পার্বত্য জেলাগুলোর মধ্যে ভ্রমণপিয়াসীদের অন্যতম পছন্দের জায়গা হলো বান্দরবান। অপরূপ সৌন্দর্য আর পাহাড়ে ঘেরা এ বান্দরবান। রোমাঞ্চকর অনুভূতির চরম পর্যায়ে আছে উঁচু উঁচু পাহাড়ের চূড়া। হাত বড়ালেই মেঘের পরশ, ঠিক যেন স্বর্গস্বাদ। হিমেল হাওয়ায় যেন মন উড়ে যায় সুউচ্চতায়। তখন মনে হয় যদি পাখি হয়ে জন্মাতাম কতই না ভালো হতো।
কিছুটা কালবিলম্বে সেমিস্টার শুরু হওয়ায় ভ্যাকেশন না দিয়েই নতুন সেমিস্টার আরম্ভ হলো আমাদের। সদ্য ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে হাঁপিয়ে ক্লান্ত হওয়া আমরা অতি অল্প সময়ে ভ্রমণের সিদ্ধান্তে বেরিয়ে গেলাম। ময়মনসিংহ রেল স্টেশনে গিয়ে ঠিক করলাম বান্দরবান যাব। ব্যাস, স্বল্প যোগাযোগ আর ক্ষুদ্র পরিকল্পনাকে পাথেয় হিসেবে সঙ্গে নিয়ে ভ্রমণে বেরিয়ে পড়লাম বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের কিছু এডভেঞ্চারপিপাসু বন্ধুরা। ছয় জনের একটি দল একদিনের ব্যবধানেই ১৪ জন হয়ে গেলাম অনাকাঙ্ক্ষিত এক রোমাঞ্চকর যাত্রার অভিপ্রায়ে।
৬ ফেব্রুয়ারি রাত ৮টায় ময়মনসিংহ থেকে চট্টগ্রামগামী বিজয় এক্সপ্রেস ট্রেনে আমাদের যাত্রা শুরু। বেশ কয়েকটা সিট বিভিন্ন স্থানে থাকলেও সবাই মিলে জমায়েত হলাম এক জায়গায়, স্থানান্তর করলাম কয়েকটি সিট। রাতভর চলল আড্ডা আর গানের আসর, কারো চোখেই যেন ঘুম নেই। সুর থাকুক বা না থাকুক, গাদাগাদি করে একসঙ্গে বসে সবাই মিলে গান গাওয়ার মজাই আলাদা। খানিক পরেই শুরু হলো গানের আসর। কিন্তু এবারেও থেমে গেল শুরু হতে হতেই। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে পৌঁছে গেলাম বান্দরবান শহরে। বান্দরবান শহর থেকে চান্দের গাড়িতে করে গেলাম বগালেক। মাঝপথে রুমা বাজারে আর্মি চেকপোস্ট পার করলাম। চান্দের গাড়িতে যাত্রা শুরু হওয়ার পর থেকেই দেখা মিলল আকাশচুম্বি উঁচু উঁচু পাহাড়ের। একের পর এক চড়াই-উত্রাই পার করছিল আমাদের পরিবহন। খাড়া ঢাল উঠানামা করতে করতে আতঙ্কের চিত্কার আর স্বস্তির হাসি দুটোই ভাসছিল সবার মুখে। তবে কিছুদূর যেতেই চারদিকে সারি সারি পাহাড়ের সমাবেশ দেখে আতঙ্ক ভুলে মুগ্ধতায় ছেয়ে গেল পরিবহনটির ভেতরের পরিবেশ। পাহাড়ের চূড়ায় কোমল মেঘের অভিযাত্রা আর সেটা ভেদ করে সূর্য রশ্মির আগমন যেন মনে হচ্ছিল এক টুকরো স্বর্গ। এমনই স্বর্গসুখের পরিক্রমা পেরিয়ে পৌঁছলাম বগালেকে।
সময়টা শীতের হওয়ায় লেকের পানি ঘোলা ছিল তবুও সৌন্দর্যের এতটুকুও কমতি ছিল না। যেন পাহাড়ের পাদদেশ দিয়ে তৈরি করা একটি পানির পাত্র যেখানে পানি কখনোই শুকায় না। তারপর শুরু হলো আসল চ্যালেঞ্জ, ট্রাকিং করে চূড়ায় উঠা। সকাল থেকেই ছোটো একটা বাঁশকাঠি হাতে পাহাড়ি রাস্তায় পথচলা শুরু হলো। টানা চারঘণ্টা উঁচু রাস্তায় হেঁটে ক্লান্ত হচ্ছিলাম বটে কিন্তু কেওক্রাডংয়ের চূড়া দেখতে পেয়ে যেন সব ক্লান্তি চলে গেল। মনে হচ্ছিল মেঘ যেন কানের পাশ দিয়ে তাদের দেশে আহ্বান জানিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে।
গোধূলির শেষ আলোটুকু দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩২৫০ ফিট উপরে বসে। ভাগ্যের অনেকটা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে হয়, কারণ সে দিনের রাতটি ছিল ভরা জোছনা। সঙ্গে ছিল ঝড়ো বাতাস আর ঠান্ডার মিশ্রণ, সব মিলিয়ে চরম রোমাঞ্চকর অনুভূতি। জোছনা ভরা চাঁদটাকে আরো কাছ থেকে পরিষ্কারভাবে দেখার স্বাদ পেলাম যা রয়ে যাবে এই মনের গহীনে। কটেজের বেলকনিতে বসে চাঁদের আলো গায়ে মাখিয়ে গল্প হলো মধ্যরাত পর্যন্ত। অনেকেই তখন স্বস্তির স্বরে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলছিল আহা আর কী প্রয়োজন!
