বিকালের সূর্যটা পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) সমাজবিজ্ঞান ভবনের সামনে খোলা আকাশের নিচে ছোট সবুজ একটা মাঠ। বেলা নামতেই একদল শিশুর কলতানে ভরে উঠে চারপাশ। বই, খাতা, কলম, পেন্সিল, চক, স্লেট, রাবার ইত্যাদি নিয়ে বসে পড়েছে একদল ছোট ছেলে-মেয়ে। কাছাকাছি যেতেই তাদের কণ্ঠে ভেসে আসে ‘এ’ ফর অ্যাপল, ‘বি’ ফর বল। অ-তে অজগর, অজগরটি আসছে তেড়ে। আ-তে আম, আম খেতে ভারি মজা।
এসব শিশুর কারো বাবা রিক্সাচালক অথবা দিনমজুর, যাদের দিন আনতে পান্তা ফুরোয়। চারপাশের সোনার চামচ মুখে দেওয়া সন্তানদের বাবা-মায়ের মতো স্বপ্ন দেখতে না পারলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক সংগঠন ও অবহেলিত শিশুদের স্কুল তরী’র সহায়তায় এখন সেই স্বপ্ন দেখতে পারেন এসব রিক্সাচালক অথবা দিনমজুর বাবা-মা।
২০০৮ সালের ২৮ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীর হাত ধরে ‘এসো আলোর পথে’ স্লোগানকে ধারণ করে প্রতিষ্ঠিত হয় এই সংগঠনটি। বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের স্কুলগুলোর দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পাঠদান করে থাকে সংগঠনটি। শিশু থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৮০-১০০ জন শিক্ষার্থী এখানে শিক্ষাগ্রহণ করছে। সপ্তাহে তিনদিন অর্থাত্ শনি, সোম ও বুধবার অবহেলিত ছেলে-মেয়েরা এই স্কুলে আসে। এখানে বসেই তারা শিক্ষার আলো জ্বালতে চান। বেলা ৪টা থেকে ৫টা পর্যন্ত চলে এ আসর। বৃষ্টি বা দুর্যোগের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ক্যাফেটেরিয়া ও সমাজবিজ্ঞান অনুষদের বারান্দায় শিক্ষা কার্যক্রম চলে।
স্কুলে শিক্ষার পাশাপাশি শিশুদের জন্য সাংস্কৃতিক বিকাশ সাধন, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও বনভোজনের আয়োজন করেন তরী’র স্বেচ্ছাসেবক শিক্ষার্থীরা, যারা পড়াশোনা করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে। এছাড়া শীতের সময় শীতবস্ত্র, শিক্ষা উপকরণ বিতরণ ও সামাজিক অভিভাবকের দায়িত্বও পালন করেন তারা।
শিল্পী এই স্কুলে পাঠদান করেন। যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, ‘গত এক বছর যাবত আমার ভালো লাগার জায়গা থেকে এই শিশুদের পড়াতে আসি। অনেকে আসে এখানে ক্লাস নিতে, কিন্তু সবাই নিয়মিত থাকে না। আমরা কষ্ট করে পড়ানোর পর যখন শিশুরা ভালো ফলাফল করে তখন সব থেকে বেশি ভালো লাগে। এখান থেকে পড়ে অনেকে বিভিন্ন পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে।’
এ স্কুলে পড়তে আসা লিমা আক্তারের ভাষ্য, ‘আমার আব্বু একজন রিক্সাচালক এবং আম্মু বিভিন্ন মানুষের বাসায় কাজ করে। এখানে পড়তে আমাদের কোনো টাকা দিতে হয় না। এখানে পড়েই ক্লাসে ৭৩ জন ছাত্রছাত্রীর মধ্যে আমার রোল ৭ হয়েছে। আমি বড় হয়ে একজন শিক্ষিকা হতে চাই।’
এখনো কোনো স্কুলে ভর্তি না করানো ছয় বছর বয়সী ছেলের লেখাপড়ায় হাতেখড়ি দিতে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন ফাতেমা বেগম। তিনি বলেন, ‘এখানে লেখাপড়ার পাশাপাশি অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও অনেক ভালো। বিনা টাকায় তারা আমাদের ছেলে-মেয়েদের পড়াচ্ছেন। তাই আমি অনেক দূর থেকে হেঁটে সন্তানকে নিয়ে আসি।’
তরী’র সভাপতি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ৪৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী জাকিউল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের এই স্কুল থেকে নার্গিস আক্তার নামের একজন শিক্ষার্থী বর্তমানে অনার্সে পড়ছেন ধামরাই সরকারি কলেজে। এখানে নিয়মিত পাঠদান করান আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫-২০ জন শিক্ষার্থী।’
