হাসান জাবির
এই সময়ে বিশ্বরাজনীতির অন্যতম প্রধান নীতিনির্ধারণী শক্তি রাশিয়ান ফেডারেশন। বিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তিগত সাফল্যের নেতৃস্থানীয় দেশ রাশিয়া আয়তনে বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো। আধুনিক বৈজ্ঞানিক সাফল্যের মধ্যে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনা মহাকাশ মিশনের পথিকৃত্ সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্তরসূরি রাষ্ট্র রাশিয়ান ফেডারেশন। বিশ্বের সর্বমোট আবাসযোগ্য ভূমির উল্লেখযোগ্য অংশই দেশটির। ৮৪টি ফেডারেল বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে রাশিয়ান ফেডারেশনের বর্তমান সংবিধান অনুসারে দেশটির শাসনব্যবস্থা সেমি প্রেসিডেন্সিয়াল। যেখানে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট দেশের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। সংবিধানের ৮০ নম্বর অনুচ্ছেদের আলোকে রাশিয়ান ফেডারেশনের প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ও দায়িত্ব নির্ধারিত। রুশ ফেডারেশনের প্রেসিডেন্টই দেশের প্রথম সম্মানীয় ব্যক্তি, একই সঙ্গে তিনি রুশ সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ। বাস্তবায়নাধীন কমনওয়েলথ অব ইন্ডিপেন্ডেন্টস স্টেটস বা সিআইএসের সম্মিলিত সামরিক কমান্ডের প্রধান দায়িত্বশীল ব্যক্তিও রুশ ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট। অন্যদিকে ফেডারেল সংবিধানের ৮১ নম্বর অনুচ্ছেদ দেশটির নির্বাচনি প্রক্রিয়া ও এতত্সংশ্লিষ্ট বিষয় নির্ধারণ করে দিয়েছেন। ঐ আলোকে রাশিয়ান ফেডারেশনের প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার বর্তমান মেয়াদ ছয় বছর। এক্ষেত্রে টানা দুই বারের বেশি প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের সীমাবদ্ধতা আছে। অন্যদিকে সংবিধানের ৮২ থেকে ৯৩ অনুচ্ছেদসমূহের বিস্তৃত বর্ণনা রুশ ফেডারেশনের প্রেসিডেন্টের যাবতীয় কার্যক্রম, দায়িত্ব ও সীমাবদ্ধতা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। রুশ ফেডারেশনের প্রেসিডেন্টই দেশটির সরকারপ্রধানকে মনোনয়ন দিয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে দুই কক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট নিম্নকক্ষ স্টেট ডুমা ও উচ্চকক্ষ ফেডারেশন কাউন্সিলের অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা আছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ অনির্ধারিত। হেড অব দ্য গভর্নমেন্ট হিসেবে রুশ ফেডারেশনের প্রধানমন্ত্রীই দেশটির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।
বর্তমান সংবিধানের ২৪ অনুচ্ছেদে রুশ ফেডারেশনের প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ও দায়িত্ব সম্পর্কে নির্দেশনা দেওয়া আছে। আটটি ফেডারেল ডিসট্রিক্টে বিভক্ত দেশটির স্থানীয় সরকারব্যবস্থা। সাধারণত স্থানীয় সরকারপ্রধানরা প্রেসিডেন্ট কর্তৃক মনোনীত হন। অন্যদিকে রুশ ফেডারেশনের স্থানীয় সরকারব্যবস্থার আটটি প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ হলেও দেশটির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শহরকে স্থানীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে রাখা হয়েছে। শহরগুলো হচ্ছে সেন্ট্রাল ডিসট্রিক্টের অন্তর্ভুক্ত ফেডারেশন রাজধানী ও বিশ্বের সর্বাধিক জাঁকজমকপূর্ণ সিটি মস্কো, নর্থওয়েস্ট ডিসট্রিক্টের অন্তর্ভুক্ত ও বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ সিটি সেন্ট পিটার্সবার্গ এবং ২০১৪ সালে রাশিয়ান ফেডারেশনে যোগ দেওয়া ক্রিমিয়ার রাজধানী সেভাস্তারপুল দেখভালের যাবতীয় দায়িত্ব নিয়েছেন ক্রেমলিন।
স্নায়ুযুদ্ধের টানটান উত্তেজনা শেষে ৯০ সালে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনৈতিক বিপর্যয়জনিত ক্ষতির আলোকে নব্বইয়ের দশক জুড়ে রাশিয়া ব্যাপক অর্থনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত ছিল। প্রায় এক দশক জুড়ে দেশটির অর্থনৈতিক মন্দাভাবের প্রভাব দেশটিকে বিব্রতকর অবস্থার দিকে ঠেলে দেয়।
ঐ সময়গুলোতে ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ে রাশিয়ার বৈশ্বিক ভূমিকা। এর প্রতিক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির মিত্ররা হতাশ হয়ে পড়েন। এই সুযোগে আমেরিকা ও তার পশ্চিমা মিত্রদের পরিকল্পনায় শক্তিশালী হয় একপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থা। কিন্তু রুশ জনগণ এই বাস্তবতা মেনে নিতে পারে না।
তাদের ভেতর একধরনের মনোবেদনার সঞ্চার হয়। এমন প্রেক্ষাপটেই রাশিয়ান ফেডারেশনের রাজনীতিতে আবির্ভাব ঘটে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য, কেজিবি গোয়েন্দা ও আইনের ছাত্র পুতিনের হাত ধরে সহসাই জেগে ওঠে রাশিয়া।
পুতিনের গৃহীত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হতে থাকলে দ্রুতই পালটে যায় দেশটির চিত্র। ২০০১ সালের শুরুতেই রাশিয়া বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় জ্বালানি উত্পাদক হিসেবে নাম লেখায়। অন্যদিকে ইউরোপে গ্যাস রপ্তানির মাধ্যমে দেশটির রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার সম্প্রসারণ ঘটে। ঐ সময়ের কিছুটা পরেই রাশিয়া তার বৈশ্বিক ভূমিকা পালনের আগ্রহ প্রকাশ করে ‘নতুন বিশ্ব প্যাটার্ন’ নামক একটি রূপরেখা ঘোষণা করেন। এই সূত্র ধরে স্নায়ুযুদ্ধ-উত্তর যুগে দেশটি প্রথম নিজ ভূখণ্ডের বাইরে সামরিক কর্মকাণ্ড শুরু করে। গত দুই দশকে রাশিয়া নিজেকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে। রাশিয়ার এই সাফল্যের অন্যতম প্রধান রূপকার হিসেবে যার নামটি সর্বাধিক আলোচিত হয় তিনি হচ্ছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও তার কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সহযোগী। এক্ষেত্রে পুতিনের পরেই আলোচনায় আসেন রাশিয়ান ফেডারেশনে পরবর্তী নেতা হিসেবে যার নামটি সর্বাধিক আলোচিত হয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রী সার্গেই শুইগো, সাবেক প্রেসিডেন্ট মেদভেদেব, ক্রেমলিনের উপদেষ্টা উশানভ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সার্গেই ল্যাভরভ শ আরও অনেকেই। অন্যদিকে ২০২৪ সালের পর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেয়াদ শেষ করবেন পুতিন। বর্তমান সংবিধানমতে, পুতিন আরেকবার প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। যে কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পুতিন-উত্তর রাশিয়ার নতুন নেতা ও দেশটির ভবিষ্যত্ নিয়ে এক ধরনের আগ্রহ আলাদাভাবে লক্ষ করা যায়। এই পরিপ্রেক্ষিতে মাত্র কিছুদিন আগে স্টেট অব দ্য নেশন্স ভাষণে প্রেসিডেন্ট পুতিনের কিছু কথাকে পূর্বাভাস হিসেবে ধরে নিয়ে রুশ সংবিধানের পুনর্গঠন প্রসঙ্গটি অত্যন্ত জোরালো হয়েছে। পুতিনের বক্তব্যের সূত্র ধরে যেসব বিষয় আলোচিত হচ্ছে তার মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্ব পাচ্ছে সাংবিধানিক ক্ষমতাকাঠামোর পরিবর্তন, নেতা হিসেবে পুতিনের থেকে যাওয়া না-যাওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। এক্ষেত্রে রুশ সংবিধানের সংশোধনী এনে এক ধরনের সাংবিধানিক পুনর্গঠনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে রাশিয়া। এমনটি এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
তবে স্টেট অব দ্য নেশন্স ভাষণের পর যেসব আলোচনা অগ্রাধিকার পাচ্ছে সেখানে রুশ জনগণের মনের আশা পূরণের লক্ষ্যে পুতিনকে সাংবিধানিক ক্ষমতাবলয়ের কেন্দ্রে রাখার প্রচেষ্টা কোনো মিথ নয়। এটি সত্যি যে রুশ নেতৃত্ব ও জনগণ এমনটি চাইছেন। প্রশ্ন হচ্ছে সেটি কীভাবে ঘটবে?
১৯৯৩ সালে নতুন সংবিধান গৃহীত হওয়ার পর এযাবত্ চারটি সংশোধনী আনা হয়েছে। এই চারটি সংশোধনীর প্রত্যেকটিই হয়েছে শাসনব্যবস্থাসংক্রান্ত। তাই দেশটিতে আরো কিছু সাংবিধানিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট পুতিনকে ক্ষমতার কেন্দ্রে রাখার যে আলোচনা এটা খুব কঠিন কোনো ব্যাপার নয়। প্রায় দীর্ঘ ২০ বছর ধরে পুতিনের একান্ত প্রচেষ্টায় রাশিয়ার অর্জিত সাফল্য, তা ধরে রাখতে ক্ষমতার কেন্দ্রে পুনরায় তাকে পেলে রুশরা খুশিই হবে। একই সঙ্গে সহযোগীদের মধ্যেও পুতিন বেশ জনপ্রিয়। তাকে চ্যালেঞ্জ করার মতো বিকল্প রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এই মুহূর্তে রাশিয়া অনুপস্থিত। অন্যদিকে তার রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টিও এই মুহূর্তে ব্যাপক জনপ্রিয়। রুশ পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে তাদের প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাও আছে। যে কারণে পুতিনকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার সাংবিধানিক পুনর্গঠনের যে আভাস পাওয়া যাচ্ছে তা বাস্তবসম্মত হতে খুব বেশি বাধা নেই। এমনটি ধরে নেওয়াই যেতে পারে যে রাশিয়ার ক্ষমতাকেন্দ্রে পুতিন থাকছেন। প্রশ্ন হচ্ছে কীভাবে থাকবেন? তিনি আবারও প্রেসিডেন্ট হবেন, নাকি সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে শাসনব্যবস্থা-সংক্রান্ত নতুন গুরুত্বপূর্ণ পদ সৃষ্টি করবেন?
আমরা সবাই জানি, রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন একই সঙ্গে রুশ-বেলারুশ মন্ত্রিসভার চেয়ারম্যান। রুশ-বেলারুশ সম্পর্কের অতীত, সাম্প্রতিক ধারাবাহিকতা সম্পর্কে যারা জানেন তারা নিশ্চয় অবগত আছেন যে দেশ দুটি আবারও একীভূত হওয়ার চিন্তা করছে। এরকম সম্ভাবনা আরো কয়েকটি দেশের। কাস্টমস ইউনিয়ন চুক্তি পর্যালোচনা করলে এ ব্যপারে কিছু ধারণা পাওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলোর সংগঠন সিআইএসকে আরো শক্তি করার লক্ষ্যে মস্কো তত্পর আছেন। এই তত্পরতায় সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হছে মস্কোর নেতৃত্বে একটি যৌথ সামরিক কমান্ড গঠনের। বলা চলে, পুতিনের এসব বিচক্ষণ পরিকল্পনা যেন কোনোভাবেই ভেস্তে না যায়, সেদিকেই তাকিয়ে আছে রুশ জনগণ।
এক্ষেত্রে পুতিনের অনুপস্থিতি জাতীয় ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে। যে কারণে রাশিয়ার সাংবিধানিক পুনর্গঠনের সম্ভাবনাকে দেশটির জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবেই ধরে নেওয়া যেতে পারে। আর এর মধ্য দিয়ে রাশিয়া আরো শক্তিশালী হবে—এ ব্যপারে কোনো সন্দেহ নেই।
n লেখক :বিশ্লেষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা
