বিরোধীদের হয়রানি করলেও ক্ষমতাসীনদের প্রতি নমনীয় দুদক :টিআইবি

আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:৪৩

কাগজে-কলমে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) স্বাধীন, তবে বাস্তবে নয় বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। গতকাল মঙ্গলবার ‘দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ উদ্যোগ:বাংলাদেশ দুর্নীতি দমন কমিশনের ওপর একটি ফলোআপ গবেষণা’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। টিআইবির ধানমন্ডিস্থ কার্যালয়ে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজদের না ধরে, ছোটখাটো দুর্নীতি নিয়েই দুদকের কার্যক্রম চলছে। ক্ষমতাসীন দলের এমপি, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে জিজ্ঞাসাবাদ পর্যন্ত দুদকের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ, এরপর কোনো অগ্রগতি দেখা যায় না। বিরোধী দলের রাজনীতিকদের হয়রানি করা হয়, অপরদিকে ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিকদের প্রতি নমনীয়তা দেখানো হয়।

তিনি বলেন, সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এর মধ্যে একটি ধারা সংযুক্ত করে দুদকের আইনগত ভিত্তিকে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে মানি লন্ডারিংয়ের দুর্নীতি দুদকের আওতা বহির্ভূত করা হয়েছে। এছাড়া ব্যক্তিমালিকানাধীন খাত এখনো দুদকের এক্তিয়ার বহির্ভূত। এগুলো সরকারের সদিচ্ছার ঘাটতির পরিচায়ক। অন্যদিকে দুদকের মধ্যে এমন মানসিকতা দেখা যায়, যেন এটি একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান, যা প্রশাসনের ওপর নির্ভরশীল। এটি যে স্বাধীনভাবে সরকারকে জবাবদিহিতার আওতায় আনবে, সে ধরনের মানসিকতা ও প্রয়াস দুদকের মধ্যে নেই, সরকারের পক্ষ থেকেও নেই। এ সব কারণে উচ্চ পর্যায়ের ব্যাপকভাবে আলোচিত দুর্নীতির নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয় না।

ইফতেখারুজ্জামান আরো বলেন, দুদক মানুষের আস্থা অর্জনে করতে পারেনি। দুদকের হটলাইনে প্রচুর অভিযোগ আসে। কিন্তু সেসব অভিযোগের ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়া হয় খুবই কম। কেন বেশির ভাগ অভিযোগের ক্ষেত্রে দুদক ব্যবস্থা নেয়নি তারও কোনো ব্যাখ্যা নেই। তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক পরিচয়ে নয়, ছোটো-বড়ো সব দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে হবে।

গবেষণার মূল্যায়ন অনুযায়ী বাংলাদেশ দুর্নীতি দমন কমিশনের সার্বিক স্কোর ৬০ শতাংশ যা ‘মধ্যম’ পর্যায়ের নির্দেশ করে। এই স্কোর ‘উচ্চ’ পর্যায় থেকে ৭ পয়েন্ট কম। গবেষণা অনুযায়ী দুদক ৫০টি নির্দেশকের মধ্যে মোট ২১টি নির্দেশকের ক্ষেত্রে ‘উচ্চ’, ১৮টি ক্ষেত্রে ‘মধ্যম’ এবং ১১ নির্দেশকের ক্ষেত্রে ‘নিম্ন’ স্কোর করেছে। দুদকের ‘প্রতিরোধ, শিক্ষা ও আউটরিচ কার্যক্রম’ বিবেচ্য ছয়টি ক্ষেত্রের মধ্যে সর্বোচ্চ স্কোর করেছে (৭৫%), ‘স্বাধীনতা ও মর্যাদা’ ৬৭ শতাংশ এবং ‘সহযোগিতা ও বাহ্যিক সম্পর্ক’ ৬৭ শতাংশ স্কোর পেয়েছে। অপরদিকে ‘অনুসন্ধান, তদন্ত ও মামলা দায়ের’ ৪৪ শতাংশ অর্থাত্ সবচেয়ে কম স্কোর পেয়েছে। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে দুর্নীতি দমনমূলক কার্যক্রমে দুদক পিছিয়ে আছে।

২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে এই গবেষণা করা হয়েছে। দুদকের মূল চ্যালেঞ্জগুলোর বাস্তব সমাধান বা সংস্কারের জন্য ১৬ দফা সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। এর মধ্যে দুদকের কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট আইন (দুদক আইন ২০০৪, অর্থপাচার প্রতিরোধ আইন ২০১২ ও সরকারি চাকরি আইন ২০১৮) সংশোধনসহ দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের নিয়োগ প্রক্রিয়া আরো স্বচ্ছ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন অধ্যাপক ড. পারভীন হাসান, উপদেষ্টা (নির্বাহী ব্যবস্থাপনা) অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের। গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন টিআইবির গবেষণা ও পলিসি বিভাগের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার শাহজাদা এম আকরাম ও প্রোগ্রাম ম্যানেজার শাম্মী লায়লা ইসলাম।