ইস্কাটনে ছয়তলা ভবনে আগুন, শিশুসহ নিহত ৩

আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২২:৩৭

রাজধানীর মগবাজারের দিলু রোডের একটি ছয়তলা বাড়িতে গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। আগুন ও ধোঁয়ায় শিশুসহ তিন জন মারা গেছেন। আরো ছয় জন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এদের মধ্যে শিশুটির বাবা ও মা অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন। তাদের অবস্থা সংকটাপন্ন বলে চিকিত্সকরা জানিয়েছেন। ঐ ভবনের গ্যারেজে থাকা পাঁচটি প্রাইভেটকার ও দুটি মোটরসাইকেল পুড়ে গেছে।

নিহতরা হলেন এ কে এম রুশদি (৪), এইচএসসি পরীক্ষার্থী আফরিন জাহান যুঁথী (১৭) ও আব্দুল কাদের লিটন (৪০)। একই ঘটনায় দগ্ধ হয়ে রুশদির বাবা শহিদুল কিরমানি রনি ও মা জান্নাতুল ফেরদৌস জান্নাত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিত্সাধীন। জান্নাতের শরীরের ৯৫ শতাংশ ও রনির ৪৫ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। তাদের অবস্থা সংকটাপন্ন। একই অগ্নিকাণ্ডে ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়েছে ঐ বাড়ির আরো চার জন বাসিন্দা। তারা হলেন— কাঁচামাল ব্যবসায়ী মনির হোসেন (৪০), তার স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার (৩০), ছেলে মাহমুদুল হাসান (৯ মাস) ও মাহাদি হাসান রিফাত (৯)। 

মনির হোসেন পরিবার নিয়ে পাঁচতলায় থাকেন। বাড়িটির তৃতীয় তলায় রনি-জান্নাত দম্পতি            ভাড়া থাকেন। আফরিন জাহান যুঁথী পাঁচতলায় বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকতেন এবং আব্দুল কাদের লিটন থাকতেন ভবনের নিচতলায় একটি কক্ষে। তিনি ঐ ভবনের দ্বিতীয় তলার ক্লাসিক ফ্যাশন ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি বায়িং হাউজের অফিস সহকারী ছিলেন। গতকাল সন্ধ্যায় ময়নাতদন্ত শেষে নিহত তিন জনের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ভোর ৪টার দিকে দিলু রোডের ৪৫/এ নম্বর ছয়তলা বাড়ির নিচতলার গ্যারেজ থেকে প্রথমে আগুন লাগে। পরে আগুন ছড়িয়ে পড়ে ওপরতলায়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এর আগেই আগুনে পুড়ে শিশুসহ তিন জনের মৃত্যু হয়। দগ্ধ জান্নাত ও তার স্বামী রনিসহ ছয় জনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাদের মধ্যে জান্নাত ও রনির অবস্থা আশঙ্কাজনক। আগুনের কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস। তবে প্রত্যক্ষদর্শী বাড়িটির দারোয়ান লুত্ফর রহমান জানিয়েছেন, বৈদ্যুতিক সুইচ বোর্ড থেকে তিনি আগুন লাগতে দেখেছেন।

তিনি বলেন, বাড়িটির নিচতলার একটি কক্ষে ১৪ বছর বয়সি নাতি সিফাতকে নিয়ে বুধবার রাতে ঘুমিয়েছিলেন তিনি। ভোর ৪টার দিকে হঠাত্ শব্দ শোনেন। শব্দে শুনে ঘুম ভাঙে তার। তিনি দ্রুত বাইরে বের হয়ে দেখেন, বৈদ্যুতিক সুইচ বোর্ডে এবং তার পাশে রাখা একটি কাঠের খাটে আগুন জ্বলছে দাউ দাউ করে। তিনি ঘর থেকে নাতি সিফাতকে ডেকে নিয়ে বাইরে বের হয়ে চিত্কার শুরু করেন। ভবনটির বাসিন্দারাসহ আশপাশের লোকজন জেগে ওঠেন তার চিত্কারে। এরই মধ্যে গ্যারেজে পার্কিং করে রাখা পাঁচটি প্রাইভেটকার ও দুইটি মোটরসাইকেলে আগুন ধরে যায়। তিনি চিত্কার করে ওপরতলার লোকজনকে নিচে নেমে আসতে নিষেধ করে ছয়তলায় উঠতে বলেন। এরই মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট পর্যায়ক্রমে সেখানে পৌঁছে। গলির মুখে গেট থাকায় পানিবাহী গাড়ি বাড়ির কাছে পৌঁছাতে পারেনি। দূরে রাস্তায় থামিয়ে পানির পাইপ টেনে নিয়ে আগুন নেভানো হয়।  

ফায়ার সার্ভিসের এক জন কর্মকর্তা জানান, যারা ছয়তলায় উঠে পড়েছিল তাদের তেমন ক্ষতি হয়নি। ধোঁয়ায় সমস্যা হয়েছে তাদের। জান্নাত, তার স্বামী রনি ও ছেলে রুশদি এবং কলেজছাত্রী  আফরিন জাহান যুঁথী নিচে নামার চেষ্টা করেছিলেন। এ কারণে তারা আগুনের মধ্যে পড়ে যায়। যুঁথী, রুশদি ও আব্দুল কাদের পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। কাদের নিচতলার ঘরে থাকায় তিনি বের হতে পারেননি। ঘটনাস্থল থেকে তাদের মৃতদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়। জান্নাত ও তার স্বামী রনিকে দগ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করে বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়।

ছয়তলা থেকে মনির হোসেন, তার স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার, ছেলে মাহমুদুল হাসান ও মাহাদি হাসান রিফাতকে উদ্ধার করা হয়। ধোঁয়ায় অসুস্থ হওয়ায় তাদেরও বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে।

রনির স্বজনরা জানান, রনির গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার ইটনা গ্রামে। তিনি ভিআইভিপি এসেড ম্যানেজমেন্ট নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ফিন্যান্স ম্যানেজার ও পাশাপাশি আইসিএমএ এর লেকচারার ছিলেন। তার স্ত্রী জান্নাত বেক্সিমকো গ্রুপের একাউন্ট অফিসার। তাদের একমাত্র ছেলে রুশদি। রুশদি দিলু রোডের একটি স্কুলে পড়ত।