প্রবাসে ভাষা শহীদদের স্মরণ

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৯:৪৭

শহীদুল ইসলাম, যুক্তরাষ্ট্র থেকে

 

দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতির বিকাশ এবং নতুন প্রজন্মের মাঝে বাংলা ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত এবং এর ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখার মধ্য দিয়ে নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও মহান একুশে ফেব্রুয়ারি।

বাংলাদেশে একুশের প্রথম প্রহর রাত ১২টা ০১ মিনিটের সঙ্গে মিল রেখে নিউইয়র্ক সময় দুপুর ১টা ০১ মিনিটে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে নির্মিত অস্থায়ী শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানায় মুক্তধারা ফাউন্ডেশন ও বাঙালির চেতনা মঞ্চ।

জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস

‘ভাষার কোনো সীমানা নেই’—প্রতিপাদ্য নিয়ে চতুর্থবারের মতো জাতিসংঘ সদর দপ্তরে যথাযোগ্য মর্যাদায় আন্তর্জাতিক আবহে উদযাপন করা হলো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। দিবসটিতে ভাষার শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সংঘাত, অহিষ্ণুতা ও সামাজিক উদ্বেগ মোকাবেলা করার আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।

বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়া, ক্যামেরুন, মেক্সিকো, ত্রিনিদাদ ও টোবাকো মিশন এবং জাতিসংঘ সচিবালয় ও ইউনেস্কো নিউইয়র্ক অফিসের যৌথ উদ্যোগে স্থানীয় সময় শুক্রবার বিকেল ৪টায় জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয়। এতে সার্বিক তত্ত্ব্বাবধানের দায়িত্বে ছিল জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশন।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি এ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। জাতিসংঘ সদস্য দেশসমূহের উচ্চপর্যায়ের কূটনীতিক, জাতিসংঘের কর্মকর্তা, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, সমাজকর্মীদের উপস্থিতিতে এ অনুষ্ঠান ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত রাবাব ফাতিমা।

আলোচনা পর্বে অংশ নেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি তিজানি মোহাম্মাদ বান্দে, ত্রিনিদাদ ও টোবাকোর স্থায়ী প্রতিনিধি পেনিলোপি আলথিয়া বেকলেস, অস্ট্রেলিয়ার চ্যার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স টিগান ব্রিঙ্ক, ক্যামেরুনের চ্যার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স জাকাইরি সারজে রাউল নাইয়ানিদ, মেক্সিকোর চ্যার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স হুয়ান স্যানডোভাল মেনডিওলিয়া, জাতিসংঘ মহাসচিবের পক্ষে জাতিসংঘের বৈশ্বিক যোগাযোগ বিভাগের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল মেলিচ্ছা ফ্লেমিং, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ও কনফারেন্স ব্যবস্থাপনা বিভাগের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেলের পক্ষে পরিচালক সিসিলিয়া এলিজালদে। এছাড়া ইউনেস্কোর মহাপরিচালকের পক্ষে নিউইয়র্কস্থ ইউনেস্কো অফিসের পরিচালক মিজ মারিয়ে পাওলি রোউডিল মহাপরিচালকের বাণী পড়ে শোনান। বরাবরের মতোই নিউইয়র্ক সিটি মেয়র বিল ডি ব্লাজিও এ অনুষ্ঠানটিতে বাণী প্রদান করেন, যা পাঠ করা হয়।

স্বাগত বক্তব্যে রাষ্ট্রদূত রাবাব ফাতিমা বলেন, ‘বাংলাদেশই বিশ্বের একমাত্র দেশ, যারা মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা বাংলা রক্ষার জন্য যে সকল ভাষা শহীদ প্রাণ দিয়েছিলেন তাদের প্রতি সত্যিকারের সম্মান দেখানো হয়েছে ইউনেস্কো কর্তৃক ১৯৯৯ সালে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে। স্বীকৃতি দানের এই পদক্ষেপে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অগ্রণী ভূমিকা ও বিচক্ষণ নেতৃত্ব নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে।’

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি তিজানি মোহাম্মাদ বান্দে বলেন, ‘উল্লেখযোগ্যহারে যখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে ঠিক সেইক্ষণে ভাষা বৈচিত্র্য ও বহুপক্ষবাদ টেকসই উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য মর্মে উল্লেখ করে ২০১৮ সাল থেকে তা এগিয়ে নিতে জাতিসংঘ নেতৃত্বশীল ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। মাতৃভাষাকে সমুন্নত রাখতে বিশ্ব সম্প্রদায়কে অবশ্যই দ্বিগুণ প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে।’

অনুষ্ঠানের শুরুতে ভাষা শহীদদের স্মরণে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। আলোচনা পর্য শেষে এবং সাংস্কৃৃতিক পর্বের আগে ২১ ফেব্রুয়ারি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের ওপর একটি প্রামাণ্য ভিডিও চিত্র পরিবেশন করা হয়।

 

জাতিসংঘে বাংলাদেশ মিশন ও নিউইয়র্ক বাংলাদেশ কনস্যুলেট

জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশন ও নিউইয়র্কের বাংলাদেশ কনস্যুলেটের যৌথ উদ্যোগে ভাষা শহীদদের স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের এই আয়োজন শুরু হয় রাত ১০টা ৩০ মিনিটে। ১ মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এরপর ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ভাষা শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। অতপর দিবসটি উপলক্ষে দেওয়া রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বাণী পাঠ করে শোনানো হয়।

রাষ্ট্রপতির বাণী পাঠ করেন জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত রাবাব ফাতিমা, প্রধানমন্ত্রীর বাণী পাঠ করেন কনসাল জেনারেল সাদিয়া ফয়জুন নেসা, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বাণী পাঠ করেন স্থায়ী মিশনের উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি তারেক মো. আরিফুল ইসলাম এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বাণী পাঠ করেন স্থায়ী মিশনের ডিফিন্স অ্যাডভাইজার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খান ফিরোজ আহমেদ।

 

ব্রঙ্কসে প্রভাতফেরি

নিউইয়র্কের বাংলাদেশি অধ্যুষিত ব্রঙ্কসে প্রতিবছরের মতো এবারও প্রভাতফেরির মধ্য দিয়ে মহান একুশে ফেব্রুয়ারি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপিত হয়েছে। বাংলাদেশ একাডেমি অব ফাইন আর্টস (বাফা) শুক্রবার প্রভাতফেরি, শহীদ মিনারে পুষ্পমাল্য অর্পণ, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি উদযাপন করে।

নতুন প্রজন্মের ব্যাপক অংশগ্রহণে বাঙালি অধ্যুষিত স্টারলিং-বাংলাবাজার-ওলমস্টেড অ্যাভিনিউ থেকে বিশাল প্রভাতফেরিটি শুরু হয়ে বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে ওই এলাকার এশিয়ান ড্রাইভিং স্কুলের দেয়ালে অঙ্কিত শহীদ মিনারের সামনে নির্মিত বেদিতে পুস্পস্তবক অর্পণ করা হয়। সবশেষে বাফার শিল্পীদের পরিবেশনায় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়।

 

মুক্তধারা ফাউন্ডেশন ও বাঙালির চেতনা মঞ্চ

মুক্তধারা ফাউন্ডেশন ও বাঙালির চেতনা মঞ্চের উদ্যোগে ফুল দিয়ে গভীর শ্রদ্ধায় ভাষা শহীদের স্মরণ করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃৃতিক ও সেচ্ছাসেবী সংগঠনের পক্ষ থেকে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। পুষ্পস্তবকের সময় একুশের গান পরিবেশিত হয়। এ আয়োজনের নেতৃত্ব দেন বাঙালি চেতনা মঞ্চের প্রধান আব্দুর রহিম বাদশা।

 

বাংলাদেশ সোসাইটি ইনক

যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশিদের আমব্রেলা সংগঠন বাংলাদেশ সোসাইটি ইনকের উদ্যোগ প্রতিবছরের মতো এ বছরও নিউইয়র্কে সম্মিলিতভাবে অমর একুশে ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন করা হয়। এ উপলক্ষে ২০ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার উডসাইডের গুলশান টেরেসে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে ছিল অস্থায়ী শহীদ মিনারে পুষ্পস্থবক অর্পণ, আলোচনা, সাংস্কৃৃতিক অনুষ্ঠান, স্মরণিকা প্রকাশ প্রভৃতি। বাংলাদেশ সোসাইটির সভাপতি কামাল আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমীন সিদ্দিকী। এছাড়া অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সংগঠনের গণসংযোগ ও প্রচার সম্পাদক রিজু মোহাম্মদ। 

সাংস্কৃতিক পর্বে দেশ ও প্রবাসের জনপ্রিয় শিল্পীরা সংগীত পরিবেশন করেন। এই পর্ব পরিচালনা করেন সোসাইটির সাংস্কৃতিক সম্পাদিকা মনিকা রায় চৌধুরী। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফ্রেব্রুয়ারি’ সংগীতটি পরিবেশন করেন জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী বেবী নাজনীন। এছাড়া আরো সংগীত পরিবেশন করেন রোকসানা মির্জা।

 

নিউইয়র্কে মূলধারায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস

এদিকে প্রথমবারের মতো নিউইয়র্ক সিটি কর্তৃপক্ষ উদযাপন করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এ উপলক্ষে স্থানীয় সময় শুক্রবার সন্ধ্যায় নিউইয়র্কের লোয়ার ম্যানহাটনের সারাগোট কোর্টে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে নিউইয়র্ক সিটির বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ যোগ দেন।

এই অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ছিলেন মেয়র অফিসের কর্মকর্তা হানিফ ইয়াজডি। আলোচনা সভায় অংশ নেন নিউইয়র্ক সিটির ইমিগ্রেশন কমিশনার বিটা মোস্তফি, কনজুমারস অ্যাফেয়ার্স বিভাগের নির্বাহী পরিচালক স্টিভ এম ইটানানি, হিউম্যান রাইটস কমিশনের উপ-পরিচালক ফ্রাঙ্ক জোসেফ, এনডারজার্ড ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যালায়েন্সের পরিচালক ড্যানিয়েল কাউফম্যান, বাংলাদেশের পক্ষে সাংবাদিক ও কলামিস্ট হাসান ফেরদৌস প্রমুখ।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন ইউএসএ ইনকের উদ্যোগে উডসাইডের কুইন্স প্যালেসে বৃহস্পতিবার রাতে ‘সম্মিলিত মহান একুশ উদযাপন ২০২০’-এর আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে ঢাবিসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশি-আমেরিকান পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনসহ শতাধিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে অস্থায়ী শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ অর্পণ করা হয়। এর আগে প্রবাসের বিভিন্ন সাংস্কৃৃতিক সংগঠনের শিল্পীরা অনুষ্ঠানে সংগীত, নৃত্য ও আবৃত্তি পরিবেশন করে।

মূল আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী ও লেখক অধ্যাপক মতলুব আলী। মুখ্য আলোচক ছিলেন প্রবীণ সাংবাদিক সৈয়দ মোহাম্মদ উল্লাহ। মূলধারা ও বাংলাদেশি কমিউনিটির বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন জীবন বিশ্বাস, শারমিন রেজা ইভা, সাবিনা শারমীন নিহার, প্রতিমা সুমি, মেহের কবীর ও গোলাম মোস্তফা।