দিল্লিতে সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩৮

আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০১:২৮

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে সহিংসতায় এখন পর্যন্ত নিহত হয়েছেন অন্তত ৩৮ জন। বিতর্কিত নতুন নাগরিকত্ব আইন নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া আন্দোলনকারীদের মধ্যে গত রবিবার থেকে সংঘর্ষ শুরু হয়। নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (সিএএ) বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে অবৈধভাবে ভারতে অনুপ্রবেশকারী অমুসলিমদের নাগরিক হওয়ার অনুমতি দেয়। হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি)  নেতৃত্বাধীন সরকার বলছে, এর ফলে ভারত ধর্মীয় নিপীড়ন থেকে পালিয়ে আসা মানুষের অভয়াশ্রমে পরিণত হবে।

আর সমালোচকরা বলছেন, এ বিলটি মুসলমানদের একঘরে করতে বিজেপির এজেন্ডার একটি অংশ। গত বছর এটি পাশ হওয়ার পরে ব্যাপক প্রতিবাদ-বিক্ষোভ শুরু হয় এবং এর মধ্যে কয়েকটি বিক্ষোভ সহিংস আকার নেয়। তবে দিল্লিতে এখন পর্যন্ত হওয়া সব বিক্ষোভই ছিল শান্তিপূর্ণ। কিন্তু উত্তর-পূর্ব দিল্লির তিনটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে রবিবার এ সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের বিরুদ্ধে যারা প্রতিবাদ করছিল তাদের অবরোধের বিরুদ্ধে এক কিলোমিটার ব্যবধানে পালটা বিক্ষোভ করে এ আইনের সমর্থকরা। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু হয়।

                এই সহিংসতা কেবল নতুন নাগরিকত্ব আইন নিয়ে হচ্ছে না। এটি এখন সাম্প্রদায়িক রূপ নিয়েছে এবং আশপাশের কয়েকটি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষজনকে তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে আক্রমণ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিভিন্ন বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের খবর পাওয়া গেছে। রাস্তাগুলোয় পাথর এবং ভাঙা কাচের টুকরো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। কমে গেছে লোক চলাচল। ভাঙা ও পোড়া যানবাহনগুলো এবড়োথেবড়ো ভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে এবং আগুন জ্বলতে থাকা ভবনগুলো থেকে বেরিয়ে আসা ধোঁয়ার কুণ্ডলী বাতাসকে ভারী করে তুলেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, দাঙ্গায় অংশ নেওয়া বেশ কয়েকজনকে হাতে বন্দুক বহন করতে দেখা যায় এবং ছাদ থেকে গুলি ছোড়া হয়েছে খবর পাওয়া গেছে। হাসপাতালের কর্মকর্তারাও নিশ্চিত করেছেন যে আহতদের অনেকের শরীরেই গুলির ক্ষত রয়েছে। সহিংসতায় আহতের সংখ্যা কয়েকশ। অনেকেরই মাথায় গুরুতর চোট। আহতদের অন্তত ৪৬ জনের শরীরে বুলেটের ক্ষত মিলেছে। সহিংসতার সময় অনেকের চোখে অ্যাসিড ঢালা হয়েছে। তাতে দৃষ্টি হারিয়েছেন চার জন।

অন্যদিকে, দিল্লির শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গতকাল ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের সঙ্গে দেখা করেন সোনিয়া গান্ধী ও মনমোহন সিংসহ কংগ্রেস নেতারা। পরে সোনিয়া গান্ধী বলেন, ‘আমরা রাষ্ট্রপতিকে স্মারকলিপি দিয়েছি। কেন্দ্র ও দিল্লি সরকার নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। রাষ্ট্রপতি আমাদের দাবি গুরুত্বসহকারে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন।’ মনমোহন সিং বলেন, ‘এ ঘটনা আমাদের জন্য জাতীয় লজ্জা।’

‘সহিংসতার টার্গেট হচ্ছে মুসলিমরাই’

ভারত সফরে থাকাকালীন দিল্লির পরিস্থিতি নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তিনি দেশে ফিরে যেতেই গোটা ঘটনায় ভারত সরকারের ভূমিকা নিয়ে সরব হলো আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক মার্কিন কমিশন (ইউএসসিআইআরএফ)। তাদের অভিযোগ, বেছে বেছে মুসলিমদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে। অথচ সব দেখেশুনেও নীরব আছে মোদীর সরকার। তারা বলেছে, নৃশংস ও লাগামছাড়া সহিংসতা রুখে সাধারণ মানুষকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ তারা।

তবে মার্কিন ঐ সংগঠনের অভিযোগ খারিজ করে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য’ থেকে বিরত থাকতে পরামর্শ দিয়েছে ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তর। দপ্তরের মুখপাত্র রবীশ কুমার টুইটারে বলেন, ‘ইউএসসিআইআরএফের অভিযোগ একেবারেই সঠিক নয়। মনে হচ্ছে, বিষয়টির রাজনীতিকরণই ওদের উদ্দেশ্য। সহিংসতা রুখে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা আমাদের সংস্থাগুলো। ’

বুধবার ইউএসসিআইআরএফের ওয়েবসাইটে ভারতের ঘটনা নিয়ে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, ‘প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সফর শেষ হতেই প্রাণঘাতী দাঙ্গায় তেতে উঠেছে উত্তর-পূর্ব দিল্লি। মুসলিমদের নিশানা করে উন্মত্ত জনতা হামলা চালাচ্ছে বলে জানতে পেরেছি আমরা। তাতে এখন পর্যন্ত অনেক মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। আহত হয়েছে প্রায় ২০০ জন। বেশ কিছু মসজিদ জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, ভাঙচুর হয়েছে বলেও জানতে পেরেছি আমরা। এমন পরিস্থিতিতে এলাকা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে বহু মুসলিম। গত বছরে ডিসেম্বর থেকে দেশ জুড়ে সিএএবিরোধী আন্দোলন চলাকালীনই এই অশান্তি দানা বেঁধেছে।’

ইউএসসিআইআরএফ-এর কমিশনার অনুরিমা ভার্গব বলেন, ‘‘দিল্লি জুড়ে যে নৃশংস এবং লাগামছাড়া সহিংসতা চলেছে, তা চলতে দেওয়া যায় না। সমস্ত নাগরিককে নিরাপত্তা দিতে অবিলম্বে পদক্ষেপ করা উচিত ভারত সরকারের। অথচ তার বদলে খবর আসছে, মুসলিমদের উপর হামলা রুখতে কোনো ভূমিকাই নেয়নি দিল্লি পুলিশ। নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার।’

ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকা জানায়, ইউএসসিআইআরএফ-এর চেয়ারপারসন টোনি পারকিন্স বলেছেন, ‘দিল্লিতে যে সহিংসতা চলছে, যেভাবে মুসলিমদের ওপর হামলা এবং তাদের বাড়ি, দোকান এবং ধর্মীয় স্থান জ্বালিয়ে দেওয়ার খবর আসছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগের। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিককে নিরাপত্তা দেওয়াই দায়িত্বশীল সরকারের অন্যতম প্রধান কর্তব্য। তাই মুসলিমদের এবং যারা যারা হামলার শিকার হয়েছেন তাদের সকলের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে ভারত সরকারকে পদক্ষেপ করতে আর্জি জানাচ্ছি আমরা।’

সরকারের সমালোচক বিচারপতিকে বদলি

দিল্লি হাইকোর্টের বিচারপতি এস মুরলিধরকে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টে বদলি করা হয়েছে। দিল্লিতে কয়েক দিন ধরে চলা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনায় বুধবার কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের পাশাপাশি দিল্লি পুলিশের কড়া সমালোচনা করেছিলেন বিচারপতি এস মুরলিধর। এদিন এক শুনানিতে বিচারপতি মুরলিধর বলেন, ‘আমরা ১৯৮৪ সালের মতো আরেকটি ঘটনা দেশে ঘটতে দিতে পারি না।’ এরপর দিল্লির সহিংসতা থামাতে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারকে একত্রে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন এই বিচারপতি।

দিল্লি পুলিশের ভূমিকায় তার আদালত বিস্ময় প্রকাশ করেন। বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দেওয়ায় বিজেপির চার নেতার বিরুদ্ধে দিল্লি পুলিশ কেন নিজে থেকে মামলা করছে না, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি। বিজেপির চার নেতার বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের না করার পরিণতি দিল্লির পুলিশপ্রধানকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে বলেন এই বিচারপতি। এদিন মধ্যরাতে কেন্দ্রীয় সরকার তাকে বদলির প্রজ্ঞাপন জারি করে।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি তার সাংবিধানিক ক্ষমতাবলে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আলোচনার পর এস মুরলিধরকে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে বদলি করেছেন।