ভয়াবহ দূষণ থেকে মুক্তি মিলছে না শীতলক্ষ্যার। দূষণে দূষণে নদীর পানি পুরোপুরি ব্যবহার অনুপোযোগী হয়ে পড়েছে। সায়েদাবাদ এবং গোদনাইল পানি শোধনাগারের (ওয়াটার টিট্রমেন্ট) মাধ্যমে শীতলক্ষ্যা নদীর পানি শোধন করার পরও তা থেকে বেরিয়ে আসে উত্কট গন্ধ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদীর তীরে গড়ে ওঠা শিল্পকারখানার বর্জ্য প্রতিনিয়ত নদীতে পড়ার কারণে বিষাক্ত হয়ে পড়েছে শীতলক্ষ্যার পানি। সেই সঙ্গে বাসাবাড়ির বর্জ্য তো রয়েছেই। তবে আশার কথা হলো, একটি সূত্রে জানা গেছে, শীতলক্ষ্যা নদীকে দূষণ থেকে রক্ষায় মেঘনা থেকে পানি সরবরাহের কাজে হাত দিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে মেঘনা নদী থেকে পানি সরবরাহের জন্য একটি প্রকল্প একনেকে তোলা হয়েছে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলছে, নদী দূষণকারী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের একটি তালিকা তৈরি করেছে মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়েছে, নারায়ণগঞ্জের সৈয়দপুর থেকে রূপগঞ্জের মুড়াপাড়া পর্যন্ত ছোটো-বড়ো ৭০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিষাক্ত বর্জ্য শীতলক্ষ্যা নদীতে গিয়ে মিশছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, শীতলক্ষ্যা দূষণের জন্য দায়ী এসব শিল্পকারখানার বেশিরভাগেরই বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) নেই। বড়ো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ইটিপি থাকলেও প্রায়শই সেগুলো বন্ধ থাকে। এতে পরিশোধন ছাড়াই শিল্পবর্জ্য গিয়ে মিশছে শীতলক্ষ্যার পানিতে। নদীটি ঘিরে এমন অনেক কারখানা গড়ে উঠেছে, যেগুলোর পরিবেশ ছাড়পত্র নেই। আবার যেসব কারখানার অবস্থান নদী থেকে দূরে, বর্জ্যনিষ্কাশন কাজে তারা ব্যবহার করছে পৌর ও সিটি করপোরেশনের নর্দমা। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের বর্জ্যও মিশছে শীতলক্ষ্যায়।
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) ও ওয়ার্ক ফর বেটার বাংলাদেশ (ডব্লিউবিবি) ট্রাস্ট তাদের পরীক্ষায় দেখিয়েছে, কাঁচপুর খাল এলাকায় শীতলক্ষ্যার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ প্রতি লিটারে দশমিক ১৮ মিলিগ্রাম। কাঁচপুর বিআইডব্লিউ টিএ টার্মিনাল এলাকায় এর মাত্রা দশমিক ১৯ মিলিগ্রাম, সাইলো এলাকায় দশমিক ১২, সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুত্ কেন্দ্রের কাছে দশমিক ১৯, মেঘনা পেট্রোলিয়ামের কাছে দশমিক ৫১, পদ্মা পেট্রোলিয়াম এলাকায় দশমিক ৪২ ও আকিজ সিমেন্ট কারখানার পাশে দশমিক ৭৪ মিলিগ্রাম। এছাড়া শীতলক্ষ্যার সিনহা টেক্সটাইল এলাকায় দশমিক শূন্য ২, স্ক্যান সিমেন্ট কারখানার পাশে দশমিক শূন্য ৮, পুষ্টি ভোজ্যতেল কারখানার পাশে দশমিক শূন্য ৩ ও ওয়াসা ইনটেক এলাকায় প্রতি লিটারে দ্রবীভূত অক্সিজেন পাওয়া গেছে দশমিক শূন্য ৪ মিলিগ্রাম। যদিও পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ২০০৭ অনুযায়ী, মত্স্য ও জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য প্রতি লিটার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন থাকার কথা ৫ মিলিগ্রামের বেশি। এছাড়া শীতলক্ষ্যার পানিতে ক্ষারের পরিমাণও বেশি বলে পবা ও ডব্লিউবিবির পরীক্ষায় উঠে এসেছে। প্রতি লিটার পানিতে এর গ্রহণযোগ্য মাত্রা ৭ পিএইচ ও এর কাছাকাছি হলেও শীতলক্ষ্যার প্রতিটি পয়েন্টেই এর মাত্রা ৮ এর বেশি।
সূত্র জানায়, শিল্পকারখানাই শুধু নয়, ছোটো-বড়ো ২২টি পাইপলাইন দিয়ে কদমরসুল ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের দূষিত পানি শীতলক্ষ্যায় ফেলা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শীতলক্ষ্যা রক্ষায় এখনই পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এর পরিণতিও হবে বুড়িগঙ্গার মতো ভয়াবহ। বর্তমানে বুড়িগঙ্গায় যেমন জীববৈচিত্র নেই, একই অবস্থা হবে শীতলক্ষ্যারও। বিআইডব্লিউটিয়ের একটি সূত্র জানায়, ঢাকা ও এর চারপাশের ১১৯ কিলোমিটার নদীকে আগের অবস্থানে নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিষয়ে নদীদূষণ ও দখলকারীদের তাদের অপকর্ম বন্ধে সময় বেঁধে দেওয়া হবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তারা যদি তাদের দখল-দূষণ সংক্রান্ত কর্মকাণ্ড বন্ধ না করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, জরিমানা করেও নদীতে বর্জ্য ফেলা থেকে শিল্পমালিকদের নিবৃত্ত করা যাচ্ছে না। এবার নদী রক্ষায় দূষণের উত্সস্থলগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। সেই সঙ্গে দূষণের সঙ্গে জড়িতদের একটি তালিকাও তৈরি করা হয়েছে। শিল্প, নৌপরিবহন, বন ও পরিবেশসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে গঠিত টাস্কফোর্সের কাছে তালিকাটি দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে টাস্কফোর্স যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।
