/ সত্যজিত্ বিশ্বাস
কাসেম বক্স দুর্দান্ত স্ট্যাটাস লেখক। ফেসবুকে কোনো কিছু লিখিয়া মুহূর্তকাল স্থির হইতে না হইতেই আষাঢ় মাসের বৃষ্টির ন্যায় লাইক পড়িতে শুরু করে। শুধু তাহাই নয়, ইতিমধ্যে তাহার নিজস্ব পাঠকজোটও তৈরি হইয়াছে। কাসেম বক্সের জ্বালাময়ী, হূদয়স্পর্শী স্ট্যাটাস পড়িয়া পাঠককূল ক্ষোভে গর্জন করিয়া ওঠে— ‘ভাইয়া, পৃথিবীর সব অগা-বগারা পুস্তক লিখিয়া ফাটাইয়া ফেলিল, আর আপনি এখনো কানাবগার ন্যায় এক ঠ্যাং তুলিয়া কিসের অপেক্ষায়’? সেইসব কমেন্ট পড়িয়া কাসেম বক্স আবেগে আপ্লুত হইয়া পড়ে। বিনয়ের অবতার হইয়া কমেন্টের জবাবে লিখে, ‘ভাই, কী যে বলেন? আমার কি আর সেই যোগ্যতা আছে’? ভক্তগণ পাল্টা জবাব দেয়, ‘আপনি হইলেন সেলিব্রেটি লেখক। আপনার যোগ্যতা না থাকিলে এই বিশ্বজগতে আর কাহার আছে শুনি?
প্রচন্ড গরমেও কাসেম বক্স এসির শীতলতা অনুভব করে। নেত্রদ্বয় দিগন্তপানে স্থির করিয়া ভাবে—কথা তো মিথ্যা নহে। নিজের মধ্যে এই জাদুকরী ক্ষমতা তো তাহার আছে। তবে ক্ষমতা প্রয়োগে আর বিলম্ব কেন? কম্পমান হস্তে কাসেম বক্স ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়—‘সবার ভালোবাসা পাইলে ২০২০-এর অমর একুশে গ্রন্থমেলায় একখানা সাহিত্য রচনা করিতে পারি’।
স্ট্যাটাস লিখিতে দেরি, লাইক পড়িতে নয়। ‘অগ্রিম অভিনন্দন’, ‘শুভেচ্ছা’, ‘স্বাগতম’, ‘অপেক্ষায় রইলাম’, ‘ভালোবাসা অফুরান’, ‘কাসেম বক্স, আমাদের রকস’— এই টাইপের ভালোবাসা মাখানো কমেন্টগুলো যদি বাঁধাই করা হইত তাহা হইলে যে সেটাই একখানা মাঝারি সাইজের উপন্যাসের সমান হইত।
প্রেরণায় জর্জরিত হইয়া কখনো নাকভর্তি সর্দি লইয়া, কখনো-বা জ্বর চাপা দিয়া মাস দুয়েক কঠোর পরিশ্রম করিল কাসেম বক্স। অতঃপর একখানা গদ্যসাহিত্য রচনা করিয়া তাত্ক্ষণিক ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিল—‘এইমাত্র নোবেল রচনা শেষ করিলাম। পাঠক/পাঠিকাগণ কে বা কাহারা সংগ্রহ করিতে আগ্রহী, শিগগির যোগাযোগ করুন’। স্ট্যাটাসখানা পোস্ট করিয়া কাসেম বক্স পরম আবেশে চক্ষু মুদিয়া বিশ্রাম নিতে লাগিল। দুই মাসের কঠোর পরিশ্রমে নিদ্রা আসিতে দেরি হইল না। একটির সাথে আরেকটি ফ্রির ন্যায় নিদ্রার সাথে আসে খোয়াব।
একুশে বইমেলায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ভক্তকূল লাইন ধরিয়া সেই পুস্তক কিনিয়া অটোগ্রাফ সংগ্রহের নিমিত্তে একপায়ে দাঁড়াইয়া রহিয়াছে। কাসেম বক্স একমনে অটোগ্রাফ দিয়াও সামলাইতে পারিতেছে না। চারিপাশের মানুষ অবাক হইয়া অনবরত উঁকিঝুঁকি মারিতেছিল। সকলের মনে কৌতুহল, কে এই কাসেম বক্স? এতদিন কোথায় ছিল এই কালজয়ী লেখক? উঁকিঝুঁকি কিঞ্চিত্ বাড়িতে না বাড়িতেই তাহাকে ঘিরিয়া থাকা ভিড়ের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি শুরু হইয়া গেলো। সাগর উত্তাল হইলে ঢেউ যেরূপ কুলে আছড়াইয়া পড়ে তদ্রুপ কাসেম বক্সের উপরেও ঠেলাঠেলির আছড় পড়িতে শুরু করিল। কম্প মৃদু হইতে মাঝারি, মাঝারি হইতে তীব্রতে পরিণত হইবার পর টিকিতে না পারিয়া—‘এত ধাক্কাধাক্কি কীসের’ বলিয়া কাসেম চিত্কার দিতেই শোনা গেলো পাল্টা চিত্কার।
‘বাপের হোটেলে খাওয়া, ঘুম আর ফেসবুকিং ছাড়া কি কোনো কর্ম জগতে নাই? ওঠ, যা বাজারটা নিয়া আয়’—মায়ের ধাক্কাধাক্কিতে ধরমর করিয়া উঠিয়া বসিল কাসেম বক্স। হায়রে মা, তিনি কি কল্পনা করিতে পারেন, এই পুত্রকে নিয়া আর দুইদিন পর কি তুঘলঘি তোলপাড়টাই না শুরু হইবে। আচমকা মনে পড়িল তাহার ফেসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাসের কথা। এতক্ষণে নিশ্চয়ই শত শত লাইক, শেয়ার আর প্রকাশকদের লাইন পড়িয়া গিয়াছে উপন্যাসখানা ছাপাইবার জন্য!
ফেসবুক চালু করিয়া কাসেম বক্স তাহার স্ট্যাটাসের পানে চাহিয়া অবাক হইয়া গেলো। কী ব্যাপার, ফেসবুকে কি হরতাল চলিতেছে নাকি, ১৪৪ ধারা? সেই ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করিয়া জনতার স্রোত কি তাহার স্ট্যাটাস পর্যন্ত আসিতে পারিতেছে না? মোটে তেরোখানা লাইক আর কমেন্টের বাক্স যেন মরুভূমি! কাসেম বক্স খেপিয়া গিয়া জানাশোনা দুই/চারজন প্রকাশককে তাত্ক্ষণিক ইনবক্সে বার্তা পাঠায়। কীসের কি, বার্তা পাঠানোই সার। জবাব আর আসে না।
কাসেম বক্স এত সহজে হাল ছাড়িবার পাত্র নহে। পাণ্ডুলিপি বগলে লইয়া প্রকাশকগণের দ্বারে দ্বারে ঘোরাঘুরি শুরু করিয়া দিল। মাসখানেক ঘুরিবার পর মর্মে মর্মে যে মর্মর মর্মবেদনা শুরু হইল, তাহার সারমর্ম এই—‘অর্থবিনে কেহই পুস্তক প্রকাশ করিতে রাজি নহে’।
নাওয়া, খাওয়া এমনকি ফেসবুকে অনিয়মিত কাসেম বক্স অর্থের এই অনর্থ বিষয়ক ঘটনা স্ট্যাটাসে লিখিয়া তীব্র প্রতিবাদ জানাইল। মনে আশা, এইবার বুঝি জনস্রোত তৈরি হইবে তাহার পক্ষে। অবাক হইয়া দেখিতে পাইলো তাহার স্ট্যাটাসে লাইকের সংখ্যা ইতোপূর্বে যেখানে তিন ডিজিটের নিচে থাকিত না, তাহা দুই ডিজিটে আসিয়া আর বাড়িতেছে না। উপরন্তু যে দুই-চারজন প্রকাশক বন্ধু লিস্টে ছিল তাহারাও কাসেমকে ব্লক মারিয়াছে। অতি সুহূদ বন্ধু-বান্ধবকে দিয়া খোঁজ লাগাইয়া জানিতে পারা গেলো, সে এখন ব্ল্যাক লিস্টেড লেখক। টাকা দিয়া ছাপাইতে চাহিলেও কোনো প্রকাশক তাহার বই ছাপাইবে না।
গগনে রোজ কত তারারই না আবির্ভাব ঘটে। কেউ কি তাহা গণনা করিয়া রাখে? অব্যর্থ ব্যর্থতায় একজন তারকা লেখক এইভাবেই ঘোর অমানিশায় কৃষ্ণ গহ্বরে হারাইয়া গেল। বইভাগ্য আর কপালে জুটিল না। g
