‘শরীরের নাম মহাশয়, যাহা সহাইবেন, তাহাই সয়’—এই কথা ঠিক নহে। বরং মানবশরীর চলে এক বিশেষ ছন্দে। যেই সকল কারণে সেই ছন্দের মধ্যে পতন ঘটে তাহার মধ্যে ‘অস্বাস্থ্যকর খাদ্য’ অন্যতম। মানুষের শরীরের ম্যাকানিজম একটি গাড়ির ম্যাকানিজম হইতে হাজার গুণ জটিল ও সূক্ষ্ম। একটি ভালো ইঞ্জিনের গাড়িকে নিত্যদিন যদি খারাপ তেল দিয়া চালানো হয়, তাহা হইলে উহার ইঞ্জিন অল্প কিছুদিনের মধ্যে যেমন বিগড়াইয়া যায়, তেমনি খারাপ খাবার কখনোই আমাদের সুস্থ এবং স্বাস্থ্যবান রাখিতে পারে না। ইহা লইয়া নূতন করিয়া বলিবার কিছু নাই যে, অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ, পরিবেশদূষণ, জীবনযাত্রায় পরিবর্তনসহ বিবিধ কারণে ডায়াবেটিস, হূদেরাগ, স্ট্রোক, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা, বিষণ্নতাসহ বিভিন্ন রোগের প্রকোপ বাড়িতেছে। ইহা যে আগামী দিনের স্বাস্থ্যব্যবস্থার উপর বড়ো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলিবে তাহাতে সন্দেহের অবকাশ নাই। এই জন্য স্বাস্থ্যকর খাবারের উপর জোর দিয়াছেন সারা বিশ্বের পুষ্টিবিদরা। তাহারা স্লোগান তুলিতেছেন—‘স্বাস্থ্যকর খাবার খাই/ রোগ প্রতিরোধে এগিয়ে যাই’। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে জাংকফুড, ফাস্টফুড ও ক্ষতিকর কোমল পানীয় পরিহার এবং স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের বিকল্প নাই।
এই বিচিত্র দেশে খাঁটি জিনিসের এতই অভাব যে, অনেক দ্রব্য বা পণ্যের গায়ে বা বিজ্ঞাপনে ‘খাঁটি’ শব্দটি ব্যবহার করিয়া ভোক্তাকে আশ্বস্ত করিবার পাশাপাশি ভয় দেখানো হয়—বাজারে সকল পছন্দের জিনিস খাঁটি হইবে, তাহার কোনো নিশ্চয়তা নাই। দৈনন্দিন জীবনের জন্য মাছ, মাংস, চাল, ডাল, সেমাই, দুধ, চিনি, মাংস, ফলমূল বা আপনার পছন্দের কোন জিনিসটি ক্রয় করিবেন খাঁটি জানিয়া? খাঁটি সরিষার তৈল, খাঁটি নারিকেলের তৈল, খাঁটি দুধ, খাঁটি মধু, আসল গরুর মাংস, মহিষের নহে বা আসল খাসির মাংস, ভেড়ার নহে—কথাগুলি নিত্যদিন শুনিতে শুনিতে অনেকেই এখন অতিমাত্রায় সন্দেহপ্রবণ হইয়া পড়িতেছেন এবং আসল আর ভেজাল চিনিতে ব্যর্থ হইতেছেন। আমাদের ইহা সকল সময় মনে রাখা উচিত, অসুস্থ হওয়াটা এক বিরাট অভিশাপ। সুস্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। কারণ সুখের সকল আলামত আপনার জগতে পরিপূর্ণ থাকিলেও কেবল ভগ্নস্বাস্থ্যের কারণে সকল সুখ অসুখে পরিণত হইয়া যায়। তবে সুস্থ থাকিবার জন্য সদা সচেষ্ট থাকা আবশ্যক। এই জন্য পুষ্টিগুণসম্পন্ন এবং স্বাস্থ্যকর খাবার সম্পর্কে জানার জন্য আমাদের সকলের একটু অধ্যবসায় থাকা দরকার।
আমরা দৈনন্দিন জীবনে যেই সকল খাবার খাই তাহার গুণমানের নিশ্চয়তা প্রদান করিবার জন্য রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু সংস্থা রহিয়াছে, কিন্তু তাহারা যে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করেন না, তাহা অস্বাস্থ্যকর খাবারের রমরমা দেখিয়াই বোঝা যায়। যেহেতু দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলি অস্বাস্থ্যকর খাবারের রমরমা প্রতিহত করিতে পারিতেছে না, সেই কারণে নিজেদেরই সচেতন হইতে হইবে অস্বাস্থ্যকর খাবারের ব্যাপারে। পরিবারের সকল সদস্যের জন্য একটি স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস গড়িয়া তুলিবার মাধ্যমে আমরা অনেক মারণ রোগেরই লাগাম টানিয়া ধরিতে পারি।
