মীর আব্দুল আলীম
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন :‘মশা যেন ভোট না খেয়ে ফেলে’। এজন্য রাজধানীর নয়া দুই মেয়রকে শপথবাক্য পাঠ করানোর সময় তিনি বর্ষার আগেই এডিস নির্মূলের নির্দেশ দেন। মশার ভোট খাওয়ার ইতিহাস বড়ো পুরোনো। রাজধানী ঢাকার রাজনীতিতে মশা সবসময়ই একটি বড়ো ইস্যু। ঢাকার অন্তত কয়েক জন মেয়রের জন্য বিড়ম্বনা ডেকে এনেছিল এই ক্ষুদ্র অথচ ভয়ংকর কীট। মশা খুদে কীট, কিন্তু বিড়ম্বনা অনেক। বিপদ না চাইলে আগে থেকেই দুই ডিসিসির মেয়রসহ সিটি করপোরেশনের কর্তাব্যক্তিদের কুম্ভকর্ণের ঘুম থেকে জাগতে হবে। এজন্য প্রধানমন্ত্রী আগেভাগেই মেয়রদ্বয়কে সজাগ থাকতে বলেছেন। নিজেদের সুনামের স্বার্থেই মশা নামের ভয়ংকর শত্রুকে এখনই ঠেকাতে হবে। তা না হলে মশারা কিন্তু ভোট খেয়ে সাবাড় করবে। মানুষ এখন মশার কাছে জিম্মি।
মশা অতি ক্ষুদ্র এক কীট হলেও ক্ষমতার গদি নড়বড়ে করতে এর জুড়ি নেই। মশা নিধনে ব্যর্থ হয়ে অনেকে পড়েছেন বিপাকে। এর সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক থাকার কথা নয়। তারপরও ঢাকার রাজনীতিতে মশা বরাবরই একটি বড়ো ইস্যু।
প্রশ্ন্ন হলো, মশা নির্মূলে কি করছে দুই সিটি করপোরেশন? ডিসিসি উত্তর ও দক্ষিণে মশা নিধনের জন্য এক হাজারের ওপর মশক শ্রমিক কর্মরত আছে। নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে পাঁচ-ছয় জন কর্মী আছে বলে পত্রিকায় জেনেছি। যাদের কাজ শুধু মশার ওষুধ ছিটানো। প্রতি বছর মশা নির্মূলে প্রায় ৫০ কোটি টাকা বছরে বরাদ্দ পায় দুই সিটি করপোরেশন। এত কিছুর পরও রাজধানীতে দিন দিন মশার প কোপ বাড়ছে কেন? এই বিপুল জনবল আর বিপুল পরিমাণ অর্থের সঠিক ব্যবহার হলে তো নগরীতে এভাবে মশা থাকার কথা না?
সমস্যা আছে অনেক। জেনেছি, লোকবল আছে, ওষুধ আছে তবে সে ওষুধ ঠিকঠাকমতো ছিটায় কি না তার মনিটরিং নেই। এত লোক সারা বছর কাজ করলে, এত অর্থ ব্যয় করলে তো নগরীতে মশা জন্মানোর কথা না। মূল কথা হলো যেখানে মশারা জন্ম নেয়, সেখানে ওষুধ পড়েই না। কর্মীরা নাকে তেল দিয়ে ঘুমালে মশা তো বাড়বেই। পত্রিকায় মশা বাড়ার খবর ছাপা হলে কিছুটা দৌড়ঝাঁপ দেখা যায়। এভাবে নগরীর মশা নিধন হবে না। মশা নিধন করা না গেলে, এই মশার মাধ্যমে মারাত্মক রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি রয়েছে। এডিস মশাসহ অন্যদের প্রজনন নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে তা ভয়াবহ যন্ত্রণার কারণ হবে বৈকি!। সুতরাং মশা নিধনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে ন্যূনতম গাফিলতি চলবে না। আমরা এও মনে করি, সিটি করপোরেশনদ্বয়ের পক্ষে এ কাজ করা খুব সহজসাধ্য হবে না যদি না নগরবাসীর কাছ থেকে যথাযথ সহায়তা আসে। নগরবাসীর উচিত, নগর বসবাসযোগ্য, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত রাখার ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা রাখা। কর্তৃপক্ষীয় উদ্যোগ ও ব্যবস্থার পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধই পারে এই নগরকে মশামুক্ত রাখতে।
লক্ষ্য করা গেছে সুনির্দিষ্ট কিছু অভিজাত এলাকা ছাড়া অন্য কোথাও এর বাস্তবায়ন কম। যা অত্যন্ত দুঃখজনক। কারণ প্রায় দেড় কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত মহানগরীতে নাগরিকদের সব সুযোগ-সুবিধার প্রাপ্তি একই মানদণ্ডে বিচার্য হলেও অন্তত সার্বিক বিচারে কিছু কিছু বিষয়ে সব নাগরিকের প্রাপ্তিতে সমতা থাকা উচিত। কারণ দিনভর পরিশ্রম করে একটি নির্বিঘ্ন ও সুখকর রাত সবাই প্রত্যাশা করে। আমাদের মনে রাখা উচিত, বিশাল বিশাল অট্টালিকার বাইরেও এ মহানগরীতে প্রায় ৪০ লাখ লোক বস্তিতে বসবাস করে। সামর্থ্যহীন এ লোকগুলোর জীবন-জীবিকার দায়ভার বহন করাই যখন কষ্টসাধ্য, সেক্ষেত্রে মশার উপদ্রব থেকে নিজেকে রক্ষার বিকল্প তাদের আর কীই বা থাকতে পারে।
প্রজনন ও উত্সস্থলেই মশার বংশ ধ্বংস করতে হবে। আবর্জনা দ্রুত অপসারণ করতে হবে। আবর্জনা ফেলার জায়গাগুলো সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে এবং নিয়মিত ওষুধ ছিটানোর ব্যবস্থা করতে হবে যাতে ঐসব জায়গায় মশার জন্ম হতে না পারে। খোলা নর্দমাগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে হবে, একইভাবে জলাশয়গুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে, নিয়মিত ওষুধ ছিটিয়ে মশার লার্ভা মুক্ত করতে হবে। উেস মশা দমন ও নিধন না করে উড়ন্ত মশা দমন ও নিধন কার্যক্রম চালিয়ে ঢাকাকে মশামুক্ত করা যাবে না। সিটি করপোরেশনদ্বয়কে এই সত্য উপলব্ধি করে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। ওয়ার্ড কমিশনারদের আরো দায়িত্বশীল ও সক্রিয় হতে হবে।
ঘরে-বাইরে সব জায়গায় মশার অত্যাচার। চায়ের দোকানে বসলেই মশা কামড়াতে শুরু করে। এলাকার নর্দমাগুলোতে আবর্জনা জমে থাকে। ডিসিসি আবর্জনা নিয়মিত পরিষ্কার করে না। এলাকাবাসীও নিজের বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার রাখে না। তাই মশারা রাতেও কামড়ায়, দিনেও কামড়ায়। আগে দিনেরবেলা এরা আন্ডারগ্রাউন্ডে অর্থাত্ ম্যানহোলে আত্মগোপন করে থাকত। রাতে বেরিয়ে আসত। এখন দিনরাত সবসময়ই এদের সমান আনাগোনা। রাতে বরং এদের আনাগোনা থেকে বাঁচার জন্য মশারির ভিতর আশ্রয় নেওয়া যায় কিন্তু দিনেরবেলায় মানুষের দিবানিদ্রার অরক্ষিত অবস্থার সুযোগ নিয়ে দিব্যি হুল ফুটিয়ে দেয় মশা। অবাধে চুষে নেয় তাজা রক্ত। এরা কানের কাছে ভোঁ-ভোঁ শব্দ করে মানুষের ঘুমের বারোটা বাজায়।
সিটি করপোরেশনের কর্তাব্যক্তিদের কুম্ভকর্ণের ঘুম থেকে জাগতে হবে। নিজেদের সুনামের স্বার্থেই মশা নামের ভয়ংকর শত্রুকে ঠেকাতে হবে। মশা মারা নিয়ে মশকরা অনেক হয়েছে। মানুষ এখন মশার কাছে জিম্মি। দোহাই মেয়র আপনারা মশা ঠেকান! তা না হলে এ মশা আপনাদের সুনামেই হুল ফুটাবে।
লেখক :গবেষক
