‘পাঠাও’ সেবা নিয়ে আমার কথা

আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৮:০৮

 

ছোটবেলা থেকেই আমার বিভিন্ন প্রোগ্রামের প্রতি ঝোঁক। তখন ইন্টারনেটের এমন সুবিধা ছিল না। বায়তুল মোকাররমের মার্কেট থেকে বই কিনে এনে প্রোগ্রাম শিখতে হতো। ও লেভেল এ লেভেল শেষ করে যখন ইউনিভার্সিটিতে ঢুকলাম—তখন আমি এক জায়গায় ডেভেলপারের কাজ শুরু করি। আমার পড়াশোনা ছিল বিজনেস নিয়ে। বিবিএ। তারপর যেটা হয়, বেশ কিছু কোম্পানিতে ডেভেলপার হিসেবে কাজ করা হয়। সেখান থেকে আমার শুরু বলা যায়, আর সেটা ইউনিভার্সিটি পড়ার সময় থেকেই। একটানা দশ-এগারো বছর কাজ করার অভিজ্ঞতাও তখন সঞ্চয়ে। অর্গানাইজেশন ডেভেলপার হিসেবে কাজ তো করেছি সেই শুরু থেকে। দুটো ফার্মে কাজ করেছি। সেই অভিজ্ঞতা থেকে তারপর আমি নিজেও একটা ফার্ম দিই। ছোট সময়ের জন্য। দুই-তিন জন এমপ্লয়ি নিয়ে আমরা প্রজেক্ট করে আউটসোর্সিং করতাম। ইনকাম বেশ ভালোই হতো। তখন তো আমি কেবল ইউনিভার্সিটিতে পড়ি। নর্থসাউথ থেকে এমবিএ শেষ করে মনে হলো—আউটসোর্সিং তো আমরা অনেকদিন থেকে করছি, কিন্তু এটার কোনো প্রভাব নেই! মানুষ এসে জিজ্ঞেস করলে আসলে বলতে পারি না—মূলত কী কাজ করছি। মানুষজনকে ঠিক সাহায্য বলতে যেটা বোঝায়—সেরকম কিছু করতে পারছি না। সেসময় আমরা বেশ কয়েকটি প্রজেক্ট চালু করি। পাঠাও আমাদের চার বা পাঁচ নাম্বার প্রজেক্ট। এর আগের প্রজেক্টগুলোর মধ্যে ছিল ফিল্ম, সিএনজি ইউনিয়নের মতো কিছু একটা, ইভেন্ট নিয়ে দুই-একটা ওয়েবসাইট ইত্যাদি। এখনো আছে এরকম দুই-একটি, কিন্তু সেগুলো ওভাবে ভালো কাজ করেনি। পাঠাও যখন শুরু হলো, তখন তা প্রিমিয়ার কোম্পানি। ২০১৫ সালে এর যাত্রা। আমি দেখলাম—এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়া বেশ কষ্টকর। সেটার জন্যই আমাদের এই সার্ভিস। যাতে করে খুব সহজে মানুষ এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় জিনিসপত্র পাঠাতে পারে। তখন ই-কমার্স মাত্র বাংলাদেশে শুরু হয়েছে। ওখান থেকে আমরা সাফল্য পেতে শুরু করলাম। আর ট্রান্সপোর্টেশনগুলো ভালোভাবে বোঝা শুরু করলাম। আমাদের যাত্রার সময়েই অর্থাত্ ২০১৫ সালে অনেকগুলো ফ্লাইওভারের কাজ একসাথে শুরু হয়েছে। মগবাজারের ফ্লাইওভারের কাজ। রামপুরাতেও একটা ফ্লাইওভারের কাজ চলছে। মালিবাগেও একটা। রাস্তাঘাট অনেক খারাপ। আমি তখন কমলাপুর থাকি। প্রতিদিন অফিস করতে আমাকে উত্তরা যেতে হতো। প্রতিদিন আমার দুই-তিন ঘণ্টা রাস্তাতেই কেটে যেত। বাসে করে, হেঁটে, আবার বাসে করে হেঁটে আমার অফিসে যেতে হতো। এরপর ভাবলাম, আমাদের যদি বাইক থাকে, আমরা তো বাইকেই চলাফেরা করতে পারি। প্রথম আমরা গ্রুপ করে ফেসবুকে ক্যাম্পেইন শুরু করি। আমরা তিনজন ছিলাম তখন, আমি, আদনান আর ফাহাদ। এটা এভাবে শুরু করেছিলাম, জাস্ট টেস্ট করার জন্য যে মানুষ বাইক রাইড নেবে কি নেবে না। তখনো ব্যাপারটা একটা কনসেপ্টের মধ্যেই। কিন্তু বাইক ব্যাপারটা বাংলাদেশের কালচারের সঙ্গে যায় না। বা এ ধরনের কালচারের সঙ্গে অভ্যস্ত না বাংলাদেশের লোকজন। হয়তো তা কয়েকদিন মাত্র চলবে, কয়েকদিন পর আর চলবে না। কিন্তু আমরা যখন এটা লঞ্চ করি, বছর দুই আগে—তখনই আমরা বুঝে যাই মানুষের এ ব্যাপারে আগ্রহ আছে। কারণ মানুষের চাহিদা আছে। চাহিদা হলো এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে হবে এবং খুব দ্রুত। কারণ ট্রাফিক ও চিপরেট এই দুটোর একটা সমাধানও এই বাইক সার্ভিসটা। প্রথমদিকে মানুষ বাইকে চড়তে চাইত না। কিডন্যাপ না কী—এটা নিয়ে একটা আশঙ্কা ছিল মানুষের মধ্যে। সিকিওরিটিও একটা ব্যাপার। প্রথম দিকে আমরা ইউনিভার্সিটির সামনে দশ-বারোটা বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। লোকজনকে হয়তো জিজ্ঞেস করছি, আপনি কই যাবেন? উত্তর এল, ধানমন্ডি। এরপর প্রশ্ন, কিসে যাবেন? সিএনজিতে। সিনএনজির ভাড়া কত? ২০০ টাকা। তখন আমরা বললাম, বাইকে চলেন একশ’ টাকায় নিয়ে যাব। কিন্তু ওদের আশঙ্কা একশ’ টাকা কেন! যদি কিডন্যাপ করে নিয়ে যাই। সেটা মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে মৌলিক একটা প্রশ্ন। আমাদের কাছে অনেক প্রশ্ন এসেছে। মানুষ প্রথম সার্ভিস নিলে কার্ড ধরিয়ে দিতাম। সেকেন্ড টাইম নিলে, আবার কার্ড ধরিয়ে দিতাম। তৃতীয় দিন থেকে মানুষ নিজেই ফোন দেওয়া শুরু করল। ব্যাপারটা হলো একজন এই সার্ভিসটা নিয়ে দেখল, তা টাকা ও সময় দুটোই সেভ করে। এভাবে তারা সার্ভিস নেওয়া শুরু করল। মানুষ যখন এটা নিল—এরপর আমরা আমাদের পাঠাও অ্যাপস লঞ্চ করি। মানুষের একটা চাহিদা ছিল, আমরা তা পূরণ করি। এরকম একটা কাজ শুরুর ক্ষেত্রে অনেকেই ফান্ডের কথা আমাদের জিজ্ঞেস করেন। আমার কাছে মনে হয়—যেকোনো কিছু শুরু করতে গেলে আসলে ফান্ড লাগে না। আমরা কিন্তু প্রথম অ্যাপস দিয়ে লঞ্চ করিনি। আমরা শুরু করেছি ফেসবুক ও আমাদের ফোন নাম্বার দিয়ে। এগুলোর ক্ষেত্রে টাকা লাগে না। গুগোল শিটস, এক্সেল এগুলো দিয়ে আমরা ট্র্যাক করতাম। কোনোকিছুর শুরু করতে ইচ্ছেশক্তিই যথেষ্ট। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে আমাদের এ পর্যন্ত আসতে দুই বছর লেগেছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমাদের প্রস্তুতি ছিল অনেকদিনের। আমাদের মতো কোম্পানি কিন্তু বাংলাদেশে আর দ্বিতীয়টি নেই। বিষয়টি যদি এমন হতো—আমরা কাউকে হায়ার করে নিয়ে এলাম। সে আমাদের সবকিছু দেখাচ্ছে, কীভাবে, কোনটা। এরকম কোনো কিছু যেহেতু ছিল না, তাই আমাদেরটা আমাদেরকেই বের করতে হয়েছে, একটা রাইজিং কোম্পানি যেভাবে কাজ করে, আমরাও ঠিক সেভাবেই নিরলস পরিশ্রম করেছি। আমাদের দেখতে হয়েছে একটা কোম্পানি কীভাবে কাজ করে, ডেভেলপ করে টেকনোলজিক্যাল সাইটগুলো। কারণ দশজনকে ম্যানেজ করা যত সহজ পাঁচশ জনকে ম্যানেজ করা এত সহজ কাজ নয়। যেটা হয়েছে আমাদের একটা ভালো টিম হয়েছিল এবং যে টিমটা এখনো আছে। এই টিমটা দিয়েই আসলে সবকিছু। আমাকে সবকিছু করতে হয়নি। কাজগুলো ভাগ ভাগ হয়ে গেছে। একটা টিম হয়তো দেখেছে হায়ারিং, আরেকটা টিম টেকনোলজি সাইট। একটা টিম মার্কেটিং। আমার কিন্তু এতকিছু করতে হয়নি। আমার যেটা ছিল টিমকে মোটিফাইড করা। গ্রোথ করা। বুঝানো ও দেখানো। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, আমাদের মধ্যে এই বিশ্বাসটা ছিল যে আমরা পারব। এখানে বড় বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি আছে—ওরা যদি পাঠাও-এর মতো কিছু করে তাহলে আমাদের তো নাই হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু তা হয়নি, আমার মনে হয়েছে আমাদেরটাই বেস্ট এবং আমরা পারব। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় অনেক সহজ, কিন্তু ব্যাপারটা এত সহজ ছিল না। তখন আমার বয়স ছিল ২৭ এখন ২৯। আমাদের টিমের এখনো কেউ তিরিশ পেরোয়নি। একই বয়সের কাছাকাছি হওয়াতে আমাদের টিমের বোঝাপড়াও বেশ ভালো। সেই শক্তি নিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি। আমাদের নেটওয়ার্ক এখন ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ। আর ওদিকে সিলেট, চট্টগ্রাম ও সিলেট। ওখানে আমাদের শেয়ারিং সার্ভিসিংগুলো আছে। আর আমাদের ফুল সার্ভিস ঢাকা ও চট্টগ্রামে। আর আমাদের কুরিয়ার সার্ভিস পুরো বাংলাদেশে। আমাদের লক্ষ্য, বেশ কয়েকটা প্রডাক্ট লঞ্চ করা, যেটা এখনো করে থাকি। পাঠাও এখন একটা ব্র্যান্ড। পাঠাও কুরিয়ার সাফল্য পেয়েছে, পাঠাও রাইডও সাফল্য পেয়েছে। আরো কিছু আছে যেগুলো সাফল্যের মুখ দেখেনি, কিন্তু আমরা সেগুলো দাঁড় করানোর কাজ করে যাচ্ছি। পাঠাও ফুড, পাঠাও কারও সাফল্য পেয়েছে। আমাদের আরো একটা নতুন সার্ভিস হচ্ছে। আমরা এটাই ভাবছি মানুষকে আরো কী কী নতুন সার্ভিস দেওয়া যায়। এমন কী সার্ভিস আছে আর—যেটা মানুষের প্রয়োজন কিন্তু মানুষ বলতে পারছে না। দুই বছর আগে মানুষকে যদি জিজ্ঞেস করতেন, এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় বাইকে করে যাওয়া যায় কি-না, উত্তর আসত, না। ব্যাপারটা হলো মানুষ বলে এক জিনিস আর চায় অন্য জিনিস। আমাদের কাজ হচ্ছে সেটাই, মানুষ আসলে কী চায় সেটা ফাইন্ড আউট করা। আর রিসার্চটা অনেক সময় ভালো কিছু নিয়ে আসে না। ভালো কিছু নিয়ে আসে তখনই যখন আমি কোনো নতুন জিনিস মানুষের কাছে নিয়ে যাব। তারপর মানুষ ঠিক করবে তা ব্যবহার করবে কি করবে না। আমাদের ফুড ডেলেভারি কোম্পানি আগে দুটো ছিল। মানুষ সবসময় বড় রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার কিনে খায় না। মানুষ প্রতিদিন কম রেটে খেতে চায় একটু ভালো কিছু। আমরা মানুষের সামর্থ্যকেও বিবেচনায় রেখেছি। কতটা সে খাবারে খরচ করতে পারবে। আমরা এমন একটা প্রজেক্ট লঞ্চ করার চেষ্টা করছি, যাতে করে সেটা শুধু বাংলাদেশেরই নয়, সকল মানুষের জন্য দরকার। পাঠাও রাইড সার্ভিসে আমাদের ঢাকাতেই দুই কোটি মানুষের শহরে আছে ৬ লাখ বাইক। কাঠমান্ডুতেও আমরা পাঠাও লঞ্চ করছি। ওখানে পঞ্চাশ লাখ মানুষ, কিন্তু ৬ লাখ বাইক। কাঠমান্ডুতে বাংলাদেশের মানুষের তুলনায় অনেক বেশি বাইক। বাইক স্ট্র্যাটিজি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার এই জন্যে যে—এর মাধ্যমে খাবার ডেলিভারি করা যাচ্ছে। পার্শ্বেল ডেলিভারি করা যাচ্ছে, আরো অনেক কিছু। যেটা কার বা অন্য ট্রান্সপোর্টেশনে ওভাবে সম্ভব না। কারণ সেক্ষেত্রে খরচ অনেক বেড়ে যাবে। আগামী বছর থেকে আমরা আমাদের কাস্টমার সার্ভিসকে কীভাবে আরো উন্নত করা যায় সেই পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করব। ঢাকায় প্রতিদিন এত মানুষ পাঠাও সেবা নিচ্ছে—যার মধ্যে ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট ও চাকরিজীবী পুরুষ মানুষই বেশি। এদের সেবার মান নিয়ে আমরা যথেষ্ট ভাবছি। তারপর সেই সঙ্গে আরেকটা পরিকল্পনা আছে—সেটা হলো, যেসব মানুষ পড়তে পারে না, তাদের নিয়ে। তারা কী করে সহজে পাঠাও সেবা পেতে পারে।

 

লেখক : সিইও, পাঠাও