জসিম উদ্দীন
প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী বলেছেন যে,‘বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না’—কথাটি ধ্রুব সত্য। কেননা জ্ঞান-পিপাসা মেটানোর তুলনায় বইয়ের দাম নিতান্তই তুচ্ছ। বই হচ্ছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী-গুণীদের চিন্তা-চেতনা ও সৃষ্টির অন্যতম আধার। যার মাধ্যমে মানুষ এক নিমিষের মধ্যেই ঘুরে আসতে পারে অতীতের জ্ঞানের শহরে। যুগে যুগে জ্ঞানী-গুণীরা বইয়ের সংস্পর্শে এসে নিজেদেরকে আলোকিত করেছে। বই হচ্ছে মানুষকে আলোকিত ও উন্নত জাতি হিসেবে প্রস্তুত করার অন্যতম মাধ্যম। মানুষ যখন সীমাহীন হতাশায় ভুগে, অন্ধকার থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে পায় না।
বই মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে নতুন করে উজ্জীবিত করে। মানুষকে নব উদ্যমে বাঁচতে অনুপ্রেরণা দেয়। পৃথিবীতে মানুষের জন্ম নিছক সামান্য কিছু নয়, এখানে তার মূল্য অনেক বেশি। সে মরীচিকার আস্তরণে ঢাকা এক অমূল্য রতন। শুধু সঠিক পরিচর্যার অভাবে মূল্যহীন হয়ে পড়ে আছে। মানুষের অনেক কিছু করার সক্ষমতা আছে কারণ পৃথিবীতে মানুষই একমাত্র সৃষ্টি যাকে বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। যাকে পৃথিবীর সকল অসাধ্য সাধন করার সক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। শ্বাপদ সংকুল পথ মানুষের সামনে আসবেই কিন্তু ভয় পেলে চলবে না। সব বাধা পেরিয়া সাফল্যের শিখরে আসীন হতেই হবে। বই মানুষকে এভাবে অনেক কিছুই ভাবতে শেখায়।
মানুষের মাঝে আশার আলো জাগ্রত করার উত্কৃষ্ট মাধ্যম হলো বই। বই মানুষের দৃষ্টিশক্তিকে প্রসারিত করে এবং চিন্তাশক্তিকে মজবুত করে। দূরদর্শী চিন্তাভাবনা জাগ্রত করে মানুষের মাঝে। অতি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জিনিসকেও অবহেলা না করে সেটা নিয়ে সামান্য হলেও ভাবতে শেখায়। পৃথিবীর সব রং যখন ধোঁয়াটে বর্ণ হয়ে যায় তখন বইয়ের সাহচর্যে এসেই মানুষ পৃথিবীকে রঙিন এবং স্বপ্নিল করে দেখতে শেখে। অলীক স্বপ্ন, হতাশা, বঞ্চনা, প্রবঞ্চনার সমাহারেই গঠিত আমাদের এই মানবজীবন। প্রতিনিয়ত বাধা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েও মানবজীবন থেমে থাকে না, সামনে এগিয়ে যায় তার স্বাভাবিক গতি নিয়েই ।
আমরা এ পৃথিবীর বিখ্যাত মানুষের জীবন পর্যালোচনা করলে একটি জিনিস খুঁজে পাব যে, তারা প্রত্যেকেই বইয়ের সংস্পর্শে এসেছে। বইকে আপন করে নিয়ে, এটির মধ্য থেকে জ্ঞানসমুদ্র লুফে নিয়ে নিজেদের গৌরবান্বিত করেছে। বইয়ের পৃষ্ঠার কালো অক্ষরে বাঁধা মানিক কুড়িয়ে নিজেদের সমৃদ্ধ করেছে। একজন আলোকিত মানুষ হিসেবে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। নিজেরা একেকটা জ্বলন্ত প্রদীপ হয়ে এই পৃথিবীটাকেও আলোকোজ্জ্বল করেছে। বই পড়ার মাধ্যমে ঘুণেধরা, নেতিয়ে পড়া যুবসমাজ আবার নতুন উদ্যমে জেগে উঠতে পারবে। সর্বপ্রকার অলসতা কাটিয়ে পরিশ্রমী করে নিজেকে গড়ে তুলতে পারবে। আজকে আমাদের সমাজ বই পড়া থেকে দূরে সরে গেছে বলেই আমাদের সমাজে এত মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় হচ্ছে। আমাদের মাঝে মনুষ্যত্ব হারিয়ে পশুত্বের স্বভাব গ্রহণ করেছে। ফলশ্রুতিতে ধর্ষণ, খুন, ছিনতাই, রাহাজানি, মারামারি, ইভটিজিং, বিভিন্ন নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণসহ যে কোনো খারাপ কাজে আমরা নিজেদের জড়াতে সামান্যতম দ্বিধার সম্মুখীন হচ্ছি না। কিন্তু আমরা যদি আজকে বই পড়ার মাঝে সময় দিতাম তাহলে তাদের মাঝে এই মানবিক অবক্ষয় দেখা যেত না। কারণ বইয়ের কালো অক্ষরে বাঁধাই করা আছে এক অদৃশ্য অস্ফুট বারুদ। যাকে জ্বালাতে হলে তাকে ঘষামাজা করতে হবে অর্থাত্ প্রচুর বই পড়তে হবে। তাহলে একদিন আমরা সেই আলোয় নিজেদের আলোকিত করতে পারব।
জীবনকে সঠিকভাবে গড়তে এবং সাফল্যের শিখরে পৌঁছাতে হলে বই পড়ে জ্ঞান অর্জন করার কোনো বিকল্প কিছু নেই। পৃথিবীতে প্রত্যেকটা মানুষ অসাধারণ সুপ্ত প্রতিভা নিতে এই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছে কিন্তু সঠিক পরিচর্যার অভাবে সেই সুপ্ত প্রতিভা ঠিকমতো বিকশিত হয় না। এই সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত করতে গেলে বই হতে হবে অন্যতম পাথেয়। এর ব্যত্যয় ঘটলে জীবনকে আলোকিত করা আকাশ-কুসুম কল্পনার মতো হয়ে যাবে। তাই জীবন গড়তে বইয়ের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
ফেব্রুয়ারি মাস যেহেতু বইমেলার মাস, বইয়ের মাস, দেশের সর্বত্র এ মাসে বইমেলা জমে উঠেছে। তাই আমাদের উচিত বইমেলাতে গিয়ে বই কিনে জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে নিজেদের আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। একজন শ্রেষ্ঠ সুনাগরিক হিসেবে নিজেদের গঠন করা।
n লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
