শ্লীলতাহানির মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা ও তার প্রতিকার

আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২২:৩১

ফারহানা ইয়াসমিন

শ্লীলতাহানি শব্দটি এমন একটা শব্দ যেটা শুনলেই গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়, শরীরে কাঁটা দিয়ে ওঠে। আর ‘ধর্ষিতা’ শব্দটি দ্বারা যাকে সম্বোধন করা হয় তার মনস্তাত্ত্বিক জগতে কি যে ভাঙন চলতে থাকে তা হয়তো একজন সাইকোলোজিস্টের পক্ষেও সম্পূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।

আর যে ধর্ষক সে তো নিজেকে বনের রাজা মনে করে। এই ধর্ষণ শব্দটি শুধু তরুণীদের জন্য, বাকি সব বয়সি ফিমেলদের জন্য নয়। ব্যাপারটা কিন্তু সম্পূর্ণ সেরকম নয়। এখন বৃদ্ধা  থেকে শিশু সবাই এই শব্দটির শিকার হচ্ছেন। ছয় বছরের শিশু, ১৬ বছরের তরুণী, ৬০ বছরের বৃদ্ধা এমনকি বোরকা আবৃতরাও ধর্ষিতা হচ্ছেন।

কেন বুড়ো থেকে গুড়ো সবাই ধর্ষিতা ট্যাগ বয়ে বেড়াচ্ছন?

এই জিনিসটা আমরা ১৩৮ বছরের পুরোনো রাশিয়ান বিজ্ঞানী পাভলভের লার্নিং থিওরির আলোকে কিছুটা হলে বুঝতে পারব। কেন ধর্ষক তার মনুষ্যত্ব হারিয়ে শিশু থেকে শুরু করে মায়ের বয়সি বৃদ্ধা নারীদেরও রেহাই দেয় না? বিজ্ঞানী পাভলভ একদল কুকুরকে ল্যাবে বেঁধে রেখে দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলেন। প্রতিদিন তাদের নির্দিষ্ট সময়ে খাবার দিতেন। কুকুরের আচরণ পর্যবেক্ষণ করার জন্য ঠিক একই সময় তাদের খাবার দিতেন এবং তারা খাবার গ্রহণের সময় কি পরিমাণ লালা ঝরতো, সেটি তিনি একটি কন্টিনারে মেপে রাখতেন। বেশকিছু দিন যাওয়ার পর পাভলভ দেখলেন, খাবার থাক আর না থাক সে ল্যাবে ডুকলেই কুকুরের লালা ঝরছে। তিনি এবার ভিন্ন কিছু আবিষ্কার করলেন। তিনি কুকুরকে খাবার দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি ঘণ্টা বাজাতে লাগলেন। হঠাত্ একদিন তিনি খাবার ছাড়া ল্যাবে আসলেন এবং ঘণ্টা বাজালেন। দেখলেন খাবার না থাকা সত্ত্বেও কুকুরগুলোর একই রকম লালা ক্ষরণ হচ্ছে। তখন তিনি একটা সিদ্ধান্তে আসলেন, খাবারের প্যাকেট, ঘণ্টার শব্দ, তার ল্যাবে আসা—এগুলো হলো নিউট্রাল স্টিমুলেশন। এগুলোর সঙ্গে লালা ক্ষরণের কোনো সম্পর্ক নেই কিন্তু কুকুর তার লার্নিং বিহেভিয়ারে ঘণ্টার শব্দ, খাবারের প্যাকেট, পাভলভের উপস্থিতি এগুলোকে কোরিলেট করে ফেলেছে এবং খাবারের সঙ্গে সঙ্গে যা যা ঘটে সবকিছুকে লালা ক্ষরণের উপাদান হিসেবে তার ব্রেইন ডিটেক্ট করে এমনটা তিনি মনে করেন। ঠিক একইভাবে ধর্ষক তার যৌন ক্ষুধা মেটানোর জন্য চার বছরের শিশু, বোরকা আবৃতা ও ৬০ বছরের বৃদ্ধাকে ছাড়ে না। যেটা সাধারণত এই লার্নিং বিহেভিয়ারের কারণে হয়ে থাকে। অর্থাত্ সে যাকে সামনে পায় তাকে ধর্ষণ করে নিজের যৌন ক্ষুধা মেটানোর জন্য। বিষয়টা কেমন লাগছে তাই না? অবিশ্বাস্য হলেও এটা সত্য। কারণ, ধর্ষক ধর্ষণ করতে করতে একপর্যায়ে এসে মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলে এবং নিজের আপনজন ও আত্মীয়স্বজনের সম্পর্ক ভুলে গিয়ে এই কাজ করে। এটাকেই পাভলভের ভাষায় লার্নিং মেথড বলে।

ক্লাস নাইনের ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসে কী শেখানো হচ্ছে? স্বামীকে ফাঁকি দিয়ে অন্যের সঙ্গে পরকীয়ার কলা-কৌশল। ১৩-১৪ বছরের একটা ছেলে বা মেয়ে এই উপন্যাস পড়ে এবং সেখানে টুনি মন্টুর প্রেমকাহিনী পড়তে পড়তে অবচেতনভাবে ছেলেটি নিজেকে মন্টু ও মেয়েটি নিজেকে টুনি ভাবতে শুরু করে। এরকম হাজারো কবিতা, সাহিত্য, নাটক, শিল্পকলা, সাহিত্যে ও মিডিয়ায় নারী মানে এমন এক সত্তা, যাকে দ্বারা  দেহের ও মনের ক্ষুধা মেটানো হয়। এইডসের বিজ্ঞানে কি শেখানো হচ্ছে? বাঁচতে হলে জানতে হবে। এরপরই যখন বলা হয় নারীকে সম্মান করতে হবে। মায়ের বা বোনের দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকাতে হবে তখন অনেকের ব্রেন সেটা মেনে নিতে পারে না। কারণ, পরিবেশ থেকে নারী সম্পর্কে তারা আগে থেকেই একটা ধারণা পায়। নারী মানেই ভোগ্যপণ্য। এই ধারণা থেকেই চার থেকে ৬০ বছরের নারী—কেউই রেহাই পাচ্ছেন না।

ধর্ষণ কমাতে নতুন নতুন আইনের প্রয়োজন আছে কী?

এটা সাধারণত নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে হয়ে থাকে। এটা প্রতিকারের জন্য উন্নতমানের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, পুরুষের জন্য নৈতিক প্রথা জাগ্রত করতে হবে। নারী-পুরুষ উভয়কে নৈতিকভাবে জাগ্রত না করে, নারীকে সভ্যভাবে চলতে উদ্বুদ্ধ না করে, পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ না করে শুধু পুরুষদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে ধর্ষণ বন্ধ হবে না। কারণ, আইনের দৌড় খুব সীমিত। পাহারা দিয়ে, আইন করে—অন্যায় বন্ধ করা যায় না। যদি মূল্যবোধ জাগ্রত না হয়।

n লেখক :শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়