কর্নেল মো. সোহেল রানা, পিএসসি
গত ১০ বছরে বাংলাদেশের অবকাঠামোতে অভূতপূর্ব পরিবর্তন এসেছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র, ঢাকা মেট্রোরেল, পদ্মা সেতু, বরিশাল/কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণ, কর্ণফুলী টানেল, উত্তরবঙ্গের রাস্তা প্রশস্তকরণসহ মেগা প্রজেক্ট শেষ হবার পর বাংলাদেশ নিশ্চিতভাবে এশিয়া মহাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রাষ্ট্রে পরিণত হবে। ক্ষমতাসীন সরকার সুপরিকল্পিতভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আধুনিক ও যুগোপযোগী অবকাঠামো নির্মাণ করে দিচ্ছেন, যেন সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের জনগণ এই সুবিধা কাজে লাগিয়ে স্বাবলম্বী ও স্বনির্ভর হতে পারে। অন্যদিকে ২০১৯ সালে ১৫ লক্ষাধিক বাংলাদেশি চিকিত্সা, বিনোদন বা ব্যবসার উদ্দেশ্যে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ভ্রমণ করেছে। এ সুবিশাল পর্যটক গোষ্ঠীর যাতায়াত সহজতর করার জন্য ভারত ঢাকায় বিশ্বের সর্ববৃহত্ ভিসাকেন্দ্র স্থাপন করেছে। এছাড়া বিভিন্ন স্থলবন্দরের অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নয়নের মাধ্যমে পর্যটনব্যবস্থাকে করেছে user friendly। ফলত প্রতিবেশী দেশ অত্যন্ত ন্যায্যভাবেই বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। আন্তর্দেশীয় যাতায়াত শুধু এই অঞ্চলেই নয়, বরং সারা বিশ্বেই সহজ ও দ্রুততর করা হয়েছে। তাই শুধু ভারতেই নয়, পৃথিবীর অধিকাংশ রাষ্ট্র শুধু ক্রমবর্ধমান পর্যটন খাত থেকেই দেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামো মজবুত করেছে। অথচ পৃথিবীর সর্ববৃহত্ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট ও দীর্ঘতর বালুভাট থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ বিশ্বের পর্যটকদের আকর্ষণে ব্যর্থ হচ্ছে আর হারাচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নিশ্চিত খাত। এই বাস্তবতায় উত্তরাঞ্চলের অবকাঠামোতে সরকার সামান্য সুনজর দিলেই শুধু পর্যটন খাতেই এনে দিতে পারে বিপুল সফলতা। এই অঞ্চলের বিশাল পরিত্যক্ত ও স্বল্প ব্যবহূত খাসজমি ব্যবহার করলে গড়ে উঠতে পারে ইপিজেড, মেডিক্যাল বা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, যার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে অব্যবহূত কিন্তু বিপুল সম্ভাবনাময় ‘ঠাকুরগাও বিমানবন্দর’।
২. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯৪৬-১৯৪৭ সালে তত্কালীন দিনাজপুর এবং বর্তমানে ঠাকুরগাঁও জেলার শিবগঞ্জে ১৭৮.৩৭ একর জমি অধিগ্রহণ করে ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর স্থাপন করা হয়। ১৯৬১ সালে উক্ত ১৭৮.৩৭ একর জমি থেকে ৯৩.২৫ একর জমি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের ব্যবহারের জন্য প্রস্তাব করা হয় এবং অবশিষ্ট ৮৫.১২ একর জমি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের হাতে ন্যস্ত হয়। বেসামরিক কর্তৃপক্ষ উক্ত ৯৩.২৫ একর জমি কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে বিমানবন্দরটি বিমান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে সৈয়দপুর বিমানবন্দর চালু হওয়ার পর যাত্রীস্বল্পতার কারণে ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ২০০২-২০০৩ সালে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়াধীন জমি থেকে রানওয়ে ছাড়া ৬৮.২৫ একর চাষযোগ্য জমি স্থানীয়দের কাছে ইজারা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বিভিন্ন শর্তে তাদের অধীনস্থ ৯৩.২৫ একর জমি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হাতে ন্যস্ত করে।
এয়ার স্ট্রিপের অন্যান্য তথ্য নিম্নরূপ : ১. মোট জমি : ১৭৮.৩৭ একর। ২. দৈর্ঘ্য : ৫৬৮০ ফুট। ৩. প্রস্থ :৭০ ফুট। ৪. রানওয়ের দিক : ২৭/০৯। ৫. ট্যাক্সিওয়ে : ০১টি। ৬. কনট্রোল টাওয়ার :০১টি (অকেজো)। ৭. উড্ডয়ন ও অবতরণপথে কোনো উঁচু গাছ বা স্থাপনা নেই, যা আদর্শ বিমানবন্দরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ৩. ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর কীভাবে জনপদের চিত্র বদলে দিতে পারে
বর্তমানে নিকটস্থ সৈয়দপুর বিমানবন্দরে যাত্রী চলাচল বহুলাংশে বৃদ্ধি পেলেও এর সুবিধা পেতে ঠাকুরগাঁও/পঞ্চগড়ের জনগণকে দীর্ঘ সড়কপথ পাড়ি দিতে হয়। অন্যদিকে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দরের গুরুত্ব অপরিসীম। এটি দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। এখান থেকে ভারতের আকাশপথে দূরত্ব ২১ কিলোমিটার, ভুটানের দূরত্ব ১২০ কিলোমিটার, নেপালের দূরত্ব ৫৬ কিলোমিটার। এসব অঞ্চলের বিশাল জনগোষ্ঠী খুব সহজে সড়কপথে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে। তাদের আগমন চিকিত্সা বা ব্যাবসায়িক কারণে না হলেও দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত পর্যটন এলাকা ভ্রমণ হতে পারে। ভুটান বা নেপাল তথা ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহারসহ উত্তরের রাজ্যসমূহের জনগণের কাছে কক্সবাজার, কুয়াকাটা বা সুন্দরবন হতে পারে আকর্ষণীয় ভ্রমণকেন্দ্র। অন্যদিকে দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও বা পঞ্চগড় এলাকা শুধু কৃষিনির্ভর এলাকা। কলকারখানা, শিল্পাঞ্চল বা অন্যান্য অর্থ উপার্জনকারী ব্যবস্থা না থাকাতে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক মুক্তি সুদূর পিছিয়ে।
৪. ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দরের সামরিক গুরুত্ব
ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর চালু হলে এর সামরিক গুরুত্ব অপরিসীম। যেমন : ক। যুদ্ধকালীন সময়ে দ্রুত ও জরুরি সেনা মোতায়েন, আকাশ থেকে পর্যবেক্ষণ, রসদ সরবরাহ পরিচালনা ও হতাহতদের দ্রুতভাবে হস্তান্তরের কাজে ব্যবহূত হতে পারে। এছাড়া আকাশ প্রতিরক্ষার কাজেও ব্যবহূত হতে পারে। খ। শান্তিকালীন বিভিন্ন প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, অসামরিক প্রশাসনে সহায়তা, সেনা মোতায়েন, জরুরি উদ্ধার, ত্রাণসামগ্রী প্রেরণ, আহত/নিহতদের উদ্ধার ইত্যাদি ক্ষেত্রে ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এখানে উল্লেখ্য যে, ২৫ এপ্রিল ২০১৫ সালে নেপালে প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পে বিমান যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন ছিল। এ সময় বিভিন্ন দেশের ত্রাণ নেপালে পৌঁছাতে পারেনি। বিধায় পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রসমূহের এ ধরনের যে কোনো দুর্যোগ মুহূর্তে ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে। গ। ঢাকায় অবস্থিত কুর্মিটোলা ও তেজগাঁও বিমানবন্দরের সামরিক ও অসামরিক উড্ডয়ন বহুলাংশে বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং বিভিন্ন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনে তেজগাঁও বিমানবন্দর বন্ধ থাকায় সামরিক/অসামরিক বিমান উড্ডয়ন, প্রশিক্ষণ বন্ধ থাকে। সেক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন উড্ডয়নের জন্য ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর হতে পারে সঠিক প্রশিক্ষণস্থল। ৫. ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর উন্নয়নে করণীয় :ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর উন্নয়নকল্পে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে, তা নিম্নরূপ :
ক. কারিগরি উন্নয়ন : (১) স্বল্পমেয়াদি। (ক) সীমানা চিহ্নিতকরণ ও নিরাপত্তা বৃদ্ধি করে এলাকাটি সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করা। (খ) অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, সার্বক্ষণিক বিদ্যুত্ ব্যবস্থা, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ও কন্ট্রোল টাওয়ার স্থাপন। (গ) রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে ও ডাম্তেল মেরামত ও সারফেসের উন্নয়ন। সেই সঙ্গে নেভিগেশন রেডিও স্টেশন, যেমন : VOR ও NDB অথবা হালের ADSB টাওয়ার স্থাপন। (ঘ) যাত্রী ছাউনি/কনফারেন্স হল এবং আধুনিক সুবিধাসংবলিত চেক ইন আউট/লাগেজ হ্যান্ডলিং ব্যবস্থা। (ঙ) প্রয়োজনীয় ও প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগ।
খ. ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন : স্বল্পমেয়াদি। (ক) আর্মড ফোর্সেস ডিভিশনের মাধ্যমে অর্থ বরাদ্দ করে সেনাবাহিনী ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের সহায়তায় কারিগরি অবকাঠামো উন্নয়ন। (খ) সেনাবাহিনীর সার্বিক ব্যবস্থাপনায় সীমিত আকারে বিমানবন্দর চালুকরণ (যেহেতু সেনাবাহিনী বৃহদাংশ জমির অধিকারী)। কন্ট্রোল টাওয়ার ও আবহাওয়া পরিষেবার জন্য বিমানবাহিনী অথবা অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা যেতে পারে। উপযুক্ত সময়ে এই বিমানবন্দর থেকে সেনা বা বিমান বাহিনীর উড্ডয়ন প্রশিক্ষণকাজে ব্যবহূত হবে। (গ) বেসামারিক বিমান চলাচল প্রশিক্ষণ স্কুলের অনুমতি দান, প্রণোদনার মাধ্যমে উদ্ভূতকরণ।
৬. প্রস্তাবনা (ক) অনতিবিলম্বে একটি টাস্কফোর্স গঠনের মাধ্যমে ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দরকে সচল করা যেতে পারে। (খ) একই টাস্কফোর্সের মাধ্যমে ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর পার্শ্ববর্তী সরকারি জমিতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, চিকিত্সা বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র নির্মাণ করা যেতে পারে। (গ) সম্ভাব্যতা জরিপ সাপেক্ষে বিরল, পীরগঞ্জ, নেকমরদ এলাকায় স্থলবন্দর স্থাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত, নেপাল ও ভুটানের সড়কপথে যোগাযোগ সুগম করা যেতে পারে। ৭. বিশ্বায়নের যুগে এবং প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতিতে টিকে থাকতে হলে সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন ও যথোপযুক্ত ব্যবহার অপরিহার্য। এই আলোকে ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দরের মতো বিশাল সরকারি সম্পত্তি অকেজো বা অব্যবহূতভাবে ফেলে রাখার উপায় নেই। এ ব্যাপারে সবার সুদৃষ্টি কাম্য।
n লেখক : আর্মি এভিয়েশন গ্রুপে পাইলট ও প্রশিক্ষক হিসেবে কর্মরত
