সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম বলেছেন, কিছু লোক লেখাপড়া শিখে জনগণের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার জন্য। এরা হোয়াইট কলার ক্রিমিনাল। এদের কাজই হচ্ছে জনগণের টাকা হাতিয়ে নেওয়া। তিনি বলেন, আগে তো এত ব্যাংক ছিল না। মানুষ গোলায় ধান রাখত। এটাই ছিল গ্রামীণ অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য। কিন্তু মানুষ এখন ব্যাংকে টাকা রাখে। এখন অনেকেই ব্যাংক করেন জনগণের আমানতের টাকা লুটের জন্য। এভাবে জনগণের আমানত লুট করবে তা হতে পারে না।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স সার্ভিস লিমিটেডের (আইএলএফএস) অবসায়ন সংক্রান্ত মামলার শুনানিকালে অ্যাটর্নি জেনারেল আদালতকে এ কথা বলেন। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের তিন বিচারপতির বেঞ্চে এ শুনানি চলে। আদালত বলেন, সঠিক নজরদারি না থাকলে যা হয়। আজ বুধবার এ বিষয়ে আদেশের জন্য দিন ধার্য রেখেছে আদালত।
হাইকোর্টের আদেশে আইএলএফএস-র স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান ও পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ আদালতে বলেন, ২০১৫ সাল পর্যন্ত ইন্টারন্যাশনাল লিজিং খুবই ভালোমত চলছিল। ২০১৬ সাল থেকে এর অবস্থা খারাপ হতে থাকে। এর পেছনে ‘কি পারসন’ (মুখ্য ব্যক্তি) হিসেবে কাজ করেছেন প্রশান্ত কুমার হালদার। তার সঙ্গে আরো অনেকেই রয়েছেন। এরা একসঙ্গে অনেক শেয়ার কিনে কোম্পানিটির আগের নেতৃত্বকে বের করে দেন। তিনি বলেন, পিকে হালদারসহ কিছু ব্যক্তি এই কোম্পানি থেকে ১ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে তা লেখা আছে। সর্বশেষ কোন ব্যক্তি পর্যন্ত এই টাকা গেছে তা জানা যায়নি। এই টাকা ফেরত আসার সম্ভাবনা নেই। টাকা কোথায় আছে সেটা আনট্রেসেবল (হদিস পাওয়া যাচ্ছে না)। দেশেও থাকতে পারে আবার দেশের বাইরেও যেতে পারে। তবে এই টাকা উদ্ধার করতে রিকোভারি এজেন্ট নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। এ ধরনের এজেন্ট দিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমার আছে।
তিনি বলেন, পিপলস লিজিংকে অবসায়ন করা হয়েছে। এখন যদি একই ভাবে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংকেও অবসায়ন করা হয় তাহলে নন ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ধস নামতে পারে। তিনি বলেন, বর্তমানে কোম্পানিটির যে অবস্থা তাতে এটাকে কতটা দাঁড় করানো যাবে সেটা নিয়ে আমি সন্দিহান। আমি সাহস পাচ্ছি না। আমি তো এই কোম্পানির কোনো শেয়ারহোল্ডার নই। উচ্চ আদালতের আদেশে আমাকে স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান করা হয়েছে। বাইরে থেকে এসে আমি এটাকে কতটা দাঁড় করাতে পারব! যদি শর্ষের মধ্যে ভূত থাকে আমি কি করতে পারি! তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিকল্পনা (স্কিম) ছাড়া পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল লিজিংকে টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। তিনি বলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাত ছোটো হলেও গুরুত্বপূর্ণ। পিপলস লিজিং অবসায়ন হয়েছে। এখন ইন্টারন্যাশনাল লিজিংকেও বাঁচিয়ে রাখতে পারলে ভালো হবে।
প্রধান বিচারপতি কোম্পানিটির আমানতকারীদের অবস্থা জানতে চাইলে ইব্রাহীম খালেদ বলেন, টাকা তো নাই। তারা চাইলেও টাকা ফেরত দেওয়া যাচ্ছে না। আইএলএফএসের এমডি অসুস্থ। কনিষ্ঠ একজনকে ভারপ্রাপ্ত এমডির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালায় আছে তিন মাসের বেশি ভারপ্রাপ্ত কাউকে দায়িত্বে রাখা যায় না। এটা বেআইনি না অনিয়ম। আমি প্রথম বৈঠকেই বলেছি দ্রুত ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দিতে।
শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আইএলএফএসের পরিচালক প্রশান্ত কুমার হালদার (পিকে হালদার) হাজার কোটি টাকা নিয়ে দেশ থেকে কীভাবে পালিয়ে গেল সেটা আদালতের দেখা উচিত। দেশের অর্থনীতিকে বাঁচাতে হাইকোর্ট ঐ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিদের পাসপোর্ট ও সম্পত্তি জব্দের আদেশ দিয়েছে। কোর্টের আদেশ যদি স্থগিত করা হয় তাহলে যারা আইএলএফএসকে ডুবিয়েছে তারাই লাভবান হবেন। আমার প্রার্থনা হাইকোর্টের আদেশ যেন স্থগিত করা না হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. শাহ আলম আদালতে বলেন, বিধিবহির্ভূতভাবে টাকা নিয়ে যাওয়ায় ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের মূলধনের এই ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্ট ইউনিট বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করছে। এরই মধ্যে একটি প্রতিবেদন জমাও দিয়েছে। মোট ৪৮টি ঋণ হিসাবের সঙ্গে ১২টি প্রতিষ্ঠান ও কতিপয় ব্যক্তির বিপরীতে মোট ১ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। এতে বোর্ড অব মেম্বাররাই দায়ী। এছাড়া কিছু কোম্পানি ছিল যেগুলো ফিকটিশাস। এই ৪৮টি ঋণ হিসাবের লেনদেন ভাউচার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। আমি মনে করি নতুন নিযুক্ত স্বাধীন চেয়ারম্যান ইব্রাহীম খালেদের নেতৃত্বে কোম্পানিটি পুনর্গঠন করা সম্ভব।
আদালত বলেন, আমরা দেখলাম একজন ব্যক্তি একাই সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা নিয়ে গেছে। আপনাদের হিসাব কি শুভঙ্করের ফাঁকি? নির্বাহী পরিচালক বলেন, পিকে হালদারসহ অন্যরা এই কোম্পানি থেকেই সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে পাওয়া যায়নি। তবে অফিসিয়াল রেকর্ডে ১ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকার অনিয়ম পাওয়া গেছে। যেখানে পিকে হালদারের সহযোগিতা রয়েছে। তবে অন্যান্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে এ টাকা নিয়েছে কিনা সেটা গোয়েন্দা ইউনিট তদন্ত করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনজীবী তানজীব উল আলম বলেন, যারা শেয়ার কিনে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং দখল করেছে তারা ডাকাতির জন্যই এসেছিল। তিন বছরে আগ্রাসি ঋণ বিতরণের মাধ্যমে ১ কোটি টাকার বেশি ১৩৩টি ঋণের নামে ২ হাজার ১০৮ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়। বিতরণকৃত ঋণের অর্থ ৭৮১টি চেকের মাধ্যমে দুটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ৪১টি ব্যাংক ও কিছু ব্রোকারেজ হাউজে স্থানান্তর করা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ ব্যাংকের চেক ব্যবহার করে ঋণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয় এমন ব্যক্তি অথবা প্রতিষ্ঠানের হিসাবে অর্থ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, যাতে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের আড়াল করা যায়। এ অনিয়মের জন্য কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ দায়ী।
ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের কৌঁসুলি আহসানুল করিম বলেন, এখানে (শুনানিতে) কোম্পানি অবসায়নের কথা এসেছে। কোম্পানি যদি ভেঙে যায় তাহলে কিছু থাকবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকও বলেছে কোম্পানি পুনর্গঠনের কথা। অবসায়ন হয়ে গেলে আর ব্যবসা থাকবে না। অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকও চাচ্ছে যেকোনোভাবে কোম্পানিকে বাঁচাতে। তিনি বলেন, এই কোম্পানিতে কিছু ভালো শেয়ার হোল্ডার ও পরিচালক আছেন। যদি এটাকে অবসায়ন করা হয় তাহলে বড়ো ধরনের প্রভাব পড়বে আর্থিক প্রতিষ্ঠানে। আমি এখন নিজেকেই বাঁচাতে চাই। আমি সামনের দিকে চলতে চাই, ব্যবসা করতে চাই। আমি চাই না আমার কোম্পানির অবসায়ন হোক। তিনি বলেন, পিকে হালদারের কারণে আজকে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের এ অবস্থা। পিকে হালদারকে যে শাস্তি দেন আমাদের আপত্তি নাই। পিকে হালদারসহ জড়িতদের আমিও শাস্তি চাই। কিন্তু এদের জন্য যদি আমাদের মরতে হয় তাহলে ব্যাংকিং খাত ধ্বংস হয়ে যাবে।
