওপারে চেষ্টা করতে পারি।’
তার মুখের রেখা কিছুটা সহজ হলো। আমরা রাস্তা পার হলাম।
এপাড়ে হকার থাকে, চা-ওলা থাকে। আজ কেউ নেই। একজন সিগারেট বিক্রি করছিল। তাকে বললাম, ‘মামা দুইটা দশ হবে? প্লিজ থাকলে দেন।’ নর্মালি লোকজন ভাঙতি দিতে চায় না। হাত দেখায়। এ দেখলাম পকেটে হাত দিল। কিন্তু দশ টাকার নোট আছে একটাই।
মেয়েটি বলল, ‘আপনি স্মোকার না?’
‘না।’
‘ইস! মাঝেমাঝে খেলে কী হয়?’
আমি বললাম, ‘আপনি সিগারেট খান?’
‘অফকোর্স নট।’
আমি বললাম, ‘মাঝেমাঝে খেলে কী হয়?’
চোখের দৃষ্টি হেনে পুরাকালে মানুষকে ভস্ম করে দেওয়া যেত শুনেছি। ভাগ্যিস এটা পুরাকাল নয়। তাহলেই আমি গেছিলাম! মেয়েটির চোখে পাওয়ার গ্লাস। এটাও বোধ হয় চোখের আগুনের প্রটেক্টর হিসেবে কাজ করছে। অবশ্য উল্টোও হতে পারে। আগুনের রেগুলোকে কনসেন্ট্রেট করে আরো তীব্র করে দিতে পারে! হঠাত্ আমার মনে হলো, মেয়েটি দেখতে অনেকটাই লেখিকা নবনীতা দেবসেনের মতো।
এটাও মনে হলো, আজ সিগারেট খাই না বলে একটা মেয়ের কথা শুনতে হলো!
আমি বললাম, ‘এক কাজ করুন, আপনি আমার ভাগের দশ টাকা নিয়ে যান। আমার লাগবে না।’
মেয়েটি বলল, ‘কেন? নেব কেন?’
আমি বললাম, ‘পরে কোনো মিসকিনকে দিয়ে দিয়েন! আমি নিজেও মিসকিন! কোনো মিসকিনকে দেওয়া মানে আমার ভাইবেরাদরকে দেওয়া!’
সে বলল, ‘মিসকিন হলে আপনি নিজেই রেখে দিন! ধরে নিন, আমি মিসকিনকে দিলাম!’
আরে বাপ রে! এ কি মেয়ে! শাঠে শাঠ্যাং!
আমি বললাম, ‘না, মানে দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমার জন্যে একজন অপেক্ষা করছে।’
‘আপনার গার্লফ্রেন্ড অপেক্ষা করছে তো আমি করব? আমার কী দোষ?’
‘শুধু গার্লফ্রেন্ডরাই অপেক্ষা করে? আরও অনেকেই অপেক্ষা করতে পারে। তবে কবি বলেছেন, সময় ও নদীর স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করে না!’ আমি ফিলোজফার!
আমার ফিলোজফি তাকে আকৃষ্ট করল বলে মনে হলো না। সে বলল, ‘আমার জন্যও কেউ অপেক্ষা করতে পারে!’
‘আপনার বয়ফ্রেন্ড অপেক্ষা করছে তো আমি করব? আমার কী দোষ?’
সে আমাকে দ্বিতীয়বার ভস্ম করার চেষ্টা করল চোখের দৃষ্টি দিয়ে। ভুল সময়ে জন্ম নেওয়ার কারণে এবারও ব্যর্থ হলো—বলাই বাহুল্য।
এবার আমি অন্য রাস্তায় চেষ্টা করলাম। ‘আচ্ছা, আপনি কি বইমেলার দিকে যাচ্ছেন? তাহলে আমরা একসাথে রিকশায় যেতে পারি। কুড়ি টাকাই তো ভাড়া।’
‘অপরিচিত কারোর সঙ্গে রিকশায় চড়ব না। সমস্যা আছে।’
‘অপরিচিত মানে কী? আমরা খালাত ভাইবোন হই না?’
মেয়েটি হাসতে পারত। হাসল না। রেগে গেল। কঠিন ব্যক্তিত্বময়ী। চেহারা নবনীতার মতো হলে কী হবে? এ নীরস নবনীতা! অথবা বলা যায়, নবতিতা!
আমি হাল ছেড়ে দিলাম। ইচ্ছা করছে কুড়ি টাকার নোটটা ছিঁড়ে দুভাগ করি। কিন্তু এ যা মেয়ে সমান ভাগ না হলে হয়ত চড়টর মেরে বসবে। আমি বললাম, ‘দাঁড়ান।’
তারপর হনহন করে হেঁটে গিয়ে ঢুকলাম শাহবাগের অসংখ্য ফুলের দোকানের একটিতে। দশ টাকায় একটা গোলাপ কিনলাম। তারপর যে দশ টাকা ফেরত পেলাম সেটা আর গোলাপটা তার হাতে দিয়ে বললাম, ‘আসি, ভালো থাকবেন।’ g
