অনল চৌধুরী
১৮ এবং ১৯ শতকে আমেরিকার অনেক রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা বলে কিছু ছিল না। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাযুদ্ধের পর অস্ত্রধারী অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। হত্যা, নারী নির্যাতন, ব্যাংক, বাসস্থান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ট্রেনে ডাকাতি ছিল প্রতিদিনের ঘটনা। সেইসময় আমেরিকার পশ্চিম অঞ্চলকে বলা হতো বুনো পশ্চিম (Wild West)।
১৭৮৯ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি জর্জ ওয়াশিংটন জুডিশিয়ারি বিল স্বাক্ষর করে মার্শাল পদ সৃষ্টি করেন এবং তাদের ওপর আইন-বহির্ভূতদের (Out law) নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এইসব মার্শাল তাঁদের কয়েকজন সহকারীকে সঙ্গে নিয়ে অপরাধীদের সরাসরি বন্দুকযুদ্ধে বা গ্রেফতার করে আইনের মাধ্যমে শাস্তি দিয়ে সেখানকার আইনশঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটান। তারই ফলে আমেরিকার উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হয়।
বাংলাদেশে দুর্নীতি-সন্ত্রাস-মাদক-নারী ও শিশু নির্যাতনসহ সব ধরনের অপরাধ যে ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে, সত্, নীতিবান এবং দেশপ্রেমিকদের প্রচেষ্টা এবং সরাসরি অংশগ্রহণ ছাড়া এই অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব।
সম্প্রতি পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, অপরাধ জগতের গডফাদারদের ধরতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সমন্বিত ২২ জেলায় ২২ জন গোয়েন্দা নিয়োগ দেওয়া হবে বলে কমিশনের ২২তম সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব গোয়েন্দা কর্মকর্তা প্রতিটি জেলায় যারা মাদক ব্যবসা, সন্ত্রাস, খাস জমি দখল, ঘুষ-দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অপরাধ জগতের গডফাদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, তাদের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের তথ্য সংগ্রহ করে কমিশনের প্রধান কার্যালয়ে রিপোর্ট করবেন।
কিন্তু শুধু ২২ জেলায় নয়, গ্রাম এলাকায় প্রতিটা ইউনিয়ন পরিষদে এবং শহরগুলোতে, প্রত্যেক থানা এলাকায় এভাবে দুদকের এক বা একাধিক স্বেচ্ছাসেবক প্রতিনিধি নিয়োগ দিতে হবে—যারা দুর্নীতি সন্ত্রাস, মাদকসহ সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে দুদকসহ বিভিন্ন সংস্থায় প্রতিবেদন দিতে পারবে এবং জনগণের পক্ষ থেকে তারা কোনো অন্যায়-অত্যাচারের স্বীকার হলে থানা এবং আদালতে তাদের পক্ষে মামলা করতে পারবে। তবে এইসব প্রতিনিধিকে অবশ্যই শিক্ষিত, স্বাধীনতার আগে থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে বাড়ি, জমি ও ধন-সমপদের মালিক, কোনোরকম অপরাধে সংশিষ্টতা বিহীন এবং নেশামুক্ত হতে হবে। শহর এলাকায় তাদের অবশ্যই মাস্টার্স (আইন বিষয়ের ওপর ডিগ্রি থাকলে অগ্রাধিকার) এবং গ্রামের ক্ষেত্রে স্নাতক পাস হতে হবে। প্রতিনিধি নিয়োগের জন্য কোনো বয়সসীমা থাকবে না। তাদের নিয়মিত কোনো বেতনভাতা দেওয়া হবে না। তবে তাদের তদন্ত বা তথ্যের ফলে দুর্নীতির মাধ্যমে লুণ্ঠিত অর্থ-সমপদ উদ্ধার বা পুরস্কারঘোষিত অপরাধী গ্রেফতার হলে সেখান থেকে তাদের অর্থ দেওয়া যেতে পারে। এক কথায় পেশা হিসেবে না—‘ঘরের খেয়ে দেশের সেবা করতে চান’—এমন ব্যক্তিকেই দুদকের স্বেচ্ছাসেবী প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে। দেশের সব এলাকাতেই এরকম কিছু মানুষ আছেন। তবে তারা যদি ক্ষমতার অপব্যবহার করে, তাহলে প্রচলিত আইনে তাদের বিচার করতে হবে। কারণ দুর্নীতি ও অপরাধ দমনে নিয়োজিত ব্যক্তিই যদি দুর্নীতিবাজদের ভয় দেখিয়ে টাকা নিয়ে অবাধে এসব অপকর্ম করতে দেয় তাহলে এই কার্যক্রমে কোনো সফলতা আসবে না। তাই সবার আগে এই প্রতিনিধিদের নৈতিকতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে।
ফৌজদারি কার্যবিধির ২২ ধারাতে মফস্সল এলাকায় উপযুক্ত বাংলাদেশি নাগরিকদের মধ্যে থেকে ‘জাস্টিস অফ পিস’ নিয়োগ দেওয়ার কথা বলা আছে। এর আওতা রাজধানীতেও বিস্তৃত করা যায়। এভাবে দেশের প্রত্যেক এলাকায় সত্-নীতিবান ও দেশপ্রেমিকদের যদি দেশের উন্নয়ন ও অপরাধ দমনে নিয়োজিত করা যায়, শুধু তাহলেই বাংলাদেশ দুর্নীতি-সন্ত্রাস ও মাদকসহ সব অপরাধমুক্ত হতে পারবে।
ঢাকা
