সময় নাট্যদলের সময়োচিত নাটক
মা হ বু ব আ ল ম
সময় নাট্যদলের ২৬তম প্রযোজনা সা’দাত হাসান মান্টোর ‘টোবাটেক সিং’ গল্প অবলম্বনে মান্নান হীরার রচনা ও আলী যাকেরের নির্দেশনায় নাটক ‘ভাগের মানুষ’। ভাগের মানুষগুলো মতিভ্রষ্ট। সহজ ভাষায় বলতে হয় পাগল। সা’দাত হাসান মান্টো এই পাগলদের নিয়েই লিখেছেন ‘টোবাটেক সিং’। গল্পের টোবাটেক সিং এক অদম্য দেশপ্রেমিকের নাম। একাই দেশ ভাগের সময় ধর্মযুদ্ধে টোবাটেকের মানুষকে বাঁচিয়েছে। যব আর ভুট্টা রক্ষা করেছে। তার কাছে হিন্দু আর মুসলিম বলে কোনো বিভেদ ছিল না। সুস্থ্য মস্তিষ্কের মানুষ থাকাকালে তার নাম ছিল বচন সিং। লাহোরের এক পাগলা গারদে তাকে রেখে গিয়েছিল গ্রামের কয়েকজন। সেখানেই তার বাস। ব্রিটিশদের শেষ সময়ে নানা ষড়যন্ত্রের এক অংশ হলো ধর্মভিত্তিক মানুষ নিয়ে দেশ ভাগ করে দেওয়া। এটা যে একটা বিরাট ফাঁদ ছিল তাদের সেটা লাহোর পাগলা গারদের পাগলেরা বুঝতে সক্ষম ছিল। কিন্তু সুস্থ্য মস্তিষ্কের স্বাভাবিক স্বার্থান্বেষী মানুষেরা সেটা বুঝতে অক্ষম ছিল। বলা যায়, এ সময়ের ভারত, পাকিস্তান বা এই উপমহাদেশের প্রায় মানুষই সেই অক্ষম অবস্থায় আছে। আবার নাটকে রূপাকে ধর্ষণের মাধ্যমে ফুটে ওঠে বর্তমান বাস্তবতা। যাইহোক, পাগল বিনিময়ের মাধ্যমে শুরু হয় নতুন দুই দেশের নতুন অধ্যায়। ধর্মের ভিত্তিতে তারা ভারত আর পাকিস্তানের পাগলা গারদে চলে যাবে। হিন্দুদের স্থান হবে হিন্দুস্তানে আর মুসলমান পাগলদের স্থান হবে পাকিস্তানের পাগলা গারদে। এভাবেই চলতে থাকে পাগল বিনিময়। হিন্দু মুসলিমের কথা উঠলে টোবাটেক সিং ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। যে কারণে তাকে গুলি করে হত্যা করে বন্দী বিনিময় করতে আসা সৈনিকেরা। কিন্তু কোন দেশের সৈনিকের গুলিতে সে নিহত হয়েছে তার কোনো সুরাহা হয় না দু’দিনেও। তার লাশ পরে থাকে নো ম্যান্স ল্যান্ডে। এরই মধ্যে শিয়াল কুকুরে খেয়ে ফেলে তার মৃতদেহ। এভাবে এক দেশের মানুষ দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। ভাগের মানুষগুলো অনিচ্ছা সত্বেও ভাগ হয়ে যায়।
আলী যাকেরের নির্দেশনায় তাকে আলোক নির্দেশক হিসেবে সহযোগিতা করেন আলোক পরিকল্পক ঠান্ডু রায়হান। সুন্দর, ছিমছাম আলো। কোথাও যেন বাড়াবাড়ি নেই। সেই আলোর নিচে নানা চরিত্রে চমত্কার অভিনয় করেন সময়ের অভিনেতারা। প্রত্যেকের দীর্ঘ অভিনয় অভিজ্ঞতা নাটকের মান বৃদ্ধি করে বহুগুণ। তবে নাটকের কুশিলব বা অভিনেতারা তখনই তুষ্ট হোন যখন তাদের সামনে থাকে হল-ভর্তি দর্শক। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির নাট্যমঞ্চে ‘দর্শক খরা’ কথাটির সাথে অনেকেই একমত বা সহমত পোষণ করে থাকেন। কখনো বলেন নাটকের মানের কথা আবার কখনো নানা অজুহাত তো থাকেই। ভাগের মানুষ সময় নাট্যদলের সময়োচিত নাটক বলেই মনে হয়েছে এবং নাটকটির দেশ বিদেশে সুনামের মূলে রয়েছে তাদের মানসম্মত অভিনয় এবং নির্দেশক আলী যাকেরের নির্দেশনা গুণ। গত সোমবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার মঞ্চে দর্শক ছিল একেবারেই হতাশাজনক। সংখ্যা উল্লেখ করলে হয়তো অনেকেই শিল্পকলা একাডেমির মাঠে যে জাতীয় পিঠা উত্সব হচ্ছে তার দোষ দিতে পারেন। তবে এই আশাহত দর্শক সংখ্যা শুধু পিঠা উত্সবের সময়েই নয় এবারের জাতীয় নাট্যোত্সবের প্রায় প্রতিদিনই। এরও কারণ নন্দন মঞ্চে নানা অনুষ্ঠান বলেই মনে হয়। আবার আয়োজকদের সাজগোজ দেখে উত্সবের আমেজ তৈরি না হওয়াটাও একটা কারণ হতে পারে। অথবা ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার অভাব। দেশের প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়াগুলোতে তেমন কোনো প্রচার না হওয়া নাট্যদর্শক কম হওয়ার আরেক কারণ হতে পারে। তবে, এই সবই সম্ভাবনা। একটি কথা মনে পড়ছে, তা হলো—উঠোনে বাদর নাচের আয়োজন করে ঘরের ভেতরে পুতুল নাচের আয়োজন। ক’জনই আগ্রহ দেখায়। তা-ও আবার অর্থের বিনিময়ে। যত আয়োজন করে শিল্পীতভাবেই রঙ-বেরঙয়ের পুতুল সাজিয়ে নাচিয়েরা বসে থাকুক না কেন, বিনি পয়সার রস খানিকটা কম মিঠে হলেও মন্দ কি! আমাদের জাতীয় নাট্যশালার নাট্যমঞ্চে নাটকের মঞ্চায়ন আর বাইরের মঞ্চে বা মাঠে আনন্দযজ্ঞের আয়োজনও সেইরূপ।
