প্রতিটি হাতকে কর্মীর হাতিয়ারে পরিণত করতে হবে

আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২১:২৭

এম এ খালেক

বাংলাদেশ বর্তমানে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার মধ্য দিয়ে সময় অতিবাহিত করছে। অর্থনীতিবিদগণ মনে করেন, একটি দেশের মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশের বয়স যখন ১৫ থেকে ৬০ বছর অর্থাত্ কর্মক্ষম সীমার মধ্যে থাকে, তখন সেই অবস্থাকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বলা হয়। একটি জাতির জীবনে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থা একবারই আসে। অবশ্য কেউ কেউ বলেন, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থা হাজার বছরে একবার আসে। যে জাতি ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে, তারাই অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উন্নতি সাধন করতে পারে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৬৬ শতাংশ বা তার কাছাকাছির বয়স এখন ১৫ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে। কাজেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের এখনই সময়। আমাদের দেশে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থা শুরু হয়েছে ২০০০ সালে এবং তা অব্যাহতভাবে ২০৩৫ বা তারও কয়েক বছর বেশি সময় ধরে তা চলতে থাকবে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য আমাদের ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। কর্মক্ষম মানুষকে বেকার রেখে কখনোই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। তাই আমাদেরকে এমন একটি অবস্থার সৃষ্টি করতে হবে, যাতে প্রত্যেকটি কর্মীর হাত দক্ষ এবং উত্পাদনশীল কর্মীর হাতিয়ারে পরিণত হয়। আমাদের দেশে যারা উচ্চশিক্ষা অর্জন করেন, তাদের বেশির ভাগই প্রত্যাশা করেন একটি সরকারি চাকরি। যেনতেনভাবে একটি সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করতে পারলেই তারা বর্তে যান। কিন্তু একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, শুধু সরকারি চাকরি প্রদানের মাধ্যমে দেশের ক্রমবর্ধমান বেকার সমস্যা কখনোই সমাধান করা যাবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাধিকবার বলেছেন, সরকারি চাকরির পেছনে না ঘুরে আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে বেকার সমস্যা সমাধান করতে হবে। বাংলাদেশ ঈর্ষণীয় মাত্রায় উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে কিন্তু সেই তুলনায় কর্মসংস্থানের হার খুবই কম। এটা টেকসই উন্নয়নের পথে এক বিরাট প্রতিবন্ধকতা। দেশের শ্রমবাজারে প্রতি বছর প্রায় ২২ লাখের মতো নতুন মুখ যুক্ত হচ্ছে। কিন্তু এদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যাচ্ছে না। ব্যাপক মাত্রায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হলে এমন একটি অবস্থা তৈরি করতে হবে, যাতে চাকরিপ্রত্যাশীরা চাকরির পেছনে ঘুরবে না বরং উলটো চাকরিই কর্মীর পেছনে ঘুরবে। একমাত্র আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমেই সেটা করা সম্ভব। সরকার নানাভাবে চেষ্টা করছেন আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে বেকার সমস্যা সমাধান করতে। বর্তমানে প্রতি চার জন উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তির মধ্যে অন্তত একজন পূর্ণ বেকার। আর বেকারের হার উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিদের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি। যারা স্বল্প শিক্ষিত বা অশিক্ষিত তারা কোনো না কোনোভাবে একটি কাজ জোগাড় করে নেন কিন্তু উচ্চশিক্ষিতরাই সমস্যায় পড়েন বেশি। কারণ তারা চাইলেও বোধগম্য কারণেই যে কোনো কাজে নিযুক্ত হতে পারেন না। আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা মোটেও কর্মসংস্থানমুখী নয়। বরং বেকার সৃষ্টির কারখানা মাত্র। আমরা যদি ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার সুবিধা কাজে লাগিয়ে দেশকে উন্নত করতে চাই, তাহলে কর্মমুখী কারিগরি শিক্ষার ব্যাপক বিস্তারের কোনো বিকল্প নেই।

সরকার দেশে বেকার সমস্যা দূরীকরণের জন্য নানাভাবে কাজ করে চলেছেন। কিন্তু সেই উদ্যোগ বাস্তবতার নিরিখে পর্যাপ্ত বলে বিবেচনা করা যায় না। আমাদের আরো অনেক কিছু করতে হবে। চলতি অর্থবছরের জন্য বাস্তবায়নরত জাতীয় বাজেটে প্রথমবারের মতো ‘স্টার্ট আপ বিজনেস’ নামে একটি নতুন খাত তৈরি করে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো দেশের যুবশক্তিকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উপযুক্ত ও দক্ষ কর্মীতে পরিণত করা এবং সেই দক্ষ জনশক্তিকে আত্মকর্মসংস্থানের জন্য প্রাথমিক পুঁজির জোগান দেওয়া। বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (বিডা) দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে নির্বাচিত ২০ হাজার কর্মীকে কর্মমুখী প্রশিক্ষণ দানের উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারের সিইআইপি নামে একটি কার্যক্রমের মাধ্যমেও বেকার জনশক্তিকে প্রশিক্ষিত করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গত ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ তারিখে বাংলাদেশ ব্যাংক এক সার্কুলারের ইস্যুর মাধ্যমে এসএমই সেক্টরের পরিধি সম্প্রসারণ করেছে। এখন থেকে কুটির ও মাইক্রো শিল্পও এসএমই খাতের অন্তর্ভুক্ত করে নতুন এই খাতের নামকরণ করা হয়েছে কুটির, মাইক্রো, স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজ (সিএমএসএমই)। নতুন এই উদ্যোগের ফলে এখন থেকে কুটিরশিল্প ও মাইক্রো শিল্পগুলোও এসএমই শিল্পের জন্য প্রযোজ্য সুবিধা পাবে। সম্প্রতি মন্ত্রিসভায় সিএমএসএমই সেক্টরের উদ্যোক্তাদের বিনা জামানতে ব্যাংক ঋণ প্রদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। এতে এই খাতের উদ্যোক্তা, বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তারা উপকৃত হবেন। নানা কারণেই একজন নারী উদ্যোক্তা চাইলেও ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চাহিদাকৃত জামানত দিতে পারেন না। ২০১৬ সালের জাতীয় শিল্পনীতিতে ‘ওয়ান টাউন ওয়ান প্রোডাক্ট’ নামে একটি বিনিয়োগ কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে যে অঞ্চলে যে পণ্য বেশি পাওয়া যায় তার ওপর ভিত্তি করে শিল্পায়ন গড়ে তোলা। একে শিল্পের যেমন স্থানীয়করণ হবে তেমনি স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে উত্পাদন কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হবে।

উদ্যোক্তা উন্নয়নের জন্য আইনি কাঠামো প্রস্তুত। সরকার এই খাতের জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করছেন। কোনো কোনো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক স্বল্প সুদে এবং জামানতবিহীন ঋণ প্রদানের জন্য উদ্যোগ নিচ্ছে। অর্থাত্ উদ্যোক্তাদের আর্থিক ও আইনি সহায়তা প্রদানের মাঠ প্রস্তুত। এখন সেই সুযোগকে কাজে লাগানোর জন্য সম্ভাবনাময় কর্মমুখী উদ্যোক্তা উন্নয়নে আমাদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে কর্মমুখী উদ্যোক্তা উন্নয়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা কতটা মানসম্পন্ন তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। কর্মোদ্যমী প্রতিটি হাতকে দক্ষ কর্মীর হাতিয়ারে পরিণত করতে হলে আমাদের কারিগরি শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে হবে। কিন্তু এক্ষেত্রে আমাদের সফলতা খুব একটা বেশি নয়। বিষয়টি আমরা সেভাবে অনুধাবন করতে পারছি না। সরকার যতই উদ্যোগ গ্রহণ করুন না কেন তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে, যদি আমরা কর্মোপযোগী মানবসম্পদ গড়ে তুলতে না পারি। তাই এখন সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে উপযুক্ত এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা। দক্ষ জনশক্তির সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি তার উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। বাংলাদেশের ১ কোটিরও বেশি মানুষ বিদেশি শ্রমবাজারে কর্মরত। তারা গত বছর ১ হাজার ৬৪২ কোটি মার্কিন ডলার সমতুল্য ১ লাখ ৩৯ হাজার ৫৭০ কোটি (প্রতি মার্কিন ডলার ৮৫ টাকা হিসেবে) টাকা দেশে প্রেরণ করেছেন। একই সংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশিরা আরো অনেক গুণ বেশি রেমিট্যান্স প্রেরণ করতে পারত, যদি তারা উপযুক্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং দক্ষ হতেন। বিশেষ করে আমরা যদি পেশাজীবীদের বেশি বেশি করে বিদেশি শ্রমবাজারে প্রেরণ করতে পারতাম, তাহলে এ খাতের আয় আরো অনেক গুণ বাড়ানো যেত। আশির দশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে অপরিকল্পিত জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে দেশের ‘এক নম্বর জাতীয় সমস্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, জনসংখ্যা তা পরিকল্পিতই হোক আর অপরিকল্পিতই হোক, তা কখনোই এক নম্বর জাতীয় সমস্যা হতে পারে না। জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করতে না পারাটাই সমস্যা। এটা রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা। জনসংখ্যা উত্পাদন প্রক্রিয়ার এমনই এক আবশ্যিক উপকরণ, যা প্রশিক্ষিত হলে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ সম্পদ আর অপ্রশিক্ষিত হলে রাষ্ট্রীয় ‘দায়’ হিসেবে পরিগণিত হতে পারে। বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ দেশের শ্রেষ্ঠ সম্পদে পরিণত হতে পারে, যদি আমরা তাদের প্রশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে পারি। এজন্য এখন জরুরি ভিত্তিতে জনসংখ্যাকে প্রশিক্ষিত করে জনসম্পদে পরিণত করতে হবে। জনসংখ্যাকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জনসম্পদে পরিণত করার ক্ষেত্রে কারিগরি শিক্ষা বিস্তারের কোনো বিকল্প নেই। কারিগরিভাবে প্রশিক্ষিত জনসম্পদ কখনোই বেকার থাকতে পারে না। কিন্তু কারিগরি শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে আমাদের সীমাবদ্ধতা অমার্জনীয়। অথচ উন্নত দেশগুলোতে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা উল্লেখ করার মতো। কারিগরি শিক্ষা বিস্তার ব্যতীত কোনো দেশ টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জন করতে পারে না। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগী দেশগুলো কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে। যেমন, দক্ষিণ কোরিয়ার মোট শ্রমশক্তির ৯৬ শতাংশই কোনো না কোনো কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত। অন্যদিকে সিঙ্গাপুরের কারিগরি শিক্ষার হার হচ্ছে ৭৪ শতাংশ। চীন ও জাপানে কারিগরি শিক্ষার হার ৭৫ শতাংশ; যুক্তরাজ্যে এটা ৪৩ শতাংশ। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে কারিগরি শিক্ষার হার ৬০ শতাংশ। অন্যদিকে বাংলাদেশ ও ভারতে এ হার যথাক্রমে ১৪ ও ১৭ শতাংশ। ১৪ শতাংশ কারিগরি শিক্ষার হার নিয়ে আমরা দ্রুত এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন আশা করতে পারি না। আমরা যদি সত্যিকার অর্থে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জন করতে চাই, তাহলে কারিগরি শিক্ষা বিস্তারের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমানে যে শিক্ষাব্যবস্থা চালু আছে তা কার্যত বেকার তৈরির কারখানা মাত্র। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে দেশে শিক্ষার হার বেড়েছে ঠিকই কিন্তু মান অনেকটাই নেমে গেছে। এ ব্যাপারেও আমাদের সতর্ক হতে হবে।

n লেখক :অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক