আবদুল্লাহ ওমর সাইফ
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় লিখেছেন—‘মরিচপোড়া গল্পটি আমাকে মুগ্ধ করেছে এর এক প্রগাঢ় রহস্যময়তার জন্য। উত্তমপুরুষে যে চরিত্রটি তিনি তৈরি করেছেন তা তাঁর শক্তিমত্তারই পরিচয় বহন করছে
আগেই বলে নিচ্ছি গল্প জিনিসটা কিন্তু মোটে দুই রকমভাবে বলতে শুনি। এক ধরনের হচ্ছে বিশেষজ্ঞের ভঙ্গিতে বলা। এক্ষেত্রে চালটা হয় একটু ভারিক্কি গোছের, মনে হবে যেন অঙ্কের টিচার ক্লাসে মানসাঙ্ক পড়াচ্ছেন। আরেক ধরনের গল্প বলাও আছে, যেখানে আমরা ছাপার অক্ষরেই গল্পকথকের জাদুকরি কণ্ঠস্বর শুনতে পাই। এ যেন অনেকটা মহাভারতের কথক সৌতি—একের পর এক কাহিনির সরস বিস্তারের মোহনীয় বর্ণনা দিয়ে যাচ্ছেন। রীতিমতো রবীন্দ্রনাথের শেষ হইয়াও হইল না শেষের দুর্দমনীয় অনুবর্তন। সাইফুর রহমান এক্ষেত্রে যেন সৌতির দেখানো পথকেই অনুসরণ করছেন এবং এই সংকলনটিতে গল্পের ছদ্মবেশে অক্ষরবন্দি করতে চেয়েছেন ইতিহাসবিখ্যাত সব মানুষের জীবনের অনন্যাসাধারণ কিছু ‘ক্ষণ’। তার গল্পগুলিতে তাই কখনো দেখতে পাই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের পুত্র রথীন্দ্রনাথ লন্ডনের পাতাল রেলে যখন গীতাঞ্জলির পাণ্ডুলিপিখানা হারিয়ে ফেলেন তখন অনুশোচনায় রথীন্দ্রনাথের আত্মহত্যা করতে ইচ্ছা করে। তার গল্পে কখনো আবার হাজির হন বাংলাদেশের জনপ্রিয়তম লেখক হুমায়ুন আজাদ। একজন লেখক হিসেবে তার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের আখ্যানটি বড়োই চমকপ্রদ। অন্যদিকে বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয়তম লেখক শরত্চন্দ্র যেভাবে জড়িয়ে পড়েন একটি হত্যাকাণ্ডে সেটা যেন কল্পনাকেও হার মানায়। ইতিহাসের পাতা থেকে ধুলোময়লা ঝেড়ে লেখক তুলে এনেছেন কতগুলো চমকপ্রদ ইতিহাসের অধ্যায়। সেইসঙ্গে আছে তার জাদুকরি কল্পনা। ইতিহাস ও কল্পনা মিলেমিশে তার গল্পে তৈরি হয়েছে এক অপূর্ব শৈল্পিক ইন্দ্রজাল। গল্পকার সাইফুর রহমানের গল্প পড়ে এ সময়ের কিংবদন্তিতুল্য সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় লিখেছেন—‘মরিচপোড়া গল্পটি আমাকে মুগ্ধ করেছে এর এক প্রগাঢ় রহস্যময়তার জন্য। উত্তমপুরুষে যে চরিত্রটি তিনি তৈরি করেছেন তা তাঁর শক্তিমত্তারই পরিচয় বহন করছে। এই চরিত্রটির মধ্যে যে বিভ্রমটা রয়েছে তার ভিতরে জাদুবাস্তবের ছায়া পাই। এই গল্পে এক গ্রামীণ মহিলাকে কত প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকতে হয় তার বেদনাবহ বর্ণনা আছে। এদের যেন সুখের জীবনযাপন করতে নেই। প্রোষিতভর্তৃকা মিতুজা নাম্মী মেয়েটিকে যে পুরুষের কাছে শরীর দিতে হলো সে তার সম্পর্কে গুরুজন। অল্প আয়াসে মেয়েটির অসহয়তা ভারি ভালো ফুটিয়েছেন সাইফুর।’
তিনি আরো লিখেছেন—‘এই সংকলনটির আর একটি উপভোগ্য গল্প হলো ‘দেনা-পাওনা’। নাজিমগড়ের নবাব আসাফউদ্দোলার রসবোধ ও জীবনযাপনের ভেতরে একটু উঁকি দিয়ে আসার চেষ্টা আর কী। এক আগন্তুক গায়কের সংগীতে মুগ্ধ হয়ে মদের ঘোরে তাকে জায়গির দিয়ে দিলেন, তারপর আর জায়গির প্রদানের উচ্চবাচ্য নেই। গায়ক যখন তার দাবিদাওয়া নিয়ে উপস্থিত হলো তখন নবাব অম্লান বদনে বললেন—বাপু হে, তোমার গান যেমন আমার কানে মধু ঢেলেছে তেমনি আমিও তোমার কানে মধু ঢেলেছি জায়গিরের কথা বলে। বেশ লাগল গল্পটি। সাইফুরের ভাষা অতীব সরল এবং বিবরণ বাস্তবমুখী বলেই এইসব গল্পের একটা সহজ আবেদন আছে। সাইফুরের বিশিষ্টতা হলো তিনি তৃণমূলস্তরের মানুষকে অনেকটা চেনেন। না হলে ‘কালো কঙ্কাল’ গল্পটা লিখতে পারতেন না। তালেব মিয়া, লতু আর আকেলের গল্প। গল্পটির মধুর সমাপ্তি বেশ উপভোগ্য। গরিব মানুষকে বাঁচার জন্য কত কী যে করতে হয় তা তালেব মিয়ার জীবনযাপনের সংক্ষিপ্ত বিবরণের ভেতর দিয়ে ভালোই ফুটেছে আর সাহিত্যানুরাগী লতুকেও পাঠকের পছন্দ হবে।’
সাইফুর রহমানের গল্পগুলোতে চিত্রিত হয়েছে আমাদের পারিপার্শ্বিকের বৃত্তে ঘটে যাওয়া অদ্ভুত সব ঘটনার দুর্দান্ত কথন। কালো কঙ্কাল, অনাহূত অতিথি, গোরস্থানে একজন রহস্যময় যুবক, দেনা পাওনা অদ্ভুতুড়ে পরিস্থিতির গল্পই যেন শুনতে পাই আমরা। মরিচপোড়া গল্পটি লেখকের ভিন্ন আঙ্গিকে লেখা একটি গল্প। নির্মোহ ও চমকপ্রদ শৈলীতে এ ধরনের গল্প বাংলা সাহিত্যে খুব কমই লেখা হয়েছে বলে আমাদের ধারণা।
প্রকাশক :প্রকৃতি
