স্টোরি টেলার বা চানাচুর বিক্রেতা

আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৮:০৯

কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে, এক জীবনে আমি কী কী করেছি, আমি খুব হাসিমুখে বলব, চানাচুর বা ঝালমুড়ি বিক্রি করা ছাড়া মোটামুটি সবই করেছি। তবে আমি সবসময় নিজেকে ভাবি একজন স্টোরি টেলার হিসেবে। স্টোরি টেলারের পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে আমি আমার কাজগুলো করার চেষ্টা করি। একদম পেছনে থেকে আসলে বলতে সুবিধা হবে। আমি তখন বুয়েটে মাত্র সুযোগ পেয়েছি। লক্ষ্য ছিল আহসান হাবীব সমপাদিত পত্রিকা উন্মাদে কাজ করব। মাথায় করে উন্মাদ ফেরি করতে চেয়ে স্টাফ রাইটার হিসেবে জয়েন করার সুযোগও পেয়ে গেলাম একদিন। পরে সেখানে সহযোগী সমপাদক হই। তখন উন্মাদে পার্ট টাইম কাজ করি আর করি নিজেদের থিয়েটার দল "স্বপ্ন"। এই সময় সাধারণত অনেকেই ছাত্র-ছাত্রী পড়ায়। কিন্তু আমার কেন জানি সেটা ভালো লাগত না। আমি লেখালেখি আর মঞ্চ নাটক নিয়েই থাকতাম।  

বুয়েটে মেকানিক্যাল ইঞ্জেনিয়ারিং-এ পড়ার সময় মেকানিক্যাল ফেস্টিফ্যালের জন্য হ্যান্ডি ক্যাম দিয়ে সবাই মিলে একটা সিনেমা বানাই। এতে আমি স্ক্রিপ্ট লিখি এবং অভিনয় করি। প্রদর্শনীর আগে নিজেরাই রিকশা ভাড়া করে মাইকিংও করি। তখন তো এখনকার মতো ভালো ক্যামেরা ছিল না। আমাদের সাউন্ডও খুব বাজে ছিল। কিন্তু লোকজনকে দেখলাম সিনেমা দেখে হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে। মানুষের এত ভালো সাড়া পেয়ে অনেক উত্সাহিত হয়েছিলাম সেদিন। সিদ্ধান্ত নিলাম লেখালেখিটা চালিয়ে যাব। বাড়িতে ঘোষণাই দিয়ে দিলাম, রাইটার হব। একমাত্র সন্তান যখন বুয়েট থেকে পাস করে রাইটার হতে চায়, তখন বাবা-মা'র মন-মানসিকতা কী হয় বুঝতেই পারছেন। পাস করার প্রথম ছয় মাস আমার আব্বুজী-আম্মু একনাগাড়ে বলে গেছেন, ও মাত্র পাস করেছে। তো এখন কী করে? কেউ জিজ্ঞেস করলে, চোয়াল কটমট করে বলতেন, মাত্র...মাত্র পাস করেছে! 

আমার শুরুটা হয়েছিল ওখান থেকেই বলা যায়। ইউনিভার্সিটি থেকে বেরোনোর পর কপি রাইটার-এর কাজ করলাম। ‘ইউনিট্রেন্ড’, ‘ক্যারোট কমিউনিকেশন’ থেকে শেষে  ‘গ্রে কমিউনিকেশনে’ কপি হেড হিসেবে ছিলাম। তখন প্রচুর বিজ্ঞাপন, প্রচুর নাটক লিখতাম এবং অভিনয় করতাম। হুমায়ূন আহমেদের ‘অতঃপর শুভ বিবাহ’ নাটকে অভিনয় করে ব্যাপক সাড়া পেয়েছি। ধারাবাহিক নাটক ‘চন্দ্রকারিগর’ করেও। হোয়াইট প্লাস টুথপেস্টের কাঁটা চামচ খাওয়ার বিজ্ঞাপন করেও শিশু দর্শকদের মধ্যে একই সাড়া লক্ষ করলাম। ওই বিজ্ঞাপন করে তো শিশু দর্শকদের কাঁটা চামচ প্রায় খাইয়ে ফেলেছিলাম! কারণ ওই বিজ্ঞাপনটা তখন ঘন ঘন টিভি স্ক্রিনে ভেসে উঠত। বিলবোর্ডও ছিল সারাদেশ জুড়ে!

আমার সবসময় ছিল ফিল্ম মেকিং শেখার প্রতি ঝোঁক, ইচ্ছা হলিউডে কাজ করা। কিন্তু পড়াশোনার খরচের কথা চিন্তা করে প্রথমে পিছিয়ে যাই। পরে কানাডাতে ট্রাই করি। এখানে টিউশন ফি কম এটা ছিল একটা কারণ আর ভ্যাঙ্কুভার-এর শীত খুব বেশি না হওয়ায় ইউনিভার্সিটি অফ ব্রিটিশ কলম্বিয়াতে আরেকটা ব্যাচেলর ডিগ্রি করতে চলে আসি। ইউনিভার্সিটির সেকেন্ড ইয়ারে ইন্টার্নশিপের সুযোগ পাই মার্কিন প্রতিষ্ঠান এনবিসি ইউনিভার্সেলে। তিন ধাপ ইন্টারভিউ শেষে পুরো কানাডা থেকে মাত্র ৬ জনকে এই সুযোগ দেওয়া হয়। সেখানে আমার প্রথম কাজ ছিল টেলিভিশন ধারাবাহিক স্যুটস ও ডিফায়ন্স-এ। সেখানে টিভি শো তে কাজ করে আমার দারুণ সব

অভিজ্ঞতা হয়েছিল।

এরপর ফাইনাল ইয়ারের প্রজেক্ট হিসেবে তৈরি করি একটা শর্ট ফিল্ম।  ‘হোয়াট আই অ্যাম ডুয়িং হেয়ার’ নামের শর্টফিল্মটি পারসিসটেন্স অব ভিশন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে বেস্ট সিনোমাটিগ্রাফি অ্যাওয়ার্ড জিতে নেয়। সারে ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল এ জিতে নেয় বেস্ট স্টুডেন্ট ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড। এছাড়া বেশ কিছু ফেস্টিভ্যালে অংশগ্রহণের সুযোগ পায় শর্টফিল্মটি। টরেন্টো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের শর্ট লিস্টেও আমার সিনেমাটির নাম ছিল। ডিগ্রি শেষ করতে করতেই ৮-৯টা শর্ট ফিল্ম বানিয়ে ফেলি। পাস করার পর জানতে পারলাম স্থানীয় না হলে আমি ইউনিয়নের মেম্বার হতে পারব না। আর মেম্বার না হলে কোনো প্রোডাকশনই সেটে আমাকে নেবে না!

ঠিক করলাম প্রোডাকশন অফিসে কাজ করব অ্যানিমেশন বা ভিএফএক্স ইন্ডাস্ট্রিতে। ভ্যাঙ্কুভারে তখন এই ইন্ডাস্ট্রি বেশ তুঙ্গে। আন পেইড ইন্টার্নশিপের ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে পেয়ে যাই অ্যানিমেশন স্টুডিও বার্ডেলে প্রোডাকশন এসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করার অফার! কাজ করি আমি বিজয়ী রিক এন্ড মরটি, টিন টাইটান্স গো-এর মতো জনপ্রিয় কার্টুনে। এরপর অস্কার বিজয়ী ভিএফএক্স ষ্টুডিও এমপিসি টাকায় শুরু করি। ইন্টারভিউতে বলি আমি বাংলাদেশের ছেলে। ওরা বলে, ও ওখানে তো আমাদের অফিস আছে! আমি মুচকি হেসে বলি, নাহ্ তোমাদের অফিস ব্যাঙ্গালোরে, আমাদের পাশের দেশ ইন্ডিয়াতে। ভদ্রলোক লজ্জায় পড়ে যান। সরি সরি বলতে থাকেন।

আমি তার লজ্জা কাটাতে বললাম, ব্যাপার না ব্যাঙ্গালোর খুব কাছে আমাদের, আমার বাসার বারান্দা থেকে দেখা যায়! ভদ্রলোক হোহো করে হাসলেন, কাজ অফার করলেন ভিএফএক্স কো-অর্ডিনেটর-এর। প্রথম শো ছিল গেম অফ থ্রোন্স! এমপিসিতে শেষ শো ছিল ব্যাটম্যান ভার্সেস সুপারম্যান।    

এরপর মার্ভেল-এর মুভিতে কাজ করার জন্য মেথড স্টুডিওস নামের আরেক শীর্ষস্থানীয় ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট কোমপানিতে যোগ দিলাম। সেখানে প্রথম শো ‘ক্যাপ্টেন আমেরিকা: সিভিল ওয়ার।’ এরপর কাজ করলাম বেনেডিক্ট কাম্বারব্যাচ অভিনীত ডক্টর স্ট্রেঞ্জ-এর। এই মুভিটি পরে ভিএফএক্স-এর জন্য অস্কারে নমিনেশন পায়। কিন্তু আমাদের ভিএফএক্স দলের সেই নমিনেশন সেলিব্রেশনের সময় আমার থাকে না। কারণ ততদিনে প্রমোশন পেয়ে প্রোডাকশন ম্যানেজার হয়ে গেছি। কাজ করছি গার্ডিয়ান্স অফ গ্যালাক্সির ‘ভলিউম টু’- তে। এই সিনেমাটিও পরের বছর অস্কার নমিনেশন উঠে আসে। তাই পরপর দুইটি অস্কার নমিনেটেড সিনেমায় কাজ করেছি এই কথাটা বলতে পারি খুব গর্বের সঙ্গে। গার্ডিয়ান্সের শেষের দিকে ব্যক্তিগতভাবে খুব বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি। আমার আম্মু মারা যান। একদিনের নোটিশে দেশে উড়ে আসলেও, তার সাথে আমার আর দেখা হয় না!         

বাংলাদেশ থেকে যখন ভ্যাঙ্কুভারে আবার ফিরে আসি, স্বাভাবিক কারণেই কিছু ভালো লাগছিল না। মেথড আমার সাথে খুব চমত্কার আচরণ করে। আমার পছন্দ মতো যেকোনো শো করার অফার থাকে, কিন্তু আমার কেন জানি মন বসে না কিছুতে। তারপরও ‘ব্ল্যাক প্যান্থার’, ‘এভেঞ্জারস- ইনফিনিটি ওয়ার’, ‘ফ্যান্টাস্টিক বিস্ট পার্ট টু’ এবং ‘গডজিলা পার্ট টু’-তে কাজ করি। ঠিক করি ফুল অ্যানিমেটেড ফিচার ফিল্মে কাজ করব। এই অভিজ্ঞতা আমার ছিল না। সনি পিকচার্স ইমেজ ওয়ার্কস-এ ইন্টারভিউ হয়। সুযোগ পেয়ে যাই এসোসিয়েট প্রোডাকশন ম্যানেজার হিসেবে কাজ করার। নিজের ‘চাইল্ড হুড হিরো’, গেন্ডি টারটাকোভস্কি-এর নতুন ফিল্ম ‘হোটেল ট্রানস্লেভেনিয়া’-র তৃতীয় পর্ব, সামার ভ্যাকেশনে। এখনো সনিতে কাজ করছি, বর্তমানে ‘অ্যাংরি বার্ডস টু’-তে।     

অ্যানিমেশন নিয়েই কাজ করতে করতে একটা বিশাল প্রজেক্ট নিয়ে ফেলি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অ্যানিমেটেড সিনেমা বানানোর ঘোষণা দিই ২০১৭-এর শেষে। স্ক্রিপ্ট লিখে ফেলি, যার মূল গল্পের একটা বড় অংশ আমার আব্বুজীর নিজের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে নেওয়া! পরিকল্পনা প্রথমে স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমা করব। এরপর ফান্ডিং নিয়ে পূর্ণদৈর্ঘ্য। বর্তমানে আমাদের সিনেমাটির টিজারের ডিজাইনের কাজ শেষ হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২৬ মার্চ ২০১৯ আমরা প্রথম টিজার দেখতে পাব। ইচ্ছা ২০২০-এর মধ্যে সিনেমাটি শেষ করা। ইতিমধ্যে অ্যানিমেশনটেস্ট এবং ব্যাকগ্রাউন্ড পেইন্টিং-এর কাজ শুরু হয়ে গেছে। রিলিজ হয়েছে থিমেটিক পোস্টার! সিনেমাটিতে দেখা যাবে ধ্রুব ও আক্কু নামের দুই বন্ধুকে। যারা এক সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে অনেক রোমহর্ষক ঘটনার মুখোমুখি হয়, শেষ পর্যন্ত প্রাণে বেঁচে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। সিনেমাটির নাম ‘সার্ভাইভিং সেভেনটি ওয়ান।’ সামনে এই স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটি নিয়ে থাকবে কাস্টিং এবং গানসংক্রান্ত আরো কিছু চমক। বিস্তারিত জানা যাবে আমাদের ওয়েবসাইটে।    

লেখাটি শেষ করতে করতে মনে পড়ল, ভ্যাঙ্কুভারে বৈশাখী মেলায় চানাচুর ও ঝালমুড়ির বিক্রি করার অভিজ্ঞতাও হয়ে আছে! সিনেমায় যদি কিছু না হয়, চানাচুর বিক্রি করে দিন খারাপ যাবার কথা না!

 

লেখক : অস্কারজয়ী অ্যানিমেটর