গন্তব্য হারং হুরং

আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৯:৩১

l সুমন্ত গুপ্ত

 

সিলেটি ভাষায় ‘হারং’ মানে সাঁকো বা বিকল্প পথ আর ‘হুরং’ মানে সুড়ঙ্গ। অর্থাত্ ‘হারং হুরং’ মানে হলো বিকল্প সুড়ঙ্গ পথ। কথিত আছে  ১৩০৩ সালে হযরত শাহজালাল (রহ)-এর সিলেটে আগমনের খবর পেয়ে রাজা গৌড় গোবিন্দ তার সৈন্যবাহিনীসহ পেঁচাগড় গিরিদুর্গের সুড়ঙ্গপথ দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার পর নিরুদ্দেশ হয়ে যান।

পড়ন্ত দুপুরের আমার সঙ্গী ডেনি শর্মা, অজয় আর সঞ্জয়। বাগানের আঁকাবাঁকা পথ অতিক্রম করতে হবে—এই ভেবে আমরা দুই চাকার যানকে সঙ্গী করে নিলাম। চৌহাট্টা, আম্বরখানা লাক্কাতুুরা চা-বাগানকে পাশ কাটিয়ে মিনিট দশেকের মধ্যেই আমরা পৌঁছে গেলাম ১৮৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রথম চা-বাগান মালনিছড়ার মূল কার্যালয় সংলগ্ন রাস্তার মাথায়। বাগানের মুখে বেশ কয়েকজনকে দেখলাম জটলা করে বসে আছে।  জিজ্ঞেস করলাম, হারং হুরং সুড়ঙ্গ চিনেন নাকি? সবার মুখের ভাব দেখে মনে হলো চিনেন না! পরে মনে হলো, রাজা গৌড় গোবিন্দের কথা বললে হয়ত চিনবে, ঠিক তাই হলো।

আমার বাগানের এক কুলিকে পথপ্রদর্শক হিসেবে পেলাম, তার নাম জগন্নাথ। সে এই পথ প্রদর্শনের জন্য দুইশ টাকা দাবি করলে আমরা ‘না’ করিনি।

আমরা বাগানের মিষ্টি পথ ধরে এগিয়ে চলছি। এক-দেড় কিলোমিটার পরেই বাগানের বালুময় পথের শুরু। দুপাশে নাতিউচ্চ টিলায় সুবিন্যস্ত চায়ের বাগান, তার মাঝে সোজা আকাশের দিকে উঠে যাওয়া শেড গাছ মিলে আশ্চর্য এক সবুজের ধারা তৈরি করেছে। অসাধারণ এক প্রাকৃতিক মোহের মাঝে আমরা এগিয়ে চলছি। বৃষ্টির ফলে বাগানের ছরাগুলোতে পানির প্রবাহ বেশি আর পানির মোহনীয় শব্দে মন ভরে যায়। কিছু কিছু পথ খুব ভাঙ্গাচোরা। খুব সাবধানে দুই চাকার যান নিয়ে আমরা এগিয়ে চলছি। চলিত পথে কথা হলো জগন্নাথের সাথে। সে বলল, বাগানের লোকদের কাছে হারং হুরং সুড়ঙ্গ ‘গৌড় গোবিন্দ রাধা গুহা’ নামে অধিক পরিচিত। তারা প্রতি শনি ও মঙ্গলবারে পূজা দেয় এখানে।

আমরা পৌঁছে গেলাম তেলিহাটি চা বাগানে। শুরুতেই ছোট বাজারের মতো, রয়েছে কিছু চায়ের দোকান, চা-শ্রমিকদের কিছু ঘর, রাগীব-রাবেয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় আর একটা মসজিদ। আমরা চলছি। হঠাত্ করে জগন্নাথ বলে, বাবু আমরা ভুল পথে চলে এসেছি রাস্তাটা অন্যদিকে হবে হয়ত। আপনারা এখানে অপেক্ষা করেন আমি সামনে গিয়ে খোঁজ নিয়ে আসি।

আমার ভাবলাম রাস্তাটা খুব চমত্কার, জগন্নাথ রাস্তার খোঁজ নিয়ে আসুক। এই ফাঁকে আমরা ছবি তুলে নিই। এক সময় অজয় মনে করিয়ে দিল—প্রায় আধা ঘণ্টা হতে চলল,  কিন্তু জগন্নাথ তো ফিরে এলো না। আমারও মনে হলো ঠিক তাই তো জগন্নাথ তো এখনো এলো না এদিকে সন্ধ্যা হতে চলল, মোবাইলের নেটওয়ার্কও নেই, জনমানবশূন্য চারদিক। এর মাঝে ডেনি আরো ভয়ংকর কথা শুনাল—ওরা বাইকে তেল লোড করে আসেনি দূরত্ব খুব বেশি হবে না ভেবে। বেশ কিছুক্ষণ পর আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম সামনে না এগিয়ে ফিরে যাওয়ার। আমরা ফিরছি। দশ-পনেরো মিনিট পর আমার মনে হলো আমরা ঠিক পথে ফিরছি তো? কিছুদূর এগিয়ে বললাম, আমরা ভুল রাস্তায় এগুচ্ছি। এবার সবাই মিলে মটরসাইকেলের চাকার দাগ খুঁজতে লাগলাম। অন্যপথে গিয়ে আমরা দেখা পেলাম সেই কাঙ্ক্ষিত চাকার দাগ। মনে এবার সাহস বাড়ল।

কিছুদূর যেতে দেখা পেলাম জগন্নাথের, দৌড়ে আসছে। আমাদের দেখে ও বলল, বাবু আমার এক কাকাকে নিয়ে এসেছি, এবার আমরা যেতে পারব। আমি মনে মনে জগন্নাথকে নিয়ে কি যেন আজেবাজে চিন্তা করছিলাম। আসলে সত্যি কথা বলতে—বাগানের লোকগুলো অতিসাধারণ এবং এরা খুব সত্। জগন্নাথ আর তার কাকাকে নিয়ে বিশ মিনিট পর পৌঁছলাম বুনো এক পরিবেশে।

তেলাহাটির দক্ষিণে হিলুয়াছড়া চা বাগানের ১৪ নং সেকশনের পাশে অবস্থিত হারং হুরং।  ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, পাহাড় আর জঙ্গল যেন আমন্ত্রণ জানাল হারং হুরং-এ। এর তিনটি সুড়ঙ্গ। এগুলো বেশ অন্ধকার। একদিকে সবুজ পাহাড়ি অরণ্য, আরেকদিকে সুড়ঙ্গ দেখে নস্টালজিক হয়ে গেলাম। আমরা চারজনই পালা করে সুড়ঙ্গগুলোতে ঢুকলাম, ছবি তুললাম। কিন্তু অন্ধকার আর ভয়াল পরিবেশের কারণে ভেতরে খুব বেশিদূর দেখার সাহস হলো না। এর মধ্যে ডেনি ভেতরে কিসের যেন শব্দ শুনতে পেল। উত্সুক দৃষ্টিতে চেয়ে দেখলাম বাদুড় । মূল সুড়ঙ্গটি বালিভর্তি হয়ে প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম। থেমে থেমে টিলা চুইয়ে আসা পানির টিপ-টিপ শব্দ আর বাদুরের ডানাঝাপটানোর আওয়াজ নিশ্চিতভাবে কোনো হরর ছবির কথা মনে করিয়ে দেবে। বড় সুড়ঙ্গটায় দাঁড়ানো যায়। দেয়ালজুড়ে শ্যাওলা।

মোবাইলের আলোয় সুড়ঙ্গের অন্ধকারভেদ করা গেলো না। বেশি ভেতরে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলো। বিষাক্ত সাপ, পোকামাকড় থাকা খুবই স্বাভাবিক। হয়তো অনেক রহস্য লুকিয়ে রয়েছে এখানে। তার মাঝে এক খোঁড়লের মধ্যে মোমবাতি আর আগরবাতি দেখে বুঝলাম, এখানে চাশ্রমিকেরা পূজো করে। পাহাড়ি-জংলি, বন্ধুর পথে গাইড ছাড়া চলাফেলা করা কতটা বিপজ্জনক হতে পারে তা টের পেলাম। আমি জগবন্ধুকে জিজ্ঞেস করলাম, সুড়ঙ্গ কোন পর্যন্ত গিয়েছে? কেউ সুড়ঙ্গ পেরিয়ে দেখতে পারেনি? তিনি বললেন, সুড়ঙ্গটির বয়স প্রায় সাতশ বছর বা তারও বেশি। এটাকে কেন্দ্র করে নানা লোককাহিনি স্থানীয়দের মাঝে প্রচলিত আছে। অনেকে বলে, এ সুড়ঙ্গ জৈন্তা পর্যন্ত গেছে।

 

যেভাবে যাবেন

 

সিলেটের আম্বরখানা থেকে অটোরিকশায় করে যাওয়া যায়। মালনিছড়া চা বাগানের মূল কার্যালয়ের সামনে গাইড পাবেন। দেড়-দুইশ টাকার মধ্যেই পাবেন গাইড। তাদের নিয়ে সিএনজি বা টমটমে তেলিহাটি। ভাড়া জনপ্রতি বিশ টাকা। আম্বরখানা থেকে তেলিহাটি রিজার্ভ যেতে খরচ পড়বে দুইশ টাকা। বাইকে যেতে চাইলে মালনিছড়া বাগান থেকে অনুমতি নিতে হবে।