শিফারুল শেখ
করোনা ভাইরাসের আতঙ্ক যে বিশ্ব জুড়ে এমন জাঁকিয়ে বসেছে তার প্রমাণ দুটো ঘটনা। প্রথমত, সোশ্যাল মিডিয়ায় আসা ভিডিওতে দেখা যায়, বিমানে দুই যাত্রী প্লাস্টিকে নিজেদের মুড়ে ফেলেছেন। দ্বিতীয়ত, চীনে ওষুধ আনতে এক মহিলা জিরাফের পোশাক পরে হাসপাতালে। মরার ভয়ই বিশ্ব জুড়ে জাতীয়তাবাদ ও বর্ণবাদকে উসকে দিচ্ছে। এভাবে চললে পুরো বিশ্বে এক দেশ আরেক দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হবে বলে আশঙ্কা। যদিও এর ভ্যাকসিন আবিষ্কারে জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। মার্কিন বিজ্ঞানীরা ভাইরাসটিকে সবেমাত্র চিনতে পেরেছেন। তবে চীন বলছে, এপ্রিলের মধ্যে তারা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঘোষিত এক নম্বর শত্রুকে মোকাবিলায় বাজারে ওষুধ আনতে পারবেন। আশার বাণী শুনিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, এপ্রিলে গরমের সময় করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব কমে যাবে।
আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলছে: ওয়ার্ল্ডমিটারস ডট ইনফো এর তথ্যানুসারে, ৩৩টি দেশে এবং একটি জাহাজে ভাইরাস ছড়িয়েছে। রবিবার পর্যন্ত বিশ্বে আক্রান্তের সংখ্যা ৭৮ হাজার ৯৬৬ জন। মারা গেছে ২ হাজার ৪৬৮ জন। সুস্থ ২৩ হাজার ৪১৮ জন। সংকটাপন্ন অবস্থায় ১১ হাজার ৫৬৯। চীনে আক্রান্ত হয়েছে ৭৬ হাজার ৯৪০ (মৃত্যু ২ হাজার ৪৪৩)। চীনের বাইরে ৩২টি দেশে আক্রান্তের সংখ্যা দুই সহস্রাধিক। মারা গেছে ২৫ জন। চীনের বাইরে বেশি আক্রান্ত দক্ষিণ কোরিয়ায় (৬০২)। বেশি মৃত্যু ইরানে (৬ জন)। আর জাপানে নোঙর করা ব্রিটেনের ডায়ামন্ড প্রিন্সেস জাহাজে ৬৯১ জন ভাইরাসে আক্রান্ত যার মধ্যে তিন জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রতি মুহূর্তে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। একবিংশ শতকে কোনো ভাইরাসে এতো মানুষ মারা যায়নি বা আক্রান্তও হয়নি। গত ডিসেম্বরে চীনের উহানে এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটে। ১১ জানুয়ারি প্রথম মৃত্যু।
উসকে দিচ্ছে জাতীয়তাবাদ: কোভিড-১৯ ভাইরাস দেশে দেশে আতঙ্ক ছড়ানোর মাধ্যমে জাতীয়তাবাদকে উসকে দিচ্ছে। সন্ত্রাসী কিংবা বড়ো ধরনের জঙ্গি হামলার পর ঐ দেশে ভ্রমণে সতর্কতা জারি করে উন্নত ও প্রভাবশালী দেশ। কিন্তু জঙ্গি হামলার চেয়েও ভয়ানক হয়ে উঠছে করোনা। চীনের সঙ্গে বিশ্বের বাণিজ্যিক বা অন্যান্য যোগাযোগ প্রায় বন্ধ। কেবল চীন নয়, যে দেশে এই ভাইরাসের প্রভাব বেশি সেই দক্ষিণ কোরিয়ায় ভ্রমণেও নিষেধাজ্ঞা জারি শুরু হয়েছে। কেবল তাই নয়, চীনের বিভিন্ন প্রদেশও এখন পুরোপুরি একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন। চীনের পর্যটন কেন্দ্র ‘ফরবিডেন সিটি’ এখন সত্যিই নিষিদ্ধ।
করোনা ভাইরাসে ঘৃণা এতটা বেড়েছে যে, এসব ঘটনা লিপিবদ্ধ করতে উইকিপিডিয়া একটা আলাদা পেইজ চালু করেছে। নিউ ইয়র্কে মাস্ক পরায় এশিয়ান নারী মারধরের শিকার। ব্রিটেনে ফুটবল খেলোয়াড় ডেলি আলি মুখোশ পরা স্ন্যাপচাট দিয়ে এবং এশিয়ানকে উপহাস করায় সমালোচনার মুখে। ফ্রান্সে বর্ণবাদ আক্রমণ বাড়ায় ‘আই অ্যাম নট অ্যা ভাইরাস’ নামের একটি হ্যাশট্যাগ চালু হয়েছে। দ. কোরিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চীনবিরোধী মনোভাবও বেড়েছে। কোরিয়ার ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক ফেলিসিয়া ইস্তাদ বলেন, অনলাইনে তাকালেই দেখা যায় যে, চীনের প্রতি কোরিয়ানদের মনোভাব কতটা বিদ্বেষমূলক। এমন দেখা যাচ্ছে, কোরিয়ার কিছু দোকানে দরজায় সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে, ‘এখানে চীনাদের প্রবেশাধিকার নেই’।
উত্তর কোরিয়াকে সমর্থন করায় চীনের প্রতি বিরোধী মনোভাব দ. কোরিয়ায় অনেক বেশি। তারপরও দেশটির আমদানি ও রপ্তানির মূল অংশীদার চীন। চীনা পর্যটকদের সংখ্যাও বেশি। ২০০৯ সালে কেবল চীনা পর্যটকই ছিল ৩৪ শতাংশ। বাণিজ্যিক সম্পর্ক এত ঘনিষ্ঠ হলেও করোনা বিদ্বেষ বাড়িয়েছে। গত মাসে প্রায় ৫ লাখ নাগরিক স্বাক্ষর করে প্রেসিডেন্টের কাছে চীনা পর্যটক নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছে।
আগে যেখানে জাপানি পণ্য বয়কটের জন্য লোগো ব্যবহার করা হতো ‘নো জাপান’ উল্লেখ করে। সেখানে এখন লেখা হয়েছে, ‘নো চায়না-নো থ্যাংক ইউ, ফাইন ডাস্ট পলিউশন অ্যান্ড উহান করোনা ভাইরাস। বয়কট চায়না’। আবার দ. কোরিয়ায় নাগরিকদের ভ্রমণে সতর্কতা জারি করেছে প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্র। গত বৃহস্পতিবার চীন থেকে নাগরিকদের দেশে নিয়ে আসে ইউক্রেন। বিমানবন্দর থেকে বাসে করে তাদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। বাস থেকে নামানোর পর হাসপাতালের বাইরে জড়ো হওয়া জনতা তাদের প্রবেশে বাধা দেয়।
আশা জাগছে: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, চীনের পরিস্থিতি ক্রমশ আয়ত্বে আসছে। অন্যদিকে চীনের প্রশাসন জানিয়েছে, এপ্রিলের মধ্যে করোনার ওষুধ বাজারে নিয়ে আসার আপ্রাণ চেষ্টা চলছে। মরণ ভাইরাসটিকে ধ্বংস করতে যুদ্ধকালীন তত্পরতায় অস্ত্র খুঁজছেন পুরো বিশ্বের বিজ্ঞানীরা। টেক্সাসের একদল গবেষকের দাবি, তারা আরো একধাপ এগিয়েছেন। ভাইরাসটি যে বিষাক্ত প্রোটিনকে হাতিয়ার করে প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে, সেটি সম্পর্কে জানতে সক্ষম হয়েছেন তারা। ‘সায়েন্স’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে তাদের গবেষণাপত্র। করোনা ভাইরাস যদিও একাধিক প্রোটিনকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, তবু ‘স্পাইক’ প্রোটিনটি সবচেয়ে ভয়ানক। এর ভ্যাকসিন আবিষ্কার করতে হলে তাকে দেখতে কেমন, সেটা জানা জরুরি ছিল। সেই কাজটাই সেরেছেন মার্কিন বিজ্ঞানীরা। তবে কার্যকর ওষুধ আবিষ্কারে দেড় থেকে দু্ই বছর সময় লাগবে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন।
