আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও ১৪ দলের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, জাতীয় সংসদে রাজনীতিবিদের সংখ্যা দিনদিন কমে যাচ্ছে। ব্যবসায়ী, অবসরপ্রাপ্ত আমলা ও অবসরে যাওয়া সেনা কর্মকর্তায় সংসদ ভরে যাচ্ছে। গণতন্ত্রের জন্য এটা শুভ নয়। শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষ্যে গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে জাতীয় পার্টি-জেপি আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন।
মোহাম্মদ নাসিম বলেন, সংসদে এত কোটিপতি দেখে মাঝেমধ্যে খুব কষ্ট লাগে। আমাদের দলসহ সব দলেই এটা রয়েছে। তারা সারাবছর আমলা কিংবা সরকারি কর্মকর্তা হয়ে থাকবেন, আবার হঠাত্ এসে এমপি হয়ে যাবেন, বড়ো বড়ো ধনী ব্যবসায়ীরাও এমপি হয়ে যাচ্ছেন। দিনদিন সংসদে তাদের আধিক্য বাড়ছে। সংসদ হবে সমস্ত রাজনীতিবিদের জন্য, অন্য কারো জন্য এই সংসদ হতে পারে না। রাজনীতিবিদরাই দেশ পরিচালনা করবেন। বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার নেতৃত্বে হাজার হাজার নেতাকর্মী যখন রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছিলেন, তখন এই ব্যবসায়ী-আমলারা কোথায় ছিলেন? বরং অনেককে তখন দেখেছি আইয়ুব খানের পক্ষাবলম্বন করতে। তিনি আরো বলেন, রাজনীতিবিদদের ভুলত্রুটি থাকতে পারে। কিন্তু তারাই লড়াই-সংগ্রাম করেছেন, তারাই এই দেশ স্বাধীন করেছেন। রাজনীতিবিদরা আছেন বলেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে।
১৪ দল সমন্বয়ক বলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আলোকিত হয়েছে। খালেদা জিয়ার আমলে বাংলাদেশ ছিল অন্ধকার, তখন ছিল বাংলা ভাইয়ের যুগ। আর শেখ হাসিনার সাহসী নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দল সেই জঙ্গিবাদ দমন করেছে। পদ্মা সেতু আজ দৃশ্যমান। আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন হচ্ছে। কিন্তু কষ্ট পাই যখন দেখি এই বাংলাদেশে নারী-শিশুরা নির্যাতিত হচ্ছে, ধর্ষিত হচ্ছে। কোন বাংলাদেশ এটা? বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে আমরা ধর্ষকদের ছাড় দিতে পারি না। আমরা যদি এত উন্নয়ন করতে পারি, তাহলে সামাজিক এই অবক্ষয় কেন বন্ধ করতে পারব না? ঘরে, রাজপথে প্রত্যেক জায়গায় এই ধর্ষক-দানবদের রুখে দাঁড়াতে হবে। মুজিববর্ষে শুধু মুজিব আর আওয়ামী লীগের বন্দনা করলেই হবে না, নারী-শিশুর ধর্ষকদের ধ্বংস করে দিতে হবে। তা না হলে সবকিছু ম্লান হয়ে যাবে। নারী-শিশু নির্যাতকদের বিরুদ্ধে ১ মার্চ থেকে ১৪ দল সামাজিক আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। সংক্ষিপ্ত ট্রায়ালে ধর্ষকদের মৃত্যুদণ্ডের বিধান করতে তিনি আইনমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান।
উন্নয়নশীল বিশ্বে রাজনীতি পথ হারিয়ে ফেলছে : আনোয়ার হোসেন মঞ্জু
আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি বলেন, রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাতেই থাকবে। রাজনীতিবিদদের হাতেই আছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী কি রাজনীতিবিদ নন? তিনি বলেন, রাজনীতিতে ব্যবসায়ী-আমলারা এসেছেন, একথা আজ প্রায়ই শোনা যায়। সংবিধানে মন্ত্রিসভার ১০ শতাংশ টেকনোক্র্যাটদের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। এটা কেন, কেউ সেটা চিন্তা করেন না। তিনি বলেন, এখন আমাদের যে গণতন্ত্র—এটা কী? এটা কি ধনতন্ত্রবাদের জন্য গণতন্ত্র, নাকি কমিউনিস্ট কিংবা সমাজতন্ত্র যারা করেন তাদের জন্য গণতন্ত্র। কমিউনিস্ট ও সমাজতন্ত্রীরাও ভোট করেন, জনগণ ভোট দেয় না, যদিও তাদেরও ৩০-৪০ হাজার সদস্য রয়েছে।
জেপি চেয়ারম্যান বলেন, উন্নয়নশীল বিশ্বে রাজনীতি পথ হারিয়ে ফেলছে। তারা ব্যবসায়ী-আমলা সবার সঙ্গেই হাত মেলান, এটা দুঃখের বিষয়। আমাদের রাজনীতির জন্য আমরা এখন পর্যন্ত বিচার-বিশ্লেষণ করে সঠিক রাস্তা ঠিক করতে পারিনি। বিশেষ করে, নতুন স্বাধীনতাপ্রাপ্ত ও উন্নয়নশীল দেশে এই আঁকাবাঁকা রাস্তা সোজা করা দরকার। কিন্তু সেই সময় আমাদের নেই। তিনি বলেন, ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার পর একবার বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে গেলাম, মিটিং শেষে সেখান থেকে যে ভদ্রলোককে বেরিয়ে যেতে দেখলাম তিনি আইয়ুব সরকারের সঙ্গে বড়ো বড়ো ব্যবসা করেছেন। বললাম—কাকা এই লোকটা আপনার বাসায় কীভাবে, এরাই তো আমাদের পিটিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু তখন আমাকে বললেন, বুঝবি না।’ এসব ব্যবসায়ী দুদিকেই থাকে।
আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, সেদিন সংসদে বলেছি উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম যেদিকেই যাইনা কেন, গ্রামগুলোকে এখন আর চেনা যায় না। সব জায়গায় শুধু কাজ আর কাজ। একবার প্রেসিডেন্ট এরশাদ সাহেবকে বলেছিলাম—আপনি যে ঝরনা বানাচ্ছেন তাতে ৪-৫ কোটি টাকা খরচ হয়। এই টাকা দিয়ে যদি ৪৬০টি উপজেলা করতেন তাহলে প্রতিটিতে একটি করে হলেও রাস্তা হতো। এরশাদ সাহেব বলতেন, তিলোত্তমা ঢাকা গড়বেন। এ সরকারেরও ‘তিলোত্তমা’ শব্দটা ব্যবহার করা উচিত নয়। কারণ এখন শহর, গ্রাম, উপজেলা সর্বত্রই কাজ হচ্ছে।
তিনি বলেন, ভাষা আন্দোলন মানে অধিকার আদায় করে নেওয়া। ধনতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র কোথাও বৈষম্যের কথা বলা হয়নি। নতুন প্রজন্মকে জানাতে চাই—স্বাধীনতা ব্যর্থ, এটা ঠিক নয়। বাংলাদেশ হওয়ার কারণে কেউ কিছু পায়নি—এ কথা সত্য নয়। এটা জানাতেই আমরা ভাষা আন্দোলনের কথা বলি। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু আরো বলেন, দেশের উন্নতি হবে। এজন্য স্থিতিশীলতা থাকতে হবে। বঙ্গবন্ধু খুব দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে যাননি। কারণ, তিনি একটি স্বাধীন দেশ দিয়ে গেছেন আমাদের। তারই সৃষ্ট বাংলাদেশে ঘুষ, দুর্নীতি, অন্যায় থাকবে—এজন্য নিশ্চয়ই তিনি জেলে কাটাননি, লাখো মানুষ সংগ্রাম করেনি।
অন্যরা যা বললেন
আলোচনা সভায় জেপির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম বলেন, ভাষাশহিদরা অবিস্মরণীয়। প্রাণ দিয়ে তারা অমর হয়েছেন। তিনি বলেন, একুশের শিক্ষা মাথা নত না করা, শির উঁচু করে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা। ভাষা আন্দোলন ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সোপান। এবারের অমর একুশের শপথ হোক—সম্মুখে এগিয়ে যাওয়ার পথে সব ষড়যন্ত্র ছিন্নভিন্ন করব।
১৪ দল শরিক সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া বলেন, মুসলিম লীগের প্রেতাত্মা, জামায়াত ও বিএনপি একাত্মা হয়ে মৌলবাদী-জঙ্গিগোষ্ঠী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তারাও শহিদ মিনারে যায় ফুল দিতে। শহিদ মিনার থেকে তাদের বের করে দেওয়া উচিত। কারণ, শহিদ মিনারে ফুল দেওয়ার কোনো অধিকার তাদের নেই।
জেপির প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুর রহিম বলেন, ’৫২, ’৬৯ ও ’৭০-এর হাত ধরেই এসেছে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ। জেপির প্রেসিডিয়াম সদস্য সাদেক সিদ্দিকী বলেন, রেডিও, টিভি, টকশোতে এখনো বিকৃত বাংলা উচ্চারণ করা হয়। এসব ঠিক না করলে শুধু শহিদ মিনারে প্রভাতফেরি ও আলোচনার মধ্যেই আমাদের ভাষার মর্যাদা সীমাবদ্ধ হয়ে থাকবে। দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য এজাজ আহমেদ মুক্তা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঐক্যবদ্ধভাবে স্বাধীনতাবিরোধীদের মোকাবিলা করতে হবে। প্রেসিডিয়ামের আরেক সদস্য রুহুল আমিন বলেন, আদালতের রায় বাংলায় লেখাসহ সর্বত্র বাংলার প্রচলন নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় যুবসংহতির সভাপতি অ্যাডভোকেট এনামুল ইসলাম রুবেল বলেন, দেশ ও ভাষাকে ভালোবাসতে হবে।
জেপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক খলিলুর রহমান খলিলের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক পার্টির সদস্যসচিব আমিনুল ইসলাম তপনও বক্তব্য দেন।
