সোনাহাট স্থলবন্দর এলাকায় পাথর ভাঙার মেশিন

বিকট শব্দ ও ধুলায় নাকাল শ্রমিকসহ স্থানীয় বাসিন্দারা

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২১:৫০

ভূরুঙ্গামারী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে সোনাহাট স্থলবন্দর সংলগ্ন এলাকায় দুই পাশে থাকা শতাধিক পাথর ভাঙা মেশিনের (বোমা মেশিন) বিকট শব্দ ও তা থেকে উত্পন্ন ধুলায় শ্রমিকসহ স্থানীয় বাসিন্দারা রয়েছে চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে।

জানা যায়, স্থানীয় বিজিবি ক্যাম্পের পূর্ব পাশ থেকে জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত রাস্তাটি কাঁচা ও খানাখন্দে ভরা থাকায় এবং এ রাস্তায় সার্বক্ষণিক পাথরবাহী ট্রাক চলাচল করায় শব্দ ও ধুলা দূষণে বিপর্যস্ত স্থানীয়দের জীবনযাত্রা। তাছাড়া, বোমা মেশিনে নিয়োজিত শ্রমিকরা স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কোনো প্রকার মাস্ক (মুখোশ) ব্যবহার না করায় তাদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানিসহ নানা ধরনের রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে।

শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত জোসন আলী প্রামানিকের ছেলে লোকমান আলী (৫০) ও কন্যা জোত্স্না বেগম (৪২) তাদের এক্সরে রিপোর্ট দেখানোর সময় আশপাশের জাহানারা বেগম, সামিনা বেগম, মহিরণসহ আরো অনেকেই এ প্রতিবেদকে জানান, তারাসহ এলাকার অধিকাংশ মানুষই এই ধরনের রোগে আক্রান্ত। তারা আরো জানান, ইতিমধ্যে শ্বাসকষ্টে ভুগে মারা গেছেন রেজিয়া বেগম ও ফিরোজা খাতুনসহ চার জন ও অসুস্থ হয়েছেন আরো প্রায় শতাধিক ব্যক্তি। শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে ব্যাপকহারে। বিকট শব্দদূষণের ফলে মাথা ব্যথা ও বধিরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে জানিয়েছে এলাকাবাসী।

প্রতিবেদককে দেখে এগিয়ে আসেন শ্রমিক নেতা আব্দুল বাতেন। রফিকুলের দোকানে খাবার ঢেকে রাখা পলিথিনের ওপর জমে থাকা ধুলার পুরু আস্তরণ দেখিয়ে তিনি বলেন, এই হচ্ছে অবস্থা, আমরা নিজেদের উদ্যোগে পাথর ভাঙা মেশিন মালিকদের বহুবার পানি ছিটানোর অনুরোধ ও ধর্মঘট করেও কোনো প্রতিকার পাইনি।

পাথর ভাঙা মেশিনের বিকট শব্দে পড়ালেখা ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। সোনাহাট দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক আসমত আলী জানান, শব্দ ও ধুলার কারণে রুমের দরজা-জানালা বন্ধ করে ক্লাসে পাঠদান করতে হচ্ছে।

এ ব্যাপারে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আবু সায়েম জানান, কোনো প্রটেকশন ছাড়া পাথর ভাঙার কাজ করলে সিলিকোসিস, ডাস্ট এলার্জি, শ্বাসকষ্টসহ নানা ধরনের ফুসফুসের জটিলতা দেখা দিতে পারে। ইতিমধ্যে ঐ এলাকার কিছু আক্রান্ত ব্যক্তিকে চিকিত্সা দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, দীর্ঘদিন কাজ করলে পাথরকুচি ফুসফুসে আটকে বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণ ও জটিলতা দেখা দিতে পারে।

এ বিষয়ে সোনাহাট বিজিবি ক্যাম্পের নায়েব সুবেদার আব্দুস সবুর বলেন, বিকট শব্দ ও ধুলার কারণে এখানে দায়িত্ব পালন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সীমান্ত রক্ষার কাজে নিয়োজিত জোয়ানরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে, একনাগারে কেউই দুই ঘণ্টা ডিউটি করতে পারছে না। স্থলবন্দর ব্যবসায়ী নেতাদের অনুরোধ করেও কোনো প্রতিকার পাননি বলে তিনি জানান।

স্থানীয় কৃষক মিজানুর রহমান জানান, ফসলের পাতার ওপর পাথরের গুঁড়া ও ধুলার আস্তর পড়ে থাকায় শস্যের ফলন ভালো হচ্ছে না, ফলদ বৃক্ষগুলোর পাতায় পাতায় জমে আছে ধুলা, এতে ফল আসছে না গাছে।

সোনাহাট স্থলবন্দরে কর্মরত সহকারী পরিচালক গিয়াস উদ্দিন আহমেদ জানান, শ্রমিকরা যাতে মাস্ক ব্যবহার করে কাজ করে সেজন্য একটি কমিটি গঠন করা আছে। কিন্তু তারপরও তারা মাস্ক ব্যবহার করে না। তিনি জানান, কাজ শুরুর আগে মেশিন এলাকায় পানি না ছিটানো এবং শ্রমিকরা মাস্ক না পরায় ইতিমধ্যে কয়েকটি মেশিন বন্ধ করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে আমদানি ও রপ্তানিকারক সমিতির সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক জানান, মালিকরা মাস্ক কিনে দিয়েছে; কিন্তু শ্রমিকরা ব্যবহার করছে না। এ ব্যাপারে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে প্রচারণা চালাচ্ছি।