ডিম রাখবেন গো ডিম।
মৃদু কণ্ঠের হালকা হাঁক। কাছাকাছির লোকজনই শুনতে পায়। আর কেউ নয়। বোধহয় ডিমওয়ালির ইচ্ছেও নয়, কেউ তার কাছ থেকে ডিম কিনুক।
তবু সে ডিমওয়ালি। কুলসুম। ২৯-৩০ বছর বয়স। মাথায় শাড়ির আঁচল। সদর রাস্তা ধরেই হাঁটছে। তার হাঁক যত না প্রবল, হাঁটাটা তার চাইতে অনেক বেশি দ্রুত।
এমনিতে বর্ডার এলাকা। পাক-আর্মির লরি আর সাঁজোয়া গাড়ি যায় দুদ্দাড়। ওদিকে যখন তখন মুক্তিবাহিনীর হামলা। লাগোয়া জনপদে আতঙ্ক।
হঠাত্ পেছনে ডাক : এই ডিমওয়ালি।
ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল কুলসুম। রাস্তার মোড়ে পানওয়ালার দোকান।
দোকানি বলল, হাঁড়িটা দেন। কেমন ডিম দেখি। বাছাই করে ডিম নেব।
কুলসুম তাকালেন তাঁর হাঁড়ির দিকে। নির্বিকার কণ্ঠে বললেন, বেছে বেছে ডিম বেচি না।
দোকানি আশ্বাস দিল, ন্যায্য দাম দেব।
কুলসুম বললেন, আপনার দোকানের মাল গাহেকদের কি নিজ হাতে বাছাই করে নিতে দেন? নাকি আপনি নিজেই তাদের হাতে তুলে দেন?
রাস্তার দিকে ফিরলেন কুলসুম। বললেন, আপনার কাছে ডিম বেচব না।
হনহন করে সামনে এগিয়ে যেতে লাগলেন।
দোকানির পাশে দাঁড়িয়েছিল এক ক্রেতা। বলল, মেয়েটার সাহস আছে বৈকি। হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে হাসলেন কুলসুম। এ কথাটা হাজী দানেশও বলেছিলেন। তবে তিনি অবাক হননি, আস্থা জানিয়েছিলেন।
বাঙালিদের ওপর তখন পাকিস্তানি হানাদাররা হামলা চালিয়েছে। সারা দেশে দুর্যোগ। টালমাটাল। এ সময় কুলসুমদের বাড়ি পঞ্চগড়ের বোদা থানার নাজিরপাড়া গ্রামে খবর এল—তাঁর বড় বোন আনোয়ারা অন্তঃসত্ত্বা। ওঁরা দিনাজপুর শহরে থাকেন। কুলসুম দেখতে এলেন বড় বোনকে। দুনিয়ার দুর্যোগ মাথায় নিয়ে।
ক’দিন পরই দিনাজপুর শহরের উপর আক্রমণ চালাল পাকিস্তানি হানাদাররা। গোলাগুলির মধ্য দিয়ে কুলসুম তাঁর বোনের পরিবারের সঙ্গে সীমান্ত পেরিয়ে এলেন ভারতের গঙ্গারামপুর থানা শহরে। তাঁরা যেখানে আশ্রয় নিলেন তার পাশেই মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। এর দায়িত্বে ছিলেন কৃষকনেতা হাজী মোহাম্মদ দানেশ, আওয়ামী লীগ নেতা শাহ মাহতাব, আজগর আলি।
হাজী দানেশ সম্পর্কে কুলসুমের দুলাভাই। ফুপাতো বোনের স্বামী।
কুলসুম এসে ধরলেন হাজী দানেশকে—তিনিও মুক্তিযুদ্ধে নাম লেখাবেন। হাজী দানেশ শুনে হাসলেন। বললেন, তোর বাপ বাঘ মেরেছিলেন। তাঁর মেয়ে যদি যুদ্ধ না করে তাহলে দেশ কেমন করে স্বাধীন হবে!
পরদিন সকালেই শপথ। স্বাধীন বাংলার পতাকা ছুঁয়ে। তার আপাতত ভূমিকা ডিমওয়ালির। মাটির হাঁড়িতে করে ডিম পৌঁছে দেন সীমান্তের ভেতরে বিভিন্ন মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে।
তেমনি এক ক্যাম্পে এলেন কুলসুম। তাঁকে দেখেই মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের কমান্ডারের মুখে হাসি ফুটল। বললেন, আপা এসেছেন। এবার আমাদের খাওয়াদাওয়া ভালো হবে।
একজন নতুন রিক্রুট মুক্তিযোদ্ধাকে ডেকে কুলসুমের কাছ থেকে ডিমগুলো বুঝে নিতে বললেন কমান্ডার।
নবীন হাঁড়ি হাতে নিতেই কুলসুম হুঁশিয়ার করে দিলেন, সাবধান! ডিম কিন্তু ফেটে যেতে পারে।
যুবক হাঁড়িতে নজর দিয়ে বলল, মাত্র এই কয়টা ডিম! এত বড় হাঁড়ি!
মাটিতে হাঁড়ি রেখে গুনেগুনে ১৫টা হাঁসের ডিম বের করল। রাখল একটা পাত্রে। প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাল কুলসুমের দিকে।
কুলসুম বলল, বালুর তলায় সোনার ডিম। সাবধানে হাত দিয়ে বের করো।
যুবক বালির ভেতর হাত চালিয়ে বের করে আনল একটা গ্রেনেড। বিস্ময়ে সে তাকিয়ে রইল তার হাতের দিকে।
কুলসুম এক গাল হেসে বললেন, আরো আছে। খানসেনাদের খাদ্য।
