নুরুল করিম
মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করেই ছাড়লো তরুণেরা। রাজপথে নিজেদের বুক পেতে দিলো, গুলিতে জর্জরিত হয়ে রক্তে লাল হলো বাংলার জমিন। সেই রক্তের রেখা ধরে একটি দেশ স্বাধীন হলো। বাংলা ভাষা পেল রাষ্ট্রভাষার সম্মান। বিশ্বসভায় এই ভাষার প্রতিনিধিত্ব আমরাই করছি। এ গল্প সারাবিশ্বেরই জানা। আমাদের মাতৃভাষার জন্য বুকভর্তি পার্বণিক দরদ অনেক বিদেশি নাগরিকেরই। কেউ কেউ বাংলায় করছেন সাহিত্য চর্চা, গাইছেন গান। এ ভাষার টানে অনেকে থাকতেও শুরু করেছেন বাংলাদেশে। তেমনি দু’জন বাংলাপ্রেমী জাপানি নাগরিক শুনসুকে মিজুতানি ও মায়ে ওয়াতানাবে। তারা গানে গানে বাংলা ভাষাকে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
বাংলাদেশে ৭ বছর ধরে বসবাস করছেন তারা। এখন কথা বলেন বাংলায়। কাজ করেন একমাত্রা সোসাইটি নামের একটি এনজিওতে। প্রতিষ্ঠানটির হয়ে এদেশের বিপদগ্রস্ত শিশুদের বিকশিত-ভবিষ্যত্ নিশ্চিত করতে তারা কাজ করেন। এর পাশাপাশি গড়েছেন গানের ব্যান্ড ‘বাজনা বিট’। বাংলার প্রতি তাদের ভালোবাসা ও গানের দলটির উদ্দেশ্য জানতে দীর্ঘসময় ধরে আড্ডা হলো তাদের সঙ্গে। ইংরেজি বা জাপানিজ ভাষায় নয়, পুরো আড্ডায় অকপটে বাংলা বলেছেন তারা। যা শুনে রীতিমতো অবাক হওয়ার জোগাড়।
‘আমরা দুজনই দু-দেশকে সমানভাবে ভালোবাসি। জাপান ও বাংলাদেশ, দুই দেশেরই সেতুবন্ধন রচনা করার চেষ্টা করছি বাজনা বিট মাধ্যমে। এ নামটা সিলেক্ট করতে গিয়েও অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। অনেকগুলো নামের মধ্য থেকে আমাদের ব্যান্ডের নামের জন্য বাজনা বিট রেখেছি। অর্থের পাশাপাশি আরেকটি কারণও আছে, নামের মধ্যেই বাংলাদেশে বা ও বি এবং জাপানের জ ও যে রয়েছে।’—আড্ডার শুরুতেই নিজেদের গানের দল নিয়ে বললেন মায়ে ওয়াতানাবে।
প্রথম দেখাতেই ভালো লেগে যায়
ওয়াতানাবে এতটাই বাংলাপ্রেমী যে, নিজেকে যতটা না জাপানি পরিচয় দেন, তার চেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন বাংলাদেশে থাকেন বলে। বাংলা তাদের এতটাই পছন্দ যে, আনমনে বাংলা বলে চলেন, ইচ্ছেমতো প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে লিখে চলেন বাংলা। শুনসুকে মিজুতানি প্রথমবার বাংলাদেশে আসেন ২০০৭ সালে। বাংলাদেশে প্রথম এসে কেমন লেগেছিল? জবাবে তিনি বলেন, ‘খুব ভয়ে ভয়েই পা রাখি এদেশে। যখন এদেশে আসি, এখানকার মানুষের সঙ্গে মিশতে শুরু করি তখন বাংলাদেশের প্রেমে পড়ে যাই। গ্রামে গিয়ে গ্রামের মানুষদের সঙ্গে চলাফেরা করেছি। জাপান তো একটা উন্নত দেশ, কিন্তু সেদেশে মানবতার ব্যাপক সঙ্কট। যেটা বাংলাদেশের ভেতরে আমি দেখিনি। তখনই বাংলাদেশে বাকি জীবনটা কাটানোর স্বপ্ন দেখি এবং থাকতে শুরু করি।’
২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশে বসবাস শুরু করেন এ দুই জাপানি। এরমধ্যে তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঘুরেছেন। তাদের মতে, বিশ্বের সবচেয়ে ভালো দেশ বাংলাদেশ। এখানকার মানুষের মধ্যে যে ভাষা প্রেম, তা আর কোথাও নেই। এদেশের মানুষের দেখাদেখি শুনসুকে-ওয়াতানাবেও বাংলাকে ভালোবেসেছন। সকল একুশে ফেব্রুয়ারিতে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা নিবেদনে যান শহীদ মিনারে। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’—গানটির ৪ লাইন গাইতে গাইতে ফুল দেন বেদি স্পর্শ করে। এ সময় তার চোখে অশ্রু ঝরে।
বাংলা শেখা হয় যেভাবে
বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে মিশতে মিশতে বাংলা শিখে ফেলেন শুনসুকে মিজুতানি ও মায়ে ওয়াতানাবে। তারা যে এনজিওতে কাজ করেন, তার জন্য বিভিন্ন গ্রামে যেতে হয় তাদের। গ্রামের বেশিরভাগ মানুষই ইংরেজিতে অদক্ষ। এমনকি এই দুই জাপানিও তেমন ভালো ইংরেজি জানেন না। তাদের ইচ্ছে এবং চাকরির প্রয়োজন দুটো বিষয় এক হওয়াতে খুব তাড়াতাড়িই বাংলা আয়ত্ত করেন তারা। শুনসুকে মিজুতানি বলেন, ‘বাংলা ভাষা শেখা সহজ মনে হয়েছে আমাদের কাছে। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই, এখানকার মানুষের সহযোগিতায় শিখতে পেরেছি। আমরা এখনও প্রতিদিন নতুন নতুন বাংলা শব্দ শিখি। আমাদের কলিগরা এ বিষয়ে অনেক সাহায্য করেন।’
মায়ে ওয়াতানাবে বলেন, ‘একটা ভিনদেশি ভাষা শেখা সহজ নয়। তবে আমাদের কাছে বেশ সহজ লেগেছে এ কারণে যে, এখানকার প্রত্যেক মানুষই আমাদের সাহায্য করেছে। একটা ভাষার প্রতি মানুষের কতটা ভালোবাসা থাকলে এটা সম্ভব তা বলে বোঝানো যাবে না। সবার ভালোবাসা পেয়ে পেয়ে আমরা ভাষা শিখেছি। আমি খুবই গর্বিত, একজন জাপানি হয়েও বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারছি।’
বিশ্বের একমাত্র জাতি হিসেবে আমরা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছি, যুদ্ধ করেছি, সেই ইতিহাসও জানা আছে তাদের। বাংলাদেশে আসার পর জেনেছেন বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস ও ৭ মার্চের কথাও। বাঙালি জাতির পুরো ইতিহাস জানার পর তাদের কাছে বাংলায় গাওয়াটা আরো বেশি সম্মানের মনে হয়। দুই জাপানির ইচ্ছে, তাদের মাধ্যমে সারাবিশ্বের মানুষ বাংলাকে আরো ভালোভাবে জানুক। বাংলাদেশের ইতিহাসের পাঠ ছড়িয়ে পড়ুক সারাবিশ্বে।
বাংলাকে নিয়ে বিশ্বমঞ্চে
বাংলাদেশকে নিয়ে বাংলা ও জাপানিজ ভাষায় অনেক গান গেয়েছেন তারা। ইউটিউব-ফেসবুকে খুঁজলেই পাওয়া যাবে। এবারই প্রথম তাদের মুখে গাওয়া গান বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের কথা বলছে। জাপানের টোকিও শহরে হবে গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক শুরু হবে জুলাইয়ে। এই অলিম্পিক সামনে রেখে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি (আইওসি) বিভিন্ন দেশে প্রচার চালাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় দুই জাপানি শিল্পী গেয়েছেন একটি বাংলা গান। গানে কথা ছিল এমন—‘চলো উড়ে বেড়াই ডানা মেলে... ওই দূর আকাশে, বিশাল বিশ্বের মাঝে।’
শুনসুকে মিজুতানি ও মায়ে ওয়াতানাবে এটিকে নিজেদের অর্জন হিসেবে দেখছেন। তারা বলেন, ‘আমাদের দেশে অলিম্পিকের মতো একটা বড় আয়োজন হচ্ছে। সেখানে আমাদের আরেকটি প্রিয় দেশ অংশ নিচ্ছে। এমন একটি আয়োজনের প্রচারে অংশ নিচ্ছি—এটা ভাবতেই ভালো লাগছে। বিশেষ করে যখন দুই জাপানি শিল্পী এসে প্রস্তাবটা দেন, আনন্দের সঙ্গে রাজি হয়ে যাই। এখন আমাদের একটাই চাওয়া, বাংলাদেশ যেন জাপান থেকে পদক জিতে আসে।’
বাংলাদেশকে নিয়ে বানানো এ মিউজিক ভিডিওতে আছেন দেশসেরা তিরন্দাজ রোমান সানা, ইতি খাতুন, অসীম কুমার, সাঁতারু মাহফিজুর রহমান, সোনিয়া আক্তার, অ্যাথলেট আল আমিন, শুটার আবদুল্লাহ হেল বাকি, শাকিল আহমেদ ও সৈয়দা আতকিয়া হাসান দিশাদ। দেশ সেরাদের সঙ্গে এক ভিডিওতে থাকতে পেরেও উচ্ছ্বসিত শুনসুকে মিজুতানি ও মায়ে ওয়াতানাবে।
কেমন লাগে বাংলাদেশ?
বাংলাদেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ঘুরেছেন তারা। কিন্তু গ্রামই তাদের বেশি টানে। মায়ে ওয়াতানাবে বলেন, ‘ঢাকায় বা শহরে থাকলে এ দেশকে চেনা সম্ভব না। সোনার বাংলা বলে যে একটা কথা আছে তার ষোল আনা বোঝা যায় গ্রামে গেলে। এত সুন্দর প্রকৃতি, দৃশ্য, আরামদায়ক বাতাস, ছোট ছোট পরিবেশবান্ধব ঘর আমাকে মুগ্ধ করে। গ্রামের মানুষের চোখ-মুখে যে সরলতা দেখা যায় তা আসলে অন্য কোথাও নেই।’
এ দুই বন্ধু বাংলাদেশে থাকতে পেরে বেশ খুশি। বিশেষ করে তারা দেশের নারী সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করে। তাদের মতে, অধিক জনসংখ্যার এদেশের তরুণ-তরুণী, নারীদের ব্যবহার ভালো। তাদের পোশাকও তার পছন্দ হয়েছে। তাইতো কোনো অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেলে ওয়াতানাবে শাড়ি পরে থাকেন, শুনসুকে পরেন পাঞ্জাবি। এখানকার সবজি ও মাছ রান্না তাদের কাছে দারুণ লাগে।
আড্ডার শেষাংশে আবদার ছিল, একটা গান শোনাবেন? হাসিমুখে দু’জন গাইলেন—‘ধন ধান্যে পুষ্প ভরা, আমাদের এই বসুন্ধরা।’
