সাধারণ একটা বাক্সের মুক্তির আন্দোলন হয়ে উঠার অসাধারণ এক গল্পের নাম ‘মুক্তি বক্স’। অনেকের কাছে মুক্তি বক্স স্যানিটারি ন্যাপকিনের একটা ভেন্ডিং মেশিন, আবার অনেকের কাছে মুক্তি বক্স একটা প্যাড ডিসপেন্সার। কিন্তু মুক্তি বক্স প্রকৃতপক্ষে একটা আইডিয়া, একটা আশা। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেয়েদের প্রয়োজনের সময়ের জন্য প্যাড মজুদ করা থাকে মুক্তি বক্সে। বক্সটি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের ওয়াশরুমের দেয়ালে লাগানো থাকে, যেখান থেকে মেয়েরা তাদের প্রয়োজনে যে কোনো সময় বিনামূল্যে প্যাড নিয়ে ব্যাবহার করতে পারে।
অনেকেই হয়তো মনে করবেন মুক্তি বক্স ফ্রি প্যাড বিতরণের একটা প্রোগ্রাম। কিন্তু আয়োজকরা জানান, মুক্তি বক্স আসলে একটা আন্দোলন—যেখানে মেয়েদের পিরিয়ড নিয়ে আমাদের সমাজে প্রচলিত যে ট্যাবু আছে সেটাকে ভাঙার জন্য মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বাচ্চাদের সচেতন করার পাশাপাশি পিরিয়ড যে দৈনন্দিন জীবনের অন্য দশটা ঘটনার মতো স্বাভাবিক, সেটা পরিষ্কার করে তোলা হয়। মুক্তি বক্স একটা স্বচ্ছ বাক্স, যেখানে দূর থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায় বক্সের ভেতরে কী আছে। একটা ওয়াশরুমে প্রবেশ করেই হ্যান্ড সেনিটাইজার অথবা সাবান দেখে যেমন আমরা চমকে যাই না, তেমনি প্যাড দেখেও যেন আমরা চমকে না যাই সেই কারণেই স্কুলে স্কুলে মুক্তি বক্স স্থাপন করা। বাচ্চাদের প্যাডের সাথে সহজ সম্পর্ক গড়ে তুলতে উত্সাহিত করে আসছেন মুক্তি বক্সের আয়োজকরা।
মুক্তি বক্স কর্মসূচিটি শুরু করেছিলেন ফখরুদ্দীন রিজভী। যিনি পরিবারসহ বসবাস করেন আমেরিকায়। মুক্তি বক্সের আইডিয়া আরো দুই বছর আগে থেকেই। কিন্তু প্রবাস জীবনে ব্যস্ততার কারণে সম্ভব হচ্ছিল না। সে বছরের জানুয়ারিতে ১ মাসের ছুটিতে দেশে আসেন তিনি। তখনই মুক্তি বক্সের আইডিয়া নিয়ে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং বন্ধুদের মধ্যে কয়েকজনকে নিয়ে শুরু করেন। বর্তমানে তার ছোট ভাই আরিফ মঈনুদ্দিন বন্ধুদের নিয়ে ২৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পৌঁছে দেন মুক্তি বক্স। এক্ষেত্রে বেছে নেন প্রত্যন্ত এলাকা এবং সুবিধাবঞ্চিত প্রতিষ্ঠানকে।
রিজভী জানান, আমার ইচ্ছা আমি নিজে ১০০টি স্কুলে মুক্তি বক্স বসাব এবং এই ১০০টি স্কুলে স্যানিটারি ন্যাপকিন নিজ খরচেই রিফিল করব। আমাদের কাজকে ভালোবেসে ইতিমধ্যেই অনেকেই এগিয়ে আসছেন, তারা নিজেদের এলাকায় মুক্তি বক্স বসাচ্ছেন এবং আজীবন ফ্রী রিফিল করার দায়িত্ব নিচ্ছেন।
এমন কাজের চিন্তার কীভাবে এলো, এ বিষয়ে মুক্তি বক্সের মূল উদ্যোক্তা রিজভী বলেন, ‘আমার একটি মেয়ে আছে, সে আমেরিকায় জন্ম নিয়েছে। সেই সুবাদে জীবনের সকল ধরনের সুযোগ সুবিধা সে অনায়াসেই ওখানে পাচ্ছে এবং পাবে। কিন্তু আমার দেশের মেয়েরা তো সেটা পাচ্ছে না। আর সেই চিন্তা থেকেই দুই বছর আগে আমরা মুক্তি বক্সের মাধ্যমে দেশের মেয়েদের জন্য কিছু করতে চাইছিলাম। আমার কাছে মনে হয়েছে এই একটা জায়গায় আমরা এখনো উন্নতি করতে পারিনি।’
মুক্তি বক্সের সকল খরচ রিজভী এবং তার টিম সদস্যরা বহন করে থাকেন। তাদের পক্ষে হয়ত সারাদেশের সবক’টি স্কুলে গিয়ে মুক্তি বক্স বসানো সম্ভব হবে না। তবে তারা চান রাষ্ট্র এই দায়িত্বটা যেন নেয়। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলকভাবে মুক্তি বক্সের মতন একটি করে যেন বক্স বসায় সরকার। স্কুলে ফ্রি বই পাঠানোর সময় ফ্রি স্যানিটারি ন্যাপকিন পাঠানো হোক—কারণ, পাঠকালীন কোনো মেয়ের পিরিয়ড হলে তাকে যেন কোনো ধরনের খারাপ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন না হতে হয়। মুক্তি বক্সের এই নীরব আন্দোলন ভবিষ্যতেও চালিয়ে যেতে চান তারা।
