দক্ষ ও দায়িত্ববান চালক ব্যতীত সড়কে মৃত্যু কমবে না

আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২১:২৬

এ কে এম শহীদুল হক

ট্রাফিক যানজট যেমন মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে, তেমনি সড়ক দুর্ঘটনায় অকাল মৃত্যুর হাতছানি জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। ট্রাফিক পুলিশের হাত-সিগন্যাল দ্বারা যানবাহন নিয়ন্ত্রণের সনাতনী পদ্ধতি বর্তমান ডিজিটাল যুগে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ক্রমবর্ধমান এবং সড়কের ধারণ ক্ষমতার মাত্রাতিরিক্ত যানবাহনের চাপে ট্রাফিক পুলিশ যানবাহন নিয়ন্ত্রণে শুধু হিমশিমই খাচ্ছে না, তারা অতিরিক্ত পরিশ্রম, ধূলাবালি ও পরিবেশ দূষণে নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। অনেকে অকাল মৃত্যুর মুখেও পতিত হচ্ছে। ট্রাফিক পুলিশের এত পরিশ্রম, এত কষ্ট, এত আত্মত্যাগ সড়কে যানজট নিরসন, শৃঙ্খলা রক্ষা ও দুর্ঘটনা হ্রাস করতে পারছে না। আধুনিক যুগে ডিজিটালাইজড ট্রাফিক মনিটরিং পদ্ধতি (Digitalised Traffic Monitoring System) দ্বারা সনাতনী পদ্ধতির  প্রতিস্থাপন ব্যতীত সড়কে ট্রাফিক শৃঙ্খলা স্থাপন করা কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। সেই সঙ্গে প্রয়োজনীয় সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ, সড়কের নির্মাণ ত্রুটি দূরীকরণ এবং সড়কের ধারণক্ষমতার পরিমাপে যানবাহনের সংখ্যা নিরূপণসহ আরো কিছু পদক্ষেপ নেওয়া আবশ্যক। আমি পুলিশ প্রধান থাকাকালে ঢাকা মহানগরে ডিটিলাইজড ক্রাইম ও  ট্রাফিক মনিটরিং সিস্টেম নামে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রকল্প প্রস্তুত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়য়ে প্রেরণ করেছিলাম। বিদেশি বিশেষজ্ঞদের দ্বারা ফিজিবিলিটি স্টাডির আলোকে পেশাদার ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের  দ্বারা  প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়েছিল। কাস্টম ট্যাক্স ও ভ্যাটসহ প্রকল্পের ব্যয় ছিল সম্ভবত ৫ হাজার কোটি টাকা। আমি তত্কালীন পরিকল্পনামন্ত্রী (বর্তমান অর্থমন্ত্রী) মহোদয়ের সঙ্গেও আলাপ করেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, ‘প্রকল্প আমাদের কাছে পাঠিয়ে দিন। অর্থ সংস্থানের ব্যবস্থা আমরা করব ইনশা আল্লাহ।’ কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সে প্রকল্প এখনো অনুমোদন পর্যায়ে আসেনি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রতি সপ্তাহে একনেক সভায় সভাপতিত্ব করেন এবং হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের অনুমোদন দেন। আমার বিশ্বাস এ প্রকল্প একনেকে উপস্থাপিত হলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অবশ্যই অনুমোদন দিতেন। আমি নিজেকে ধন্য মনে করি এই ভেবে যে, আমি পুলিশের রেভেনিউ বাজেট থেকেই জাতীয় জরুরি সেবা-৯৯৯ চালু করতে পেরেছিলাম। আজ জনগণ ৯৯৯-এ কল করে জরুরি সেবা পাচ্ছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পড়লে জরুরি সেবা ৯৯৯ এখনো আলোর মুখ দেখত কি না সন্দেহ আছে।

আজ আমার লেখার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস করার জন্য কোনো বিষয়ের ওপর অধিক গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে যানজট ও সড়কের শৃঙ্খলার বিষয়টি চলে এসেছে। সড়কে মৃত্যু কমছে না। মৃত্যুর মিছিলে প্রায় প্রতিদিন যোগ হচ্ছে নারী, পুরুষ, শিশু ও যুবকের লাশ। মানুষের অকাল মর্মান্তিক মৃত্যু ও গুরুতর জখম কমাতে হলে সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে হবে। কিন্তু কীভাবে? অনেক চেষ্টাই করা হয়েছে। অনেক কৌশল নেওয়া হয়েছে। নতুন আইন তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু অবস্থার তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। দুর্ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে। সড়কে বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনা—এ সমস্যার বহুবিধ কারণের মধ্যে প্রধান কারণ হলো চালকের অদক্ষতা, দায়িত্বহীনতা ও বেপরোয়া গাড়ি চালানো। আমাদের দেশের অধিকাংশ দুর্ঘটনাই ঘটে চালকের অদক্ষতা, অবহেলা ও বেপরোয়া গাড়ি চালানোর কারণে। কাজেই চালকরা যদি দক্ষ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, দায়িত্ববান, কর্তব্যপরায়ণ, সংবেদনশীল ও পেশেদার হয়—তবে তাদের দ্বারা সড়ক দুর্ঘটনা বহুলাংশে কমে যাবে।

দক্ষ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও দায়িত্ববান চালক তৈরি করতে হলে সরকারি উদ্যোগ আবশ্যক। এ সংক্রান্তে আমার বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে অতীতে বিভিন্ন ফোরামে আলোচনা করেছি, মতামত দিয়েছি, লেখালেখি করেছি। আজ অবার কতিপয় মতামত এ লেখার মাধ্যমে দেওয়ার সুযোগ নিতে চাই।

প্রথমত দক্ষ, পেশাদার ও সংবেদনশীল চালক তৈরির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ অত্যাবশ্যক। এ লক্ষ্যে বিআরটিএ মহানগর ও দেশের বড়ো বড়ো জেলাগুলোতে ড্রাইভিং স্কুল তৈরি করতে পারে এবং সেখানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক দক্ষ প্রশিক্ষকের নিয়োগের ব্যবস্থাও থাকতে হবে।  একটি পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস তৈরি করে চার বা ছয় মাসের ড্রাইভিংয়ের ওপর  মৌলিক কোর্স চালু করতে পারে। সিলেবাসে গাড়ি চালানো ব্যতীত মোটরযান আইন, বিধিবিধান, সড়কে সাইন-সিম্বল শিখানোর পাশাপাশি তার শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিক উপযুক্ততা পরীক্ষা করতে হবে। দুর্ঘটনায় চালক ও যাত্রীর কী পরিণতি হয় সে ব্যাপারে বাস্তব দৃষ্টান্ত উল্লেখপূর্বক তাদের সংবেদনশীল (Sensitised) করতে হবে। মনোবিজ্ঞানী, চিকিত্সক, সমাজবিজ্ঞানী ও Counsellor-দের দ্বারা তাদেরকে counselling করতে হবে, যাতে গাড়ির  স্টিয়ারিংয়ে বসলে সড়ক দুর্ঘটনার পরিণতি তার চিন্তায় আসে এবং নিজের ও যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা প্রতি মুহূর্তে স্মরণ রাখে। এতে দুর্ঘটনা কমে যাবে। বিআরটিএ চূড়ান্ত পরীক্ষায় কৃতকার্য দক্ষ চালকদের তালিকা বা প্যানেল তৈরি করে রাখতে পারে। দক্ষ চালক তৈরির জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত নীতিমালা মোতাবেক বেসরকারি পর্যায়ে ড্রাইভিং স্কুল প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করার অনুমতিও দেওয়া যেতে পারে। এটা দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা।

দ্বিতীয়ত, পরিবহন শ্রমিক তথা চালক ও হেলপারদের সামাজিক মর্যাদার বিষয়ের প্রতিও দৃষ্টি দিতে হবে। সমাজে তাদের মর্যাদা নিম্ন স্তরে। অথচ তাদের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। তাদের মালিকপক্ষ কোনো নিয়োগপত্র দেয় না। কোনো বেতন স্কেল নেই। চাকরির নিশ্চয়তা বা নিরাপত্তা নেই, ভবিষ্যত্ নেই, বেতন-ভাতা সন্তোষজনক নয়। দুর্ঘটনায় পতিত হলে চিকিত্সা করার সামর্থ্য নেই। দুর্ঘটনা বা অন্য কারণে চালক গ্রেফতার হলে তাকে জামিনে আনা এবং তার সংসার দেখাশোনা করার কেউ থাকে না। এক গাড়িতে এক জন চালক থাকায় তাদের অধিক কর্মঘণ্টা কাজ করতে হয়। এ অবস্থায় পরিবহন শ্রমিকদের কোনো Job satisfaction বা চাকরিতে আত্মসন্তুষ্টি থাকে না। কাজের প্রতি তাদের devotion আসে না এবং সমাজের প্রতিও তাদের মনে একটা বৈরী দৃষ্টিভঙ্গি (hostile attitude)  সৃষ্টি হয়।

তৃতীয়ত, পরিবহন শ্রমিকদের আচরণ নিয়ন্ত্রণের এবং যাত্রীসেবার গুণমান নিশ্চিত করার জন্য কোনো আচরণবিধি নেই। তাই তাদের কোনো জবাবদিহিতাও নেই। পরিবহন শ্রমিকদের জন্য আচরণবিধি প্রণয়ন করা আবশ্যক।

চতুর্থত, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ব্যাপক সংস্কার ও পরিবর্তন আনয়ন আবশ্যক। দুই বা তিনটি কোম্পানি করে সব পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ঐ কোম্পানিগুলোর অধীনে তালিকাভুক্ত করে চালানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কোম্পানিগুলো বিআরটিএ-র কাছে চালকের চাহিদা দেবে। বিআরটিএ তাদের প্যানেল থেকে কোম্পানিগুলোকে চালক সরবরাহ করবে। কোম্পানিগুলোর চালক, হেলপার বা অন্যান্য কর্মচারীদের জন্য নির্দিষ্ট নিয়োগ বিধি থাকবে। স্কেলে বেতন কাঠামো নির্ধারণ করার বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে। কর্মচারীদের চাকরি নিরাপত্তা, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য চাকরিবিধি  প্রণয়ন করতে হবে। এতে পরিবহন শ্রমিকদের চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। ফলে তাদের মধ্যে Job satisfaction থাকবে, তারা  চাকরিকে ভালোবাসবে এবং চাকরির প্রতি মায়া ও dedication জন্মাবে। তখন তারা নিয়ম-নীতি অনুসরণ করে সতর্কতা ও দায়িত্বের সঙ্গে গাড়ি চালাবে। এসব ব্যবস্থা গ্রহণ করে কার্যকরভাবে অনুসরণ করলে সড়কে দুর্ঘটনা অবশ্যই হ্রাস পাবে এবং পরিবহন সেক্টরে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা হবে।

কোম্পানিগুলোর নিজস্ব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র  থাকতে হবে যেখানে শ্রমিকদের নিয়মিত  ইন-সার্ভিস প্রশিক্ষণ চলবে। 

দক্ষ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, দায়িত্ববান ও পেশাদার চালক তৈরি, শ্রমিকদের কল্যাণ নিশিচত এবং পরিবহন সেক্টরে সংস্কার আনা ব্যতীত সড়কে শৃঙ্খলা রক্ষা করা ও দুর্ঘটনা হ্রাস করা সম্ভব নয়। এ বাস্তবতা উপলব্ধি করে সংশ্লিষ্ট সবাইকে দক্ষ ও পেশাদার চালক তৈরি ও নিয়োগের প্রতি বিশেষভাবে জোর দিতে হবে। দুর্ঘটনার অন্য কারণগুলোর দিকেও পর্যায়ক্রমে নজর দিতে হবে।

n লেখক :সাবেক ইন্সপেক্টর জেনারেল, বাংলাদেশ পুলিশ