আমার প্রথম ছড়া ছাপা হয়েছিল দৈনিক সংবাদে ১৯৬২ সালে। রোকনুজ্জামান খান দাদা ভাই ইত্তেফাকের কচি-কাঁচার আসরে আমার ছড়া ছেপেছিলেন। স্কুলে পড়ার সেই বয়সটায় খুব ছড়া লিখতাম। একদিন আমার বড়ো ভাই জিয়া হায়দার বললেন, ‘ছড়া লিখতে থাকলে সবাই তোকে ছড়াকার বলবে, কবিতা আর লিখতে পারবি না।’ এরপর ছড়া লেখা ছেড়ে কবিতার দিকে মন দিলাম। ১৯৬৬ সালে আমার দীর্ঘ কবিতা ছাপা হলো দৈনিক সংবাদে। দৈনিক ইত্তেফাক তখন স্বৈরাচারী শাসকের রোষানলে পড়ে বন্ধ। এই সময়টায় ৬৭, ৬৮, ৬৯ সালে অনেক কবিতা ছাপা হয়েছে অন্যান্য পত্রিকায়। তবে আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘যে আমাকে প্রেম শেখালো’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৬ সালে, বইমেলায়। দাম ছিল ছয় টাকা। মুক্তধারা থেকে বের হয়েছিল বইটি। দুই মাসেই প্রথম সংস্করণ শেষ হয়ে গিয়েছিল। আর সম্মানী পেয়েছিলাম ১২০ টাকা। আমার জন্য বিশাল ব্যাপার ছিল। জীবনে খুব বেশি বই প্রকাশ করিনি। এবারের মেলায় আমার জয়তী প্রকাশনী থেকে ষষ্ঠ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ পেয়েছে নাম ‘পাকশি লোকাল এক্সপ্রেস’।
যা বলছিলাম, তখন বইমেলা হতো সাত দিনের। সেই মেলা আজ বিশাল মহিরুহে পরিণত হয়েছে। তখন বইমেলা ছোটো হলেও বেশ জমাটি আড্ডা বসত। বইমেলা প্রাঙ্গণে। আমরা তখন উঠতি কবি। সেই আড্ডায় ঢুকে যেতাম। এই আড্ডায় এসে যুক্ত হতেন কবি-সাহিত্যিকরা। নির্মলেন্দু গুণ আসতেন মাঝে মাঝে। হাসান হাফিজুর রহমান, আবুল হাসান, রফিক আজাদ, শহীদ কাদরী, শামসুর রাহমান, সানাউল হক খান, হাবীবুল্লাহ সিরাজী—এরা প্রায় নিয়মিত আসতেন। মহাদেব সাহাকে মাঝেমধ্যে দেখা যেত।
আল মাহমুদ তখন আমাকে একবার বলেছিলেন, ‘কবিতা লিখছো ভালো। তবে, কবিতার ব্যাকরণ জানতে হবে।’ সেই কবিতাকে আয়ত্তে আনার চেষ্টা তখন থেকেই করে যাচ্ছি। এখন বুঝতে পারি শেখার কোনো শেষ নেই।
মেলা এখন বড়ো হয়েছে কিন্তু মেলার সেই আড্ডাটা আর নেই। লেখক-পাঠকের যে যোগসূত্র মেলাকে ঘিরে সৃষ্টি হতো সেটাও আর রইল কই! এটা ঠিক, সময়ের সঙ্গে সবকিছুই বদলাবে। আমাদের তা মেনেও নিতে হবে। কিন্তু তা বলে লেখালেখির প্রস্তুতি নেওয়া ছাড়া বই প্রকাশটা মানতে পারি না। ফেসবুক, সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এসব লেখার একটা তাত্ক্ষণিক পাঠক রয়েছে। কিন্তু এসব টিকছে না, টিকবে না। তরুণ কবিদের লেখায় দেখি প্রস্তুতি কম। নিজেকে যোগ্য করে তুলবার চেষ্টাও কম। শিল্পের অগ্রসরতা, সাহিত্যের অগ্রসরতা ঘটছে না। এটা দুঃখজনক।
