তানভীর তারেক
৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ছাত্র আন্দোলন, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী আন্দোলন, আদিবাসীদের অধিকার রক্ষার আন্দোলন থেকে শুরু করে যেকোনো সঙ্কটে সবচেয়ে সামনের মানুষ হিসেবে থেকেছেন যে বরেণ্য নাট্যজন তার নাম মামুনুর রশীদ। একের পর এক সামাজিক বোধ জাগানিয়া নাটক লিখেছেন। মঞ্চায়ন করেছেন। অভিনয় করেছেন।
১৯৬৭ সালে তিনি তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের টেলিভিশনের জন্য নাটক লিখতে শুরু করেন, যার বিষয় বস্তু ছিল মূলত পারিবারিক। নাটকের প্রতি নিবিড় ভালোবাসা টাঙ্গাইলে তার নিজ গ্রামে যাত্রা ও লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয়ের সূত্র ধরে।
মামুনুর রশীদ নিজেই বলেন, যাত্রার ফর্ম তার নাট্যভাবনাকে খুবই প্রভাবিত করেছিল।
১৯৭১ সালে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন এবং জড়িত হন স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে। মামুনুর রশীদ বলেন, ‘আমার নাট্যভাবনা বা প্রথম শিক্ষার পাঠ হয় তখনই, কলকাতার অসাধারণ নাট্যচর্চা দেখে যখন বোধটা জাগাতে শুরু করি। তারই অনুপ্রেরণায় মূলত ১৯৭২ সালে গড়ে তুলি আরণ্যক।’ তিনি লিখেছেন ওরা কদম আলী, ইবলিশ, রাষ্ট্র বনাম, এখানে নোঙর, রাঢ়াঙ, চে’র সাইকেল-এর মতো অসংখ্য কালজয়ী নাটক।
স্বাধীনতা উত্তর আমাদের দেশের মঞ্চনাটকের পথিকৃত মামুনুর রশীদ। বয়সের বাড়ি ৭২ হলেও আজ তার ১৮তম জন্মদিন। এই বিরল দিনের কিংবদন্তীকে নিয়ে ৬ দিনব্যাপী জন্মোত্সব আয়োজন করছে ‘দ্রোহ দাহ স্বপ্নের নাট্য আয়োজন’। দেশের বরেণ্য এই নাট্যজন জীবনের পুরোটা সময় দিয়েছেন নাট্যচর্চা আর লেখালেখিকে। তাই
নিজের জীবনের এই ১৮তম জন্ম দিবসে এসে অনুভব ব্যক্ত করতেই প্রতিবেদককে বলেন, ‘খানিক বিব্রত হই, তবে ভালোই লাগে। জীবনে তো আমি কখনোই কোনোকিছুতে আড়ম্বর চাইনি। নিজের জন্মদিনে তো আরো না। তাই ঈশ্বরের কী কৃপা দেখো, আমার জন্মদিন আসে ৪ বছর পরপর। তবে এই ৪ বছরে জমে থাকা ভালোবাসার একসঙ্গে উদগীরণ হয়। তাই জীবনটাকে বড্ড ভালোবাসতে ইচ্ছে করে।’
মাত্র কিছুদিন আগেই হঠাত্ করে অসুস্থতায় হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল তার ১০ দিন। কিন্তু হাসপাতাল থেকে ফিরেই সেই শরীর নিয়েই নতুন নাটক মঞ্চায়নের কথা ভাবলেন। লিখে ফেললেন ‘কহে ফেসবুক’ নামের আরেকটি নাটক। বিশ্রাম শব্দটিকে জীবনের অভিধান থেকে ফেলে দিয়েছেন।
জীবনের প্রাপ্তি কী থাকে এত এত সাফল্যেও পর! প্রাপ্তি বলতে কী অনুভব হয় আপনার?
—একটা মানুষের পুরোটাই প্রাপ্তি। এই যে জীবনটাকে বয়ে নিয়ে যাওয়া। সেই প্রাপ্তিতে হয়তো সার্থকতা কারো কম থাকে, কারো বেশি। আমাকে আজও যেমন এই বয়সেও কত কাছের মানুষ মনে রাখছে। ভালোবাসার আয়োজন করেছে। এটাই তো জীবনের সুখ।
আপনার এ বয়সেও নতুন নাটক মঞ্চায়নের ভাবনা তাড়ায়। নিজের এই সফল একটি জীবনের পর আরো কী কী করতে ইচ্ছে করে?
—অনেককিছুই তো করতে ইচ্ছে করে। সেই অর্থে কী সফল আমি বা আমরা? আমি তো আমার নাটকে শোষিত সমাজের কথা বলেছি চিরকাল। শোষণ পুরোটা বন্ধ হয়েছে? নিপীড়িতদের কথা বলেছি। বন্ধ হয়েছে? অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলেছি। কই সেগুলো কী দূর হয়েছে এই দেশ থেকে? তবু একটা জীবন আমি আমার নাটকের ভেতর দিয়ে একটা বোধ জাগানোর চেষ্টা করে গিয়েছি।
আপনার হাত ধরে অনেকেই আজ এই শোবিজে প্রতিষ্ঠিত। যাকে আমরা বলি ‘তারকা’। এই তারকা হওয়ার ক্ষুধা তো অনেকের ভেতরেই এখন প্রচণ্ড। যা আপনারা কখনো হতে চাননি বা শেখাননি। অথচ এই ক্ষুধাটা প্রকটভাবে ছড়িয়েছে অধিকাংশের ভেতরে...
—এটা বিক্ষিপ্ত সময়ের এক চালচিত্র। এই অস্থিরতা থেকে তরুণদের কাটিয়ে উঠতে বলবো আমি। নয়তো তারা হারিয়ে যাবে। এটা শুধু শোবিজ অঙ্গনেই না, গোটা সমাজেই বিরাজমান। এ কারণে আত্মহত্যার প্রবণতাও বেড়েছে। কারণ সবাই নিজের ফোকাস চাই। নির্লিপ্তভাবে কেউ কাউকে ভালোবাসে না। না কাজ, না মানুষ। কাজের প্রতি গোপন প্রেমটা কমে গেছে। যা কিছু এখন সব আমাদের দেখাতে হবে। আমি এই করেছি, ঐ করেছি।
এসব তাড়না থেকেই কী ‘কহে ফেসবুক’ নাটকটি লিখলেন?
—সেরকমই বলতে পারো। এখানেও একটা মেসেজ দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আসলে বোধের জাগরণ হয় অভ্যেসে। সামাজিক অভ্যেসটা তৈরি করে পরিবার, সমাজ। সমাজ উন্নত হয় পারিপার্শ্বিক আবহাওয়ায়। তাই আমাদের এই সময়ে নির্মোহ মানুষের বড় প্রয়োজন। যে বিনিময়ের অপেক্ষা করে না। নিজের ভালোলাগার জন্য শিল্পকে ভালোবাসবে। এই ব্রত নেওয়া খুব কঠিন। সবাই পারে না। তবে কেউ কেউ পারে। এই পেরে উঠতে পারলেই সে মহান হয়ে ওঠে।
৬ দিনব্যাপী জন্মোত্সবের আজ থেকে যা যা আয়োজন
আজ সকাল সাড়ে ১০টায় স্টুডিও থিয়েটারে বাংলাদেশ অভিনয়শিল্পী সংঘের সম্মিলনী ও শুভেচ্ছা নিবেদন। বিকেল সাড়ে ৪টায় সেমিনার হলে থাকছে ‘মামুনুর রশীদের নাট্যভাবনা এবং আমাদের নাট্যচর্চা’ শীর্ষক আলোচনা। মুখ্য আলোচক থাকবেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। আলোচক হিসেবে থাকবেন বিশ্বজিত্ ঘোষ ও মলয় ভৌমিক। সঞ্চালক আজাদ আবুল কালাম। সন্ধ্যা ৬টায় জাতীয় নাট্যশালায় মামুনুর রশীদকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জ্ঞাপন। ‘অভিনন্দন জীবন ও শিল্পের মামুনুর রশীদ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় শুভেচ্ছা বক্তব্য দেবেন রামেন্দু মজুমদার, নাসির উদ্দীন ইউসুফ ও লিয়াকত আলী লাকী।
সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় নাট্যশালায় মামুনুর রশীদের রচনা ও নির্দেশনায় আরণ্যক নাট্যদলের নতুন প্রযোজনা ‘ফেসবুক’-এর উদ্বোধনী প্রদর্শনী হবে।
এছাড়া ১ মার্চ এ নাটকের দ্বিতীয় প্রদর্শনী হবে। ২ মার্চ জাতীয় নাট্যশালায় মঞ্চায়িত হবে মামুনুর রশীদের রচনা ও ফয়েজ জহিরের নির্দেশনায় বাঙলা থিয়েটারের প্রযোজনা চে’র সাইকেল। ৩ মার্চ জাতীয় নাট্যশালায় মামুনুর রশীদের রচনা ও নির্দেশনায় সংক্রান্তি নাটকের প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে উত্সবের সমাপনী হবে।
