পটকা মাছের বিষাক্ততা ও জনস্বাস্থ্য

আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২১:৩২

পটকা মাছ খেয়ে মানুষের মৃত্যুর খবর ইদানীং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। এ ধরনের খবর প্রায় প্রতি বছরই বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়ে থাকে। আমাদের দেশের মানুষ অনেকটা না বুঝে পটকা মাছ খেয়ে মৃত্যু ঝুঁকিতে নিপতিত হয়। অথচ পটকা মাছ জাপানে একটি দামি ও সুস্বাদু মাছ হিসাবে পরিচিত। জাপানিদের নিকট পটকা মাছ তাদের ঐতিহ্যের একটি অংশ। কোনো কোনো জাপানি পটকা মাছকে কাজের উদ্যম সৃষ্টির প্রতীক হিসেবে মনে করে। সাধারণত বড়ো বড়ো পার্টিতে স্লাইস করে কাঁচা পটকা মাছ উপস্থাপন করা হয়। জাপানি ভাষায় এটাকে ‘ছাসিমি’ বলে। জাপানে পটকা মাছ রন্ধনের জন্য রয়েছে লাইসেন্সধারী প্রশিক্ষিত লোক। তারা জানে পটকা মাছের প্রজাতি ও কোন অংশ বিষ বহন করে। তবুও পটকা মাছ খেয়ে জাপানিরা এখনো দুর্ঘটনায় পতিত হয়—যদিও এর সংখ্যা পূর্বের তুলনায় খুবই কম। জাপান ছাড়াও দক্ষিণ কোরিয়া, থাইওয়ান, সিঙ্গাপুর, চীন, মেক্সিকো, ইত্যাদি দেশে পটকা মাছ খেয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে থাকে।

পটকা খেয়ে দুর্ঘটনা ঘটার কারণে এর বিষাক্ততা এবং বিষক্রিয়া সম্পর্কে জাপানে গবেষণা শুরু হয়েছে প্রায় ২০০ বছর ধরে। সারা জাপান সাগর এবং এর শাখা-প্রশাখা জাপানিরা চষে বেড়িয়েছে পটকা মাছের বিষাক্ত প্রজাতির সন্ধানে এবং আবিষ্কার করেছে পটকা মাছের বিষের উত্স এবং বিষের মৌলিক উপাদান। জাপানিজ বিষাক্ত পটকার চামড়া, যকৃত্ এবং ডিম্বাশয়ে সবচেয়ে বেশি বিষ থাকে। পটকা মাছ নিজের জীবন রক্ষার্থে এসব বিষ নিঃসারণ করে থাকে।

বাংলাদেশে সাধারণত দুই ধরনের পটকা মাছ পাওয়া যায়, যেমন—স্বাদুপানির পটকা ও লোনাপানির পটকা। স্বাদুপানির পটকা নদনদী, খাল-বিল, ডোবা ইত্যাদিতে পাওয়া যায় এবং লোনাপানির পটকা উপকূলীয় অঞ্চল ও  সমুদ্রে পাওয়া যায়। স্বাদুপানির পটকা আকারে লোনাপানির পটকার চেয়ে অপেক্ষাকৃত অনেক ছোটো। আমাদের দেশে স্বাদুপানিতে এপর্যন্ত দুই প্রজাতির পটকা (Tetraodon cutcutia এবং Chelenodon patoca) পাওয়া গেছে; উভয় প্রজাতির পটকাই সারা বছর কমবেশি বিষাক্ত; কিন্তু আমাদের সামুদ্রিক পটকার প্রজাতির সংখ্যা জানা নেই। তবে সমুদ্রেও বিষাক্ত পটকার সংখ্যা অনেক।

জাপানে আমার পিএইচডি এবং পোস্ট ডক্টোরেট গবেষণাকালে বাংলাদেশি পটকা নিয়ে গবেষণা করার সুযোগ হয়েছে। বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউটও (বিএফআরআই) এ বিষয়ে কিছু প্রাথমিক গবেষণা পরিচালনা করেছে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, আমাদের দেশের স্বাদুপানির সব পটকাই বিষাক্ত। আমাদের সব সামুদ্রিক পটকার বিষাক্ততা সম্পর্কে বিশদ তথ্য এখনো জানা নেই। বিষাক্ত পটকার চামড়া, যকৃত্ এবং গোনাডে বিষের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা গেছে। মাংসপেশিতে বিষের মাত্রা অপেক্ষাকৃত কম। স্বাদুপানির পটকার বিষ এবং সামুদ্রিক পটকার বিষ মৌলিক উপাদানও ভিন্ন ভিন্ন। সামুদ্রিক পটকার বিষ টেট্রোডোটক্সিন (Tetrodotoxin, TTX) এবং স্বাদুপানির পটকার বিষ সেক্সিটক্সিন (Saxitoxin, STX) নামে পরিচিত। তবে গবেষণায় দেখা গেছে যে, কোনো কোনো সামুদ্রিক পটকা যেমন সেক্সিটক্সিন নামক বিষ বহন করে তেমনি স্বাদুপানির পটকাও কোনো কোনো ক্ষেত্রে টেট্রোডোটক্সিন বহন  করে থাকে। এ রহস্য বিজ্ঞানীদের কাছে এখনো শতভাগ পরিষ্কার নয়।

অনেকের ধারণা পটকা মাছ রান্না করলে এর বিষাক্ততা নষ্ট হয়ে যায়। এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। অত্যধিক তাপে বিষের রাসায়নিক গঠন এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় রূপান্তর হতে পারে; কিন্তু এতে বিষাক্ততার খুব একটা তারতম্য হয় না।    

রোগীর দেহে পটকা মাছের বিষক্রিয়ার মাত্রা গৃহীত বিষের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে। স্বাদুপানি এবং মিঠাপানির পটকার বিষাক্ততার লক্ষণ রোগীর দেহে প্রায় একই রকম। পটকা মাছের বিষকে নিউরোটক্সিন কিংবা সোডিয়াম চ্যানেল ব্লকার বলা হয়। পটকা মাছের বিষক্রিয়ায় মানব দেহের নার্ভ সেলে সোডিয়াম প্রবেশের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। এতে ইলেকট্রোলাইটিক্যাল ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হয়। পটকা মাছের বিষাক্ততায় ১ ঘণ্টার মধ্যে পর্যায়ক্রমে রোগীর  ঠোঁট ও জিহ্বায় জড়তা,  মাথা ব্যথা, বমি বমি ভাব, মুখে শুষ্কতা, মাংসপেশিতে ব্যথা ইত্যাদি নানা উপসর্গ দেখা দিতে পারে। পর্যায়ক্রমে রোগী পক্ষাঘাতগ্রস্ত হতে থাকে। পরিণামে ৪ থেকে ৬ ঘণ্টার মধ্যে শ্বাসকষ্টে মৃত্যুও হতে পারে। তাই রোগীর প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগীকে স্থানীয় হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হবে এবং চিকিত্সা গ্রহণ করতে হবে।

পটকা মাছের বিষ (টেট্রোডোটক্সিন) শুধু পটকা মাছেই নয় অন্যান্য জীবেও পাওয়া যায়। এগুলো হচ্ছে অকটোপাস, স্টার ফিশ, শামুক, আফ্রিকান ব্যাং, ঝিনুক, নিউট, ফ্লাটওয়ার্ম, ব্যাকটেরিয়া ইত্যাদি। বিভিন্ন প্রজাতিতে টেট্রোডোটক্সিনের উপস্থিতি বিজ্ঞানীদের নিকট এখনো রহস্যময়। 

n লেখক : বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা

ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী