সাবরিনা ইফ্ফাত আনিকা ও জুহায়ের মাহিন
কারিগরি শিক্ষার বিকাশ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি নতুন মোড় সংযোজন করেছে। সাধারণ শিক্ষার ভিড়ে কারিগরি শিক্ষা আগে সাধারণ মানুষের কাছে এত গ্রহণযোগ্যতা না থাকলেও বর্তমানে কর্মসংস্থানের বিভিন্ন সুযোগ ও সরকার কর্তৃৃক গৃহীত ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচি ঘোষণার কারণে কারিগরি শিক্ষার গ্রহণযোগ্যতা অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সমাদৃত হয়েছে। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক প্রণীত বার্ষিক প্রতিবেদন ২০১৮-২০১৯ অনুযায়ী বাংলাদেশে ২০১২ সালে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ৫০২টি (যার মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠান ছিলো ৩৩৮টি) যা জানুয়ারি ২০১৯ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৪৫২টিতে (যার মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠান ৬৯৩টি)। একই প্রতিবেদন থেকে আরো জানা যায়, ২০১২-২০১৩ সেশন থেকে ২০১৮-২০১৯ সেশন—এই সাত বছরে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৫৭.২৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে যার অন্যতম কারণ হতে পারে কারিগরি শিক্ষার পর কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি।
আমাদের দেশের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যা নারী। তাই এই নারীদেরকে কীভাবে কারিগরি শিক্ষায় সম্পৃক্ত করা যায় সেদিক লক্ষ্য রেখে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তার প্রেক্ষিতে এই নারীরাও সমাজ ও দেশের অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক প্রণীত বার্ষিক প্রতিবেদন ২০১৮-২০১৯ অনুযায়ী ২০১২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত কারিগরি শিক্ষায় ছাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধির হার প্রায় ৭৭.৫৩ শতাংশ।
শিল্পায়ন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কারণে কর্মক্ষেত্রে অনেক কারিগরি পেশাগত কর্মীর চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। অতীতে বাংলাদেশ থেকে অনেক শ্রমিক বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য পাড়ি দিতেন, তাদের মধ্যে কারিগরি জ্ঞানের অভাবে তারা নানা জায়গায় ভালো চাকরির সুযোগ পেতেন না। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এবং কারিগরি খাতে মানুষের আগ্রহ বৃদ্ধির কারণে অনেক দক্ষ শ্রমিক গড়ে উঠেছে তা দেশে-বিদেশে শিল্প-কারখানায় কারিগরি ও দক্ষ জনশক্তির চাহিদা পূরণ করতে পারবে। কারিগরি শিক্ষা বোর্ড প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী সনদপ্রাপ্ত স্নাতকদের মধ্যে প্রায় ৯৪.৪ শতাংশ স্নাতক বিভিন্ন কর্মে নিয়োজিত আছে যার মধ্যে প্রায় ৭৭.১ শতাংশ চাকরিরত ও ১৭.৩ শতাংশ আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত। যার মধ্যে অনেকে বিদেশেও কর্মরত রয়েছে। উক্ত প্রতিবেদন থেকে আরো জানা যায়, বিভিন্ন কর্মে নিয়োজিত স্নাতক ডিগ্রিধারীরা ৯৫.৯ শতাংশ সন্তুষ্ট এবং কর্মক্ষেত্রে তাদের গ্রহণযোগ্যতা ৯২.৯ শতাংশ।
কোনো দেশের অর্থনীতির উন্নয়নের জন্য সে দেশের প্রত্যেকটি মানুষকে মানবসম্পদে রূপান্তর করতে হলে কারিগরি শিক্ষা বড়ো ভূমিকা রাখতে পারে। কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে বাংলাদেশ সর্বক্ষেত্রে দক্ষ কর্মী নিয়োগের পাশাপাশি বিদেশেও এইসব কারিগরি শিক্ষিত কর্মী পাঠানো যাবে যার মাধ্যমে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব হবে। আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে অন্যদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে বিদেশে কর্মরতরা রেমিট্যান্সের মাধ্যমে দেশের প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত বাংলাদেশে আসা রেমিট্যান্সের তুলনায় বর্তমান অর্থবছরের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত রেমিট্যান্সের পরিমাণ ২১.৫১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে (উত্স : বাংলাদেশ ব্যাংক) যার মধ্যে কারিগরি স্নাতক ডিগ্রিধারীদের অবদান উল্লেখযোগ্য বলা যায়।
যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে যেতে হলে কারিগরি শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। কারিগরি শিক্ষার মূল লক্ষ্য থাকবে দেশের বিপুল অদক্ষ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা, যাতে বাংলাদেশ অর্থনীতিতে নতুন আলো খুঁজে পায়। কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে বাংলাদেশ দক্ষ শ্রমিক তৈরি করতে পারলে দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে সাহায্য করবে।
