স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করে শহিদ হয়েছেন লাখো মানুষ। কেউবা প্রত্যক্ষভাবে আবার কেউবা পরোক্ষভাবে দিনের পর দিন লড়াই করে গেছেন স্বাধীনতার জন্য। যুদ্ধে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে আসা যোদ্ধাদের চিকিত্সার মধ্য দিয়েও যুদ্ধ করেছেন অনেক মহান চিকিত্সক। এমনই এক বাবার মেয়ে অধ্যাপক ডা. মালিহা রশিদ। বাবার এই মহান মানসিকতার পাশে থেকে বাবার মতো ডাক্তার হবেন বলে মনোনিবেশ করে নিয়েছিলেন মাত্র ষষ্ঠ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায়।
ফরিদপুর শহরে নানার বাড়িতে ডা. মালিহা রশিদের জন্ম। তার বাবা ডাক্তার হারুন অর রশিদ এবং মা গৃহিণী মিসেস রাবেয়া বেগম। ছোটোবেলা থেকেই বাবার আদর্শে বড়ো হয়েছেন তিনি। চার ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনিই সবার বড়। তার স্বামী একজন চিকিত্সক এবং তিনি দুই সন্তানের জননী। তার পছন্দের রং ফিরোজা। তিনি ভালোবাসেন দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়াতে এবং বই পড়তে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন চিকিত্সার অভাবে টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে তার এক ভাই মারা যান।
তিনি বলেন, আমার বেড়ে উঠা ফরিদপুরের ভাঙ্গাতে এবং আমার শৈশব-কৈশোর ঐখানেই কেটেছে। মুক্তযুদ্ধের সময়ে আমি ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি। তখন আমি দেখেছি কীভাবে আমার বাবা যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের লুকিয়ে লুকিয়ে চিকিত্সা করেছেন। বাবার আদর্শকে লালন করতে পেরেছি বলেই আজ আমি একজন ডাক্তার হতে পেরেছি। আমার মা রত্নগর্ভা। কারণ তার জন্যেই আজ আমরা প্রতিটি ভাইবোন দেশ ও বিদেশে প্রতিষ্ঠিত।
তিনি স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ থেকে ১৯৮৩ সালে এমবিবিএস পাশ করে পরবর্তীতে স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগে দেশের সর্বোচ্চ এফসিপিএস ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর তিনি সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক হিসেবে দেশের বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজে কাজ করেন। তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান থাকাকালীন স্ব-ইচ্ছায় সরকারি চাকরি হতে অবসর নেন। তার উদ্দেশ্য ছিল অবসর শেষে মনের মতো করে রোগীর সেবা প্রদান করা।
তিনি আরো বলেন, যুদ্ধকালীন কথা, নারী নির্যাতনের কথা, ভয়ে লুকিয়ে থাকার কথা ও যুদ্ধে তার প্রিয় বান্ধবী অপর্ণা তার ভাই ও বাবাকে হারিয়ে ফেলার কথা। দীর্ঘ ৪৫ বছর পর তিনি ফেসবুকের মাধ্যমে হারানো সেই বান্ধবী অপর্ণাকে খুঁজে পেয়েছেন কলকাতায়।
তার এখনো কানে বাজে ও চোখে ভাসে ২৫ মার্চের সেই দিনের কথাগুলো, যুদ্ধের পর স্বাধীনতার সুখ আর আনন্দের কথা, গানগুলোর কথা। এত কিছুর মধ্য দিয়েও তিনি তার জীবনের স্বপ্নপূরণ করেছেন। কৈশোর কাটিয়েছেন মুক্ত পাখির মতো খেলেছেন পড়েছেন, জীবনে কোনো বাধাই বাধা ছিল না।
তিনি অনেক সমাজসেবামূলক কাজ করেছেন। বাবার স্মৃতিচারণে ফরিদপুর শিশু হসপিটালে তার বাবার নামে একটি ওয়ার্ড প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি তার গ্রামে মাঝে মাঝে বিনামূল্যে চিকিত্সাসেবা প্রদান করে থাকেন। তার ইচ্ছে ফরিদপুরে একটি হাসপাতাল, বৃদ্ধাশ্রম এবং ভবঘুরে কিশোরীদের জন্য একটি রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার তৈরি করা। এরই মধ্যে সেখানে তিনি ক্যানসার স্কিনিং প্রোগ্রাম শুরু করেছেন।
জীবনের পুরোটাই ছিল নিয়মমাফিক। তিনি মনে করেন, যেমন ভালো পড়াশুনা করতে হবে ঠিক তেমনি করে সব কাজও করতে হবে নিয়মধরে। তিনি আরো বলেন, মেয়েদের সহজেই ভেঙে পড়া উচিত নয়, কোনো বাধাকে বাধা ভাবলে চলবে না, তাদের আত্মবিশ্বাসী এবং স্বাবলম্বী হতে হবে। সরকারের প্রতি তার একটাই চাওয়া— ‘সবাই যেন তার দক্ষতার উপযুক্ত মর্যাদা পান’।
