গরিবের আয়ু, ধনীর আয়ু

আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২২:০৮

একজন মানুষ দীর্ঘায়ু কেন হয়, আরেকজন কেন তাহার তুলনায় কম আয়ু পাইয়া থাকে, তাহার কোনো বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা আজও পাওয়া যায় নাই। কেহ বলেন, অমুক খাবার খাইলে দীর্ঘকাল বাঁচিয়া থাকা যায়; আবার কেহ বলেন, অমুক জিনিস খাইলে বা ব্যবহার করিলে মানুষের আয়ুষ্কাল কমিয়া যায়। ইহার কোনোটারই সমর্থনে কোনো শক্তিশালী জরিপ পাওয়া যায় না। তবে জাতিসংঘ উন্নয়ন সংস্থা ইউএনডিপি মানুষের সামষ্টিকভাবে বাঁচিয়া থাকা সম্পর্কে যে রিপোর্ট প্রকাশ করিয়াছে, তাহা যথার্থ এবং যুক্তিগ্রাহ্য। সংস্থাটি জানাইয়াছে, উচ্চ আয়ের মানুষের তুলনায় জীবনযাত্রার মানেই শুধু নিম্ন আয়ের মানুষরা পিছাইয়া থাকে না,  বরং উচ্চ আয়ের মানুষ এবং নিম্ন আয়ের মানুষের গড় আয়ুর পার্থক্য ১৯ বত্সর! অর্থাত্ নিম্ন আয়ের পরিবারে জন্ম নেওয়া একজন সদস্যের গড় আয়ু হয় ৫৯ বত্সর। পক্ষান্তরে উচ্চ আয়ের পরিবারে জন্ম নেওয়া সদস্যের গড় আয়ু ৭৮ বত্সর। এই হিসাব গোটা বিশ্বের জন্য প্রযোজ্য।

ইহা খুবই স্বাভাবিক। এই রকম তারতম্য হইবার বৈজ্ঞানিক  ব্যাখ্যা ও কারণ আমাদের অজানা নহে। উচ্চবিত্তের পরিবারে অপেক্ষাকৃত বিশুদ্ধ খাবার জুটিয়া থাকে। যেহেতু তাহারা বিত্তের কারণে শিক্ষায়ও বেশি অগ্রসর, স্বভাবতই স্বাস্থ্যসচেতনতাও তাহাদের বেশি। ইহা ছাড়া চিকিত্সাক্ষেত্রেও তাহারা অপেক্ষাকৃত বেশি উন্নত চিকিত্সা গ্রহণ করিয়া থাকে। আর পরিবেশগত স্বাতন্ত্র্য তো রহিয়াছেই।

বিষয়টি যখন এই রকম, তখন স্বল্প আয়ের মানুষদের চেষ্টা করিতে হইবে তাহাদের আয় এমন একটা পর্যায়ে লইয়া যাওয়ার চেষ্টা করা, যাহাতে তাহারা জীবনযাত্রার মান বাড়াইতে পারে। এই জীবনযাত্রার মান বাড়াইতে সবারই কোটিপতি হওয়া বা শিল্পমালিক হইবার দরকার নাই। কেবল সন্তোষজনক আয় এবং সেই আয়ে সুস্থ ব্যবস্থাপনাই যথেষ্ট। আমরা জানি, স্বল্প আয়ের  জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটি বিশাল অংশ হতদরিদ্র। তাহারা তুষ্ট হইবার মতো খাদ্য হইতে বঞ্চিত। ফলে তাহাদের একটি বড়ো অংশ আবার পুষ্টিহীনতায়ও ভুগিয়া থাকে। সেই সঙ্গে এই জনগোষ্ঠী স্বাস্থ্যসচেতনও নহে। এই স্বাস্থ্যসচেতনতার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত শিক্ষাপ্রাপ্তিও। সুতরাং স্বল্প আয়ের জনগোষ্ঠীর গড় আয়ু বৃদ্ধি করিতে হইলে উপরিউক্ত বিষয়গুলির দিকে নজর দিতে হইবে। এই নজরদারি যেমন ব্যক্তির নিজের করিতে হইবে, তেমনি বিভিন্ন রাষ্ট্রকেও নিজ নাগরিকদের পাশে আসিয়া দাঁড়াইতে হইবে। আমরা চাই, জগতে জন্মগ্রহণকারী প্রতিটি মানুষ জীবদ্দশায় সুস্থ হইয়া বাঁচুক এবং যতটা সম্ভব দীর্ঘায়ুর জন্য নিজস্ব গণ্ডিকে প্রস্তুত করিয়া তুলুক। মানুষ একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বাঁচিয়া থাকিবে—ইহাই প্রকৃতির বিধান। মানুষের সাধ্য নাই নিজেকে শত যত্ন করিয়াও ২০০ বত্সর পর্যন্ত বাঁচাইয়া রাখিবার। কিন্তু স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল যতটা সম্ভব দীর্ঘায়িত করিবার প্রচেষ্টা সকলেরই থাকা উচিত। আর এই প্রচেষ্টার প্রধান উপায় হইল সচেতন থাকা। আবার সর্বদাই যে অর্থকড়ি বা উচ্চ আয়ের মাধ্যমে সচেতন থাকা যায়—বিষয়টি এইরকমও নহে। কষ্টকর হইলেও সচেতন একজন স্বল্প আয়ের মানুষও হইতে পারেন। অর্থাত্ সঠিক পথে আয় বৃদ্ধির প্রচেষ্টা, সচেতন ও স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাসে স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য রাখার প্রচেষ্টা থাকিলে ইউএনডিপির এই হিসাব পালটাইয়া যাইবে।