নির্বাচনী বর্জ্য থেকে শিক্ষাসামগ্রী

আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৯:৫৪

ঢাকা শহরকে গ্রিন সিটি হিসেবে তৈরির লক্ষ্য নিয়েই সম্প্রতি শেষ হয়েছে ঢাকার দুই সিটি নির্বাচন। তবে নির্বাচনের আগে প্রচারণার বড় একটি অংশ জুড়ে থাকা পোস্টারিং এবং অন্যান্য সামগ্রী নিয়ে কিছুটা চিন্তিতই হয়ে পড়েন নগরবাসী। নিজ শহরকে নিয়ে এমন চিন্তার জায়গা থেকেই একদল তরুণ উদ্যোগ নিয়েছেন নির্বাচনী বর্জ্যগুলো কাজে লাগানোর। উদ্ভাবন করেছেন এর পুনঃব্যবহারের উপায়। নির্বাচনী বর্জ্যগুলো কাজে লাগিয়ে তৈরি করা হচ্ছে ব্যাগ, বই, খাতা ও শিক্ষাসামগ্রী। রাজধানীজুড়ে এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্য থেকে এসব শিক্ষাসামগ্রী তৈরির এই ভিন্নধর্মী উদ্যোগ নিয়েছে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন।

বেশ কিছুদিন থেকেই ছিন্নমূল ও হত-দরিদ্র মানুষদের জন্য ১ টাকার বিনিময়ে খাবারের ব্যবস্থা করে আসছে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন। ঢাকাসহ ৮টি জেলায় রুটিন মাফিক এই খাবার বিতরণ করা হয়। পাশাপাশি ১ টাকায় তাদের আইনি সহায়তা, চিকিত্সাসেবা দেয় এই প্রতিষ্ঠান। সেই সঙ্গে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য স্কুল পরিচালনাও করে তারা। তাদের এই স্কুুলগুলোতে আসা শিক্ষার্থীদের খাতার চাহিদা থেকেই নির্বাচনী বর্জ্য থেকে শিক্ষাসামগ্রী তৈরির পরিকল্পনা শুরু।

বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের ঢাকা অঞ্চলের সদস্যদের এই উদ্যোগের কথা জানালেন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণ সালমান ইয়াছির। তিনি জানান, ঢাকায় আমাদের প্রায় এক হাজার শিশু রয়েছে, যাদের সবাই সুবিধাবঞ্চিত। তাদের শিক্ষাসামগ্রীর কথা চিন্তা করেই এই পরিকল্পনা নেন তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্বাচনের ১৮ ঘণ্টা পরই পোস্টার ও প্রচারণা সামগ্রী সংগ্রহের কাজে নেমে পড়েন ফাউন্ডেশনের ১৫ থেকে ২০ জন সদস্য। কাজ শুরু হয় ঢাকা ক্যান্টরমেন্টের বালুরঘাট এলাকা থেকে। নির্বাচনী বর্জ্য সংগ্রহের এই কাজকে প্রথমে অনেকে ভিন্নচোখে দেখলেও পরবর্তীকালে আমাদের এক উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়েছেন স্থানীয় লোকজন।

জানা যায়, নির্বাচনী বর্জ্যকে কাজে লাগিয়ে দৈনন্দিন কাজে ব্যবহারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তাদের সাহায্য করেন দুই সিটি নির্বাচনে অংশ নেওয়া মেয়র পদপ্রার্থীরা। তারাও নিজেদের কাছে থাকা অব্যবহূত পোস্টার ও প্রচারণা সরঞ্জাম তুলে দেন এই ফাউন্ডেশনের কর্মীদের হাতে। কয়েকদিনের মধ্যেই সংগ্রহ করা হয় প্রায় ২০ টন নির্বাচনী পোস্টার ও প্রচারণা সরঞ্জাম।

নিজেদের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাসামগ্রীর ব্যবস্থা করতে পোস্টার সংগ্রহ করে প্রথমে নিজেরাই খাতা তৈরি করতেন ফাউন্ডেশনের ভলান্টিয়ার ও সদস্যরা। কিন্তু অফিসে বসে এই কাজ করায় বিঘ্ন ঘটে তাদের অন্যান্য কাজে। এমন সময় তাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন কেরানীগঞ্জের এমদাদুল হক। সেখানে তার কাগজের ফ্যাক্টরিতেই শুরু হয় নির্বাচনী বর্জ্য থেকে বাজারের ব্যাগ ও শিক্ষাসামগ্রী তৈরি।

সালমান জানান, নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যবহূত কাগজের পোস্টার থেকে তারা তৈরি করছেন খাতা ও বই। পোস্টারের কাগজের মান ভালো হওয়ায় তা দিয়ে অনায়াসেই তৈরি হচ্ছে ছোটদের আঁকার খাতা বা ড্রয়িং বুক। পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে শিশুদের বাংলা, ইংরেজি ও গনিত খাতা। অন্যদিকে, প্লাস্টিকের আবরণে মোড়ানো পোস্টার বেশি শক্তিশালী হওয়ায় তা দিয়ে তৈরি হচ্ছে বাজারের ব্যাগ। এছাড়াও নির্বাচনে ব্যবহূত ভোটিং স্লিপ দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে লেখার প্যাড।

তিনি আরো জানান, উত্তর সিটির বর্তমান মেয়রের কাছে সাহায্য চাইতে গেলে তিনি অনেকগুলো পিভিসি দিয়ে সাহায্য করেন। সেগুলোও ব্যবহার করা হচ্ছে স্কুল ব্যাগ, বাজারের ব্যাগ ও রেইনকোটে। পোস্টার ঝুলানো কাজে ব্যবহূত পাটের দড়ি ও ১ টাকায় আহার কর্মসূচি থেকে বেঁচে যাওয়া তেলের বড় বোতল থেকে তৈরি করা হচ্ছে রং-বেরঙের ফুলের টপ।

এবারের বইমেলায় নিজেদের একটি স্টল রেখেছে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন। এই স্টল নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে পূর্ব-ব্যবহূত প্লাস্টিক। এখানে নূন্যতম ৬ মাসের মেয়াদ সম্পন্ন মেডিসিন, পুরাতন ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য দিলে এর পরিবর্তে দেওয়া হচ্ছে বই।

পুরাতন জিনিস সংগ্রহ করে সেগুলো পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করে অসহায়, ছিন্নমূল মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ আরো আগে থেকেই করে আসছে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন। আগামীতে রাজধানীর রাস্তার পাশে থাকা ছিন্নমূল মানুষদের জন্য অস্থায়ী ডোম হাউজ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। এছাড়াও শহরের মানুষের কাছ থেকে পুরাতন ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য সংগ্রহে বিভিন্ন স্থানে বিন বা ঝুড়ি স্থাপনের পরিকল্পনাও করছেন ফাউন্ডেশনের সদস্যরা।