খালগুলি উদ্ধার করুন

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২১:৫৬

ষাটের দশকেও রাজধানীর খালগুলি ছিল মানবদেহের শিরা-উপশিরার মতো ছড়াইয়া-ছিটাইয়া। ছিল প্রাণবন্ত; কিন্তু এখন সেইগুলির অধিকাংশেরই মরণদশা। এই সকল খাল ভরাট করিয়া অবৈধভাবে দোকানপাট, বাড়িঘরসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করিয়াছে প্রভাবশালীরা। খোদ ঢাকা ওয়াসা বলিতেছে, দখলবাজদের আগ্রাসি থাবায় মাত্র ৩০ বত্সরেই অন্তত ৩৯টি খালের অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন হইয়া গিয়াছে। এমনকি সরকারি ঐ দপ্তরে বহু খোঁজাখুঁজি করিয়াও খালগুলির নথি পর্যন্ত পাওয়া যাইতেছে না। আর গত আট বত্সরে ঢাকার ১১টি খাল পরিণত হইয়াছে খোলা নর্দমা আর ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে। আবর্জনায় জমাটবাঁধা খালের নর্দমায় খুঁটি পুঁতিয়া পাটাতন বসাইয়া একের পর এক বস্তি গড়িয়া তোলা হইয়াছে। ফলে স্থায়ীভাবে আটকাইয়া গিয়াছে পানিপ্রবাহের পথ। আবার কোনো খালের একটু দূরে দূরেই বাঁধ দিয়া ঘর তুলিয়া বদ্ধ ডোবায় পরিণত করা হইয়াছে। ৩০-৩২ বত্সর আগেও ঢাকার প্রান্তসীমায় স্রোতবাহী যেই সকল খালে পণ্যবাহী বড়ো বড়ো নৌকার আনাগোনা ছিল, সেই খালগুলি এখন দুই-আড়াই ফুট চওড়া ড্রেনের আকার ধারণ করিয়াছে। এই সকল খালের মধ্যে পরস্পরের যোগসূত্র ছিল, আর সংযোগ ছিল রাজধানী লাগোয়া প্রধান চারটি নদীর সহিত।

রাজধানীতে ১৯৮৫ সাল পর্যন্তও ৫০ খালের অস্তিত্ব ছিল। এখন টিকিয়া আছে মাত্র ২৬টি খাল। এইগুলি অনেকটাই প্রাণহীন। এই সকল খালের মোট দৈর্ঘ্য ৭৯ হাজার ৮০৬ মিটার বা প্রায় ৮০ কিলোমিটার। বিদ্যমান ২৬টি খালের মধ্যে পাঁচটি খাল আবার বিস্ময়করভাবে ব্যক্তিমালিকানায় রেকর্ড হইয়া আছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রমতে, ওয়াসার একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশেই প্রভাবশালী মহল বত্সরের পর বত্সর খাল দখলের মচ্ছব চালাইয়াছে। তাহারা প্রথমেই খালের নির্দিষ্ট কোনো পয়েন্টে আড়াআড়ি বাঁধ দিয়া পানিপ্রবাহ বন্ধ করিয়া দেয়। পরে বাঁধ ঘেঁষিয়া রাতারাতি গড়িয়া তোলা হয় একের পর এক বস্তিঘর। ওয়াসা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে খালের মূল নথিপত্র বাহির করিয়া সেই আদলেই মালিকানা-সংক্রান্ত জাল কাগজপত্র বানাইয়া নেয় তাহারা। ইহার পরই বস্তিবাসীকে খালের অন্য অংশে হটাইয়া দিয়া সেই জায়গা প্লট আকারে বিক্রয় করিয়া দেয় তাহারা। এইভাবেই বাঁধ তৈরি, বস্তি স্থাপন এবং খালের জায়গা প্লট আকারে বিক্রয়ের ধুরন্ধর প্রক্রিয়ায় ঢাকার খালগুলি নিশ্চিহ্ন করা হইতেছে। দুই বত্সর আগে খাল দখলকারী ২৫৮ জনের একটি তালিকা প্রণয়ন করিয়াছিল ঢাকা জেলা প্রশাসন। জরিপ করিয়া ঢাকার কোন খালের কোন অংশ কোন প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি দখল করিয়াছে তাহার তালিকা তৈরি করা হয়। অনেক আগেই প্রতিবেদনটি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এবং ওয়াসাকে দিয়াছে ঢাকা জেলা প্রশাসন; কিন্তু এই তিন সংস্থার একাধিক বৈঠক হইলেও খাল পুনরুদ্ধারের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় নাই।

এখন পানিপ্রবাহের পথগুলির অস্তিত্ব না থাকায় কয়েক মিনিটের বৃষ্টিতেই রাজধানী জুড়িয়া নজিরবিহীন নাগরিক বিপর্যয়ের সূত্রপাত ঘটে। রাজধানীর বেশির ভাগ এলাকা কোমর পানির নিচে ডুবিয়া যায় এবং সেচপাম্পের মাধ্যমে সেই পানি অপসারণে ওয়াসার তিন-চার দিন পর্যন্ত সময় লাগিয়া যায়। তবুও দখলবাজদের কবল হইতে উদ্ধার হয় না খালগুলি, সচল হয় না পানিপ্রবাহের পথ। চলমান অবস্থার উন্নতি না হইলে বা জলাশয় রক্ষায় কঠিন পদক্ষেপ না লইলে আগামী ২০ বছরের মধ্যে রাজধানীতে আর খালের কোনো অস্তিত্ব থাকিবে না। অথচ খালগুলিকে উদ্ধার করিয়া যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করিতে পারিলে ঢাকা মহানগরকে নেদারল্যান্ডের রাজধানী আমস্টারডামের মতো একটি মনোরম নগরে পরিণত করা এখনো সম্ভব। আমরা আশা করি, দলীয় বা রাজনৈতিক বিবেচনা কিংবা প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম্যের কাছে নতি স্বীকার না করিয়া ঢাকা ওয়াশা ও দুই সিটি করপোরেশন খালগুলি উদ্ধার করিয়া শহরটির প্রাণ বাঁচাইতে আশু উদ্যোগ গ্রহণ করিবে।