মশার উপদ্রব বড়োই যন্ত্রণাদয়ক। একটি ছোট্ট প্রাণীর নিকট মানুষ কতটা অসহায় তাহা আজ সহজেই অনুমেয়। রাজধানী ঢাকায় মশার উত্পাত নূতন নহে। ‘রাতে মশা, দিনে মাছি, এই নিয়া ঢাকায় আছি’ এমন কথা আজ প্রবাদবাক্যতুল্য। তবে গত কয়েক বত্সর ধরিয়া ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাবের পর এই সকল কিছুকে ছাড়াইয়া মশা আরো ভয়ংকর প্রাণী হিসাবে আমাদের নিকট আবির্ভূত হইয়াছে। একসময় মানুষ ম্যালেরিয়ার নাম শুনিলে আঁতকাইয়া উঠিত। এখন ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার নাম শুনিলে বুকে কাঁপন ধরে। এই কারণে মশা নিয়া আমাদের এখন অধিক সাবধানতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।
খবরে প্রকাশ, আগামী ১৫ দিনে ঢাকায় মশার উপদ্রব আশঙ্কাজনক হারে বাড়িতে পারে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা যায়, কিউলেক্স মশার লার্ভার ক্ষেত্রে প্রতি ৫০০ এমএল পানিতে মশার ঘনত্ব পাওয়া গিয়াছে ২০০-এরও বেশি। ড্রেন ও ডোবায় অগণিত ডিম দিয়া যাইতেছে মশার দল। অনেক দিন ধরিয়া কোনো বৃষ্টিপাত না হওয়ায় মশা জন্মানোর স্থানগুলিতে পানির অর্গানিক ম্যাটারিয়াল বাড়িয়াছে যাহা কিউলেক্স মশার লার্ভার উত্কৃষ্ট খাদ্য। তাহাছাড়া ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময় হইতে সারাদেশে তাপমাত্রা কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়ায় মশা জন্মানোর ইহা একটি উপযুক্ত মৌসুম। অন্যদিকে আরেক পরিসংখ্যানে বলা হইয়াছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ১২ শতাংশ এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ১০ শতাংশ ওয়ার্ডে এডিসের লার্ভার ঝুঁকিপূর্ণ উপস্থিতি রহিয়াছে। এমতাবস্থায় এই বত্সর মশার উপদ্রবজনিত অধিক দুর্ভোগ আমাদের পোহাইতে হইতে পারে। এইজন্য মশা নিধনে এখন হইতে ক্র্যাশ প্রোগাম গ্রহণ করিবার দাবি উঠিয়াছে।
জানা মতে, বাংলাদেশে ১২৩ প্রজাতির মশা রহিয়াছে। ঢাকা শহরে রহিয়াছে ১৩ প্রজাতির। ইহার মধ্যে ৯৫ শতাংশই কিউলেক্স মশা। এই কিউলেক্স মশার প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস করিতে হইলে ড্রেন, ডোবা ও নর্দমার পানি প্রবাহমানতা বজায় রাখিতে হইবে। লার্ভা মারিবার কীটনাশক নিয়মিত স্প্রে করিতে হইবে। তবে এই কীটনাশকের অপপ্রয়োগ ও প্রয়োগে অদক্ষতার অভিযোগও বিদ্যমান। কীটনাশকে ভেজাল থাকিবার কারণে ঢাকার মশা কীটনাশক প্রতিরোধী হইয়া উঠিবার কথাও শোনা যায়। এইজন্য চলমান ব্যবস্থার বদলে ইনটিগ্রেটেড মসকিউটো ম্যানেজমেন্ট বা আইএমএম ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক। ইহার মাধ্যমে একটি পৃথক মশা নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা যায়। মশা নিয়ন্ত্রণে থারমাল ফগার, ইউএলডি স্প্রেয়ার ইত্যাদি নূতন নূতন যন্ত্রপাতি ব্যবহারের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ ব্যবহার করিতে হইবে যেমন—লাইট ট্র্যাম্প, বিজি ট্র্যাপ, গ্রাভিড ট্র্যাপ, অভি ট্র্যাপ ইত্যাদি। নিয়মিত সার্ভিলেন্স করিয়া কোথায় কোন প্রজাতির মশা আছে, তাহা জানিয়া কীটনাশক (ড্রোজসহ) প্রয়োগ করিতে হইবে। তাহা ছাড়া কোন এলাকায় মশা কী মাত্রায় কীটনাশক প্রতিরোধী হইয়াছে তাহাও গবেষণার মাধ্যমে জানিতে হইবে। পাশাপাশি মশার জীবতাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণ জরুরি। এই কাজে ওলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়া (স্ত্রী মশার উর্বর ডিম উত্পাদন ব্যাহত করিয়া), মেল স্টেরাইল টেকনিক (মশাদের মেটিং হইবে; কিন্তু ডিম উত্পাদিত হইবে না), বিভিন্ন মশক প্রিডেটরস যেমন—মশক মাছ (গ্যামবুসিয়াসহ অন্যান্য), ওয়াটার বাগ, বিটল ইত্যাদি ব্যবহার করা যাইতে পারে।
