হত্যা নয়, আত্মহত্যাই করেছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহ। দীর্ঘ ২৪ বছর পর আলোচিত এই মামলার চার বছর তদন্ত করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করার আগে গতকাল এমন তথ্য জানিয়েছে পিবিআই। গতকাল সোমবার সংবাদ সম্মেলন করে এ তথ্য জানান পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) প্রধান বনজ কুমার মজুমদার। তিনি বলেন, সালমান শাহ হত্যাকাণ্ডের শিকার হননি। পারিবারিক কলহের জেরে আত্মহত্যা করেছিলেন।
আলোচিত এই মামলার তদন্ত করতে গিয়ে পিবিআই ৪৪ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেছে। ১০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিও নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট আলামতও জব্দ করা হয়। তবে এই মামলার একজন সাক্ষীকে খুঁজে পায়নি পিবিআই।
২০১৬ সালের ২০ ডিসেম্বর মামলার পুনঃতন্তের ভার পায় পিবিআই। এরপর দীর্ঘ চার বছর তারা তদন্ত করে। গতকাল প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে পিবিআই। তবে সালমান শাহের মৃত্যুতে পাঁচটি কারণ খুঁজে পেয়েছে তদন্ত সংস্থাটি। কারণগুলো হলো :চিত্রনায়িকা শাবনূরের সঙ্গে সালমানের অতিরিক্ত অন্তরঙ্গতা, স্ত্রী সামিরার সঙ্গে দাম্পত্য কলহ, মাত্রাধিক আবেগপ্রবণতার কারণে একাধিকবার আত্মঘাতী হওয়ার বা আত্মহত্যার চেষ্টা; মায়ের প্রতি অসীম ভালোবাসা জটিল সম্পর্কের বেড়াজালে পড়ে পুঞ্জীভূত অভিমানে রূপ নেওয়া এবং সন্তান না হওয়ায় দাম্পত্য জীবনে অপূর্ণতা।
আত্মহত্যার পেছনে সালমান শাহ নিজেই দায়ী
বনজ কুমার মজুমদার বলেন, ‘আমার তদন্তে প্ররোচক হিসেবে কাউকে পাই নাই। তার আত্মঘাতী হওয়ার পেছনে সে নিজেই দায়ী। আমরা প্ররোচনা দেওয়ার মতো কাউকে খুঁজে পাই নাই।’ সালমানের মানসিক কোনো সমস্যা ছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা তেমন কিছু পাই নাই। তিনি অনেক অভিমানী ছিলেন। ছাত্রজীবন থেকেই তার বন্ধুদের সঙ্গে মনোমালিন্য হলে তিনি রক্ত দিয়ে চিঠি লিখতেন।’
সামিরার বরাত দিয়ে পিবিআইয়ের প্রধান বলেন, শাবনূরকে বিয়ে করে সালমান শাহ দুই স্ত্রী নিয়ে সংসার করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সামিরা রাজি ছিলেন না। এখান থেকেই দাম্পত্যের কলহ শুরু হয়। তাছাড়া আগে থেকেই সামিরার সঙ্গে সালমানের মায়ের ঝগড়া-বিবাদের কারণে সালমান শাহ ১৯৯১ সালে দুবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। সে সময় সালমান শাহ একবার ৯০টি ঘুমের ট্যাবলেট খেয়েছিলেন এবং একবার স্যাভলন খেয়েছিলেন। তবে সালমান শাহের সঙ্গে অতিরিক্ত অন্তরঙ্গ সম্পর্কের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন শাবনূর। এই চিত্রনায়িকার বরাত দিয়ে পিবিআইয়ের প্রধান বলেন, একজন অভিনয়শিল্পী হিসেবে সহযোগী শিল্পীর সঙ্গে যেমন সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন, সালমান শাহের সঙ্গে তার তেমন সম্পর্কই ছিল। এর বাইরে কোনো সম্পর্ক ছিল না।
সালমান শাহের সেই সুইসাইড নোট
প্রায় ২৪ বছর পর জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহের মৃত্যুর আগে লিখে যাওয়া সুইসাইড নোট প্রকাশ করা হয়েছে। নোটটি তার মৃত্যুর পর রাজধানীর নিউ ইস্কাটন গার্ডেন এলাকায় থাকা তার বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়। সুইসাইড নোটে লেখা আছে, ‘আমি চৌ. মো. শাহরিয়ার। পিতা কমর উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী। ১৪৬/৫, গ্রিনরোড, ঢাকা-১২১৫ ওরফে সালমান শাহ এই মর্মে অঙ্গীকার করছি যে, আজ অথবা আজকের পরে যেকোনো দিন আমার মৃত্যু হলে তার জন্য কেউ দায়ী থাকবে না। স্বেচ্ছায়, সজ্ঞানে, সুস্থ মস্তিষ্কে আমি আত্মহত্যা করছি।’ বনজ কুমার মজুমদার বলেন, “সালমানের মৃত্যুর পর তার বাসা থেকে একটি সুইসাইডাল নোট উদ্ধার করা হয়। আমরা সেটা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি। হ্যান্ডরাইটিং এক্সপার্ট বা হস্তলিপি বিশারদকে দিয়ে আমরা সুইসাইড নোটটি দেখিয়েছি। এটি তার হাতের লেখা বলেই শনাক্ত হয়েছে। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সকালে রাজধানীর নিউ ইস্কাটন গার্ডেন এলাকায় সালমান শাহের বাসায় তার মরদেহ পাওয়া যায়। ঐ সময় ঐ বাসা থেকে পুলিশ একটি ‘সুইসাইড নোট’ উদ্ধার করে।”
সামিরার মামি সুলতানা রুবির বক্তব্য মিথ্যা
আড়াই বছর আগে ফেসবুকে এক ভিডিও প্রকাশ করে সালমানের মৃত্যুর রহস্যের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন সালমানের বাসার পাশেই বিউটি পার্লারে কাজ করা রাবেয়া সুলতানা রুবি। এই রুবিই সামিরার মামি। সেখানে তিনি দাবি করেন, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেননি। তাকে খুন করা হয়েছিল। সেই খুনের সঙ্গে জড়িত সালমানের স্ত্রী ও তার বাড়ির লোকজন। খুনের সঙ্গে আরো জড়িত রুবির ছোটো ভাই ও তার স্বামী। ভিডিও বার্তায় রুবি অনুরোধ করেন সালমান শাহের মা নীলা চৌধুরীকে, তিনি যেন সালমান খুনের মামলাটি পুনরায় তদন্তের ব্যবস্থা করেন। রুবি নিজে এই খুনের সাক্ষী দেবেন। কিন্তু আড়াই বছর আগে রুবির দেওয়া সেই বক্তব্য তিনি প্রত্যাহার করে নিয়েছেন এবং তা মিথ্যা ছিল বলে জানিয়েছে পিবিআই।
আজিজ ভাইয়ের সংশ্লিষ্টতা পায়নি পিবিআই
আলোচিত এই মামলার তদন্তে আজিজ মুহাম্মদ ভাইয়ের কোনো সংশ্লিষ্টতা পায়নি পিবিআই। তাকে নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পিবিআইয়ের প্রধান বলেন, ‘যে বাড়িতে সালমান শাহ থাকতেন, সেখানে অনেকেই যেত। তবে সেখানে আজিজ মুহাম্মদ ভাই যেতেন কি না, সে ব্যাপারে আমরা সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাইনি। সেখানে সাধারণত যারা সিনেমার সঙ্গে জড়িত তারাই যেতেন। এর বাইরে আজিজের সঙ্গে তার আর কোনো সম্পর্ক আমরা পাইনি।’
প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান পরিবারের
আলোচিত এই মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে সালমান শাহের পরিবার। গতকাল সোমবার পিবিআইয়ের সংবাদ সম্মেলনের পর এই প্রতিবেদন শালমান শাহের পরিবার প্রত্যাখ্যান করেছে বলে জানিয়েছেন তার মামা আলমগীর কুমকুম। আলোচিত এই মামলার তিনিও একজন সাক্ষী ছিলেন। তিনিও ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিলেন। চট্টগ্রামে নিজ বাসায় আলমগীর কুমকুম সাংবাদিকদের বলেন, ‘পিবিআইয়ের কাছে আমার প্রশ্ন, তারা কি সালমান শাহের স্ত্রী সামিরার আপন মামি রুবি সুলতানার বক্তব্য নিয়েছে? পিবিআই কি রুবি সুলতানা পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছে?’ আমরা পুনঃতদন্ত চাইব।’
শ্বশুরের সন্তোষ প্রকাশ
সালমান শাহের মৃত্যু মামলার তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন তার শ্বশুর ও সাবেক ক্রিকেটার শফিকুল হক হীরা। সাবেক এই ক্রিকেটার দাবি করেন, এর মাধ্যমে দীর্ঘ সময়ের অভিযোগের অবসান হলো।
