কৌশিক
টাইগার শোয়েব বললে সবাই এক নামে চেনেন। এ নামের ভিড়ে তার আসল নাম শোয়েব আলী বুখারি অনেকেই ভুলে গেছেন। যারা কোনো নামই জানেন না তাদের কাছে অন্তত তার মুখখানা বেশ পরিচিত। দেশের মাঠে কিংবা বিদেশের বাংলাদেশের খেলা মানেই বাঘের বেশে হাজির হন তিনি। ভারতের সুধীর কিংবা পাকিস্তানের জলিল চাচার মতোই আমাদের এই আইকনিক সমর্থকের পেছনের গল্পটা কী জানা হয়েছে কারো? ছিলেন একটি ওয়ার্কশপের মালিক। তাও বিলিয়ে দিয়েছেন ক্রিকেটপ্রেমে। বিক্রি করেছেন ২টি গাড়ি, ৭ লাখের বেশি টাকার ঋণের বোঝা নিয়ে জীবনের তাগিদে এখন চালাচ্ছেন গাড়ি। সম্প্রতি ভিন্নচোখের মুখোমুখি হয়েছিলেন লাল-সবুজের খেলা মানেই অবিরাম গর্জে যাওয়া টাইগার শোয়েব।
শোয়েব থেকে টাইগার শোয়েব
শোয়েবের জন্ম ফরিদপুরে। ছোট থেকেই ক্রিকেট ভালো লাগতো তার। গ্রামের বাড়িতে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন ব্যাট-বল হাতে। নামের পাশেই যে রয়েছে খেলা পাগলের খ্যাতি। পেশা হিসেবে বেছে নেন মোটর মেকানিক। পেশার তাগিদেই ঢাকা এসে ছুটে গেলেন স্টেডিয়ামে, যে খেলা এতদিন দেখে এসেছেন টিভির পর্দায় সেই খেলা সামনা-সামনি দেখার ইচ্ছেটা যেন পূরণ করা চাই-ই চাই। ছোটবেলা থেকেই নিজের মনের মধ্যে দেশের প্রতি আলাদা ভালোবাসার টান। জাতীয় সংগীতের প্রতিটি শব্দ থেকে শুরু করে লাল-সবুজের প্রতিটি অংশে খুঁজে পেতেন অন্তর থেকে ভালোবাসা। সেই ভালোবাসা এবং ছোটবেলার ক্রিকেট পাগলামির যৌথ প্রয়াসেই হয়তো সিদ্ধান্ত নিলেন দেশের ক্রিকেটের জন্য উত্সর্গ করবেন নিজের জীবন। দেশের প্রতিটি ম্যাচে উপস্থিত থাকবেন বাঘের অবয়বে নিজেকে প্রস্তুত করে।
দিনটা আজও স্পষ্ট শোয়েবের দৃশ্যপটে, সময়টা ২০১২ সাল। মিরপুর শেরে বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের খেলা দিয়ে বাঘের অবয়বে নিজেকে রাঙিয়ে প্রথমবারের মতো পা রাখেন ২২ গজের ময়দানে। তাকে দেখেই সবাই এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। যখন গলা ফাটিয়ে চিত্কার দেন। প্রতিপক্ষের উইকেট পড়লে মুষ্টিবদ্ধ হাতটি ছুঁড়ে মারেন আকাশে কিংবা টাইগাররা ছক্কা হাঁকালে উল্লাসে ফেটে পড়েন। এভাবেই যেন শুরু হয় নতুন এক শোয়েবের অধ্যায়। নিজের নাম শোয়েব থেকে বনে যান টাইগার শোয়েব নামে।
বছরে বাদ মাত্র একটি!
বাঘের বেশে এই ৮ বছরের পথচলায় মাত্র একটি ম্যাচ বাদ দিয়েছেন! কীভাবে একটি ম্যাচ বাদ পড়ল? জবাবের সঙ্গে শোনা হলো শোয়েবের মানবতার গল্পও। ২ বছর আগের কথা। বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ের টেস্ট সিরিজ দেখতে অসুস্থতা নিয়ে রওনা হন সিলেটের উদ্দেশ্যে। মাঝপথে বিমানবন্দর রেলস্টেশনে দেখলেন অজ্ঞান অবস্থায় শুয়ে আছেন এক বৃদ্ধ। কাতরাচ্ছেন যন্ত্রণায়। অন্যরা ওই বৃদ্ধকে টোকাই ভেবে এড়িয়ে গেলেও তা যেন সম্ভব হয়নি শোয়েবের ক্ষেত্রে। তাকে নিয়ে বসালেন পরিষ্কার একটি স্থানে। নিজের টাকায় খরচ করে করলেন চিকিত্সা। জানতে পারলেন তার বাড়ি মুন্সীগঞ্জ। মলম পার্টির খপ্পড়ে পড়েই তার এমন অবস্থা। সুস্থ করেই শেষ করলেন না নিজের দায়িত্ব। পৌঁছে দিলেন বাড়িতেও। ৭ দিন পর নিখোঁজ পিতাকে খুঁজে পেয়ে আত্মহারা তার সন্তানরাও। সেদিন অন্যদের এড়িয়ে গিয়ে পারতেন খেলা দেখতে যেতে। মনটা খেলার দিকে থাকলেও যাননি বৃদ্ধ ব্যক্তিটিকে ফেলে। একবার খেলা শুরুর ১ ঘণ্টা আগে হারান নিজের খালুকে। পড়েন সঙ্কটে। সিদ্ধান্ত নিলেন সবার আগে দেশ।
মুখোমুখি হাজারো অভিজ্ঞতার
শোয়েবের ঝুলিতে রয়েছে শতশত অভিজ্ঞতা। কয়েকটি স্মরণ করতে চাইলেন এই টাইগার সমর্থক। ২০১২ সাল, কোনো খেলায় বাংলাদেশের জয়ে কান্না করে দিয়েছিলেন আনন্দে আত্মহারা হয়ে। বিষয়টি নজরে আসে জাতীয় দলের ওপেনিং ব্যাটসম্যান তামিম ইকবালের। ছুটে যান শোয়েবের কাছে এবং গ্যালারি থেকে নামিয়ে এনে সুযোগ করে দেন জয়ের আনন্দ দলের প্রত্যেকটি খেলোয়াড়ের সঙ্গে উদযাপনের।
ফিরতে চাইলেন দক্ষিণ আফ্রিকার একটি স্মৃতিতে। কনকনে ঠাণ্ডা আবহাওয়া, এর মধ্যেই শোয়েব রং মাখলেন খালি গায়ে। দেশের জন্য গর্জে যেতে লাগলেন ঠাণ্ডা উপেক্ষা করে। তা দেখে নিজের গায়ে থেকে জ্যাকেট খুলে শোয়েবকে পরার জন্য দিয়ে দেন অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। এটিও যেন ভোলার মতো নয়, তেমনি ভোলার মতো নয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভিডিও কলে যোগ দেওয়ার স্মৃতিটাও। গতবছর ইংল্যান্ডে আয়োজিত পার্লামেন্ট ক্রিকেট বিশ্বকাপের ফাইনালে বাংলাদেশের এমপিদের উত্সাহ দিতে শোয়েব পৌঁছে গেলেন ময়দানে। খেলার আগ মুহূর্তেই ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল প্রধানমন্ত্রীকে ভিডিও কলে যুক্ত করে মোবাইল ধরিয়ে দেন শোয়েবের হাতে। প্রতিমন্ত্রীর এমন উপহারে রীতিমতো আশ্চর্য্য শোয়েব নিজেই। ‘প্রধানমন্ত্রীকে ভিডিও কলে বলেছিলাম দোয়া করবেন যেন ট্রফি নিয়েই আমরা ফিরতে পারি।’—বলেন শোয়েব।
শুধু আনন্দের নয়, রয়েছে হয়েছেন বেদনার স্মৃতিরও সাক্ষী। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ইতিহাসে বদলে যাওয়া বাংলাদেশের সাক্ষী হয়ে থাকা লাল-সবুজের এই আইকনিক সমর্থক নিজ চোখে দেখেছেন বেদনাদায়ক হারও। দেশকে সমর্থন দিতে গিয়ে শ্রীলঙ্কার মাটিতে শ্রীলঙ্কার সমর্থকদের থেকেই শিকার হয়েছেন হামলার। এ রকম হাজারো স্মৃতি রেখেছেন আগলে, রাখতে চান আজীবন।
খোঁজ নেন তারাও!
কেমন সাড়া দেন দেশের হলে খেলা ক্রিকেট যোদ্ধারা? শোয়েব বলেন, ‘প্রতিটি ক্রিকেটারেরই বেশ ভালো সম্পর্ক রয়েছে, এটা একজন সমর্থক হিসেবে অবশ্যই আমার অর্জন।’ তারা নিয়মিত খোঁজ নেন শোয়েবের, দেন উত্সাহও। দেখা হলে ভোলেন না কুশল বিনিময় করতেও। জাতীয় দলের খেলোয়াড় মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ, তামিম ইকবালসহ বেশ কয়েকজন রাখেন নিয়মিত খোঁজখবর। শুধুই কী দেশের গণ্ডিতে? তালিকায় রয়েছে বিদেশি ক্রিকেটারদেরও নাম। তালিকা থেকে বাদ যায়নি ভারতের মারকুটে ওপেনিং ব্যাটসম্যান রোহিত শর্মার নামও! প্রতিটি বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচেই শোয়েবের খোঁজখবর নেন অন্যতম সেরা এই ব্যাটসম্যান। সর্বশেষ গতবছর ভারতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-ভারত সিরিজে শোয়েব সমগ্র স্টেডিয়ামে প্রবেশের কার্ড দেন রোহিত। রোহিতের এমন ভালোবাসায় আনন্দের যেন সীমা নেই এই টাইগার ভক্তের। ‘যখনই আমাদের দেখা হয়, রোহিত ভাই বলেন কোনো অসুবিধা হলে তাকে জানাতে। একজন অন্যতম বিশ্বসেরা ব্যাটসম্যান থেকে এমন আচরণ আমাকে অনেক মুগ্ধ করে।—যোগ করেন শোয়েব।
সঙ্গী যখন বন্ধু সুধীর
গায়ে ভারতের পতাকার রঙে নিজেকে মিশিয়ে একহাতে শঙ্ক, অন্যহাতে ভারতের পতাকা। হয়তো বুঝেই গেছেন ব্যক্তিটি কে! শোয়েবের ন্যায় ভারতীয় সমর্থক সুধীর কুমার গৌতম। যাকে দেখেই শোয়েবের বাঘের অবয়বে নিজেকে গড়ে তোলার অনুপ্রেরণা। সেই অনুপ্রেরণা, অনুসরণীয় ব্যক্তিটি যখন বন্ধু, কেমন লাগে! সুধীর-শোয়েবের বন্ধুত্বের গল্পটা হয়তো অনেকেরই জানা। মাঠে বাংলাদেশ-ভারত যতই প্রতিদ্বন্দ্বী হোক না কেন, আঁচ লাগে না সুধীর-শোয়েবের বন্ধুত্বে। বয়সে সুধীর বড় হলেও বয়স-জাতি-ধর্ম-বর্ণ ভুলে তাদের বন্ধুত্বটা যেন ছাপিয়েছে সব কিছুকেই। মাঠে দু’জন দু-দলের সমর্থক হলেও দিনশেষে যেন বন্ধুত্বটাই বড়। তাইতো আর্দশ বন্ধুর মতো এগিয়ে আসেন এক অন্যের সমস্যায়। একবার ভারতের সমর্থকরা শোয়েবকে মারার ইশারা করলে বন্ধুকে নিরাপত্তা দিতে শোয়েবকে গভীর রাতে হোটেলে পৌঁছে দেন সুধীর। সর্বশেষ বাংলা-ভারত সিরিজে বন্ধু শোয়েবকে সঙ্গ দিতে নিজের বিমানের ফ্লাইট ছেড়ে শোয়েবের সঙ্গে রওনা দেন ট্রেনে করে। এই বন্ধুত্বের আছে আরও হাজারো টুকরো টুকরো গল্প।
৭ লাখেরও বেশি ঋণের বোঝা
এতক্ষণ শোনা হলো শোয়েবের ক্রিকেটপ্রেমের গল্প। তবে এ ক্রিকেট প্রেমের পেছনের গল্পটা যে আছে আড়ালেই। শোয়েব আলীর ব্যাপারে আমাদের সবারই ধারণা, তার সকল খরচ বহন করে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। তবে দুঃখজনক হলেও এটাই সত্য যে, ৮ বছরের পথচলায় ২০১২ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত সকল অর্থ বহন করেছেন নিজ থেকেই। পরবর্তী সময়ে পৃষ্ঠপোষ্ঠকতা পেলেও তার মধ্যে কিছু পৃষ্ঠপোষ্ঠক কোম্পানি এখনও টাকা না দিয়ে হয়রানি করে যাচ্ছেন শোয়েবকে। চুক্তির টাকা খুঁজতে এখনও প্রতি সপ্তাহে তাদের অফিসে যান শোয়েব। তবে আইনি কিংবা গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে আসছেন না কেন? হয়তো বা বিষয়টা ওঠে এলে টাকাগুলো আর পাওয়াই হবে না, সঙ্গে আরও নানা বিষয় চিন্তা করেই এখনও আছেন চুপ।
পেশায় একজন গাড়ি মিস্ত্রি ছিলেন শোয়েব, ছিলেন একটি ওয়ার্কশপের মালিক। দেশ-বিদেশে খেলা দেখতে বিক্রি করেছেন সবকিছুই। বিদেশের মাটিতে দেশের পতাকা ওড়াতে বিক্রি করেছেন নিজের ২টি গাড়ি। নিজের সব বন্ধুরা ভালো অবস্থানে, পারতেন শোয়েবও। তবে ক্রিকেট এবং দেশের ভালোবাসায় যে বিসর্জন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন নিজের ভালো থাকা। বিলাসিতার বিপরীতে ভালোবেসেন লাল-সবুজের ক্রিকেটকে। বিশ্বকাপসহ অন্যান্য সফরের জন্য বাধ্য হয়ে নিয়েছেন ঋণ। পরিমাণটাও অল্প নয়। বর্তমানে ঋণে কিনেছেন গাড়ি, ওটার অর্থ ছাড়াও রয়েছে ৭ লাখের বেশি ঋণের বোঝা! শোয়েব বলেন, ‘ক্রিকেট আর দেশের জন্য এই অবস্থাতে। তবে আমার কোনো কষ্ট নেই। অনেকেই অনেক কথা বলে, তবে আমার আক্ষেপ নেই।’
বাঘের অবয়বে শোয়েব গর্জে নামের পূর্বে যুক্ত হয়েছে টাইগার। স্টেডিয়াম কিংবা রাস্তায় দেখা হলেই সবাই ঘিরে ধরেন শোয়েবকে, ভোলেন না মুঠোফোনবন্দি করতেও। মানুষের ভালোবাসাতেও খুঁজে পান নিজেকে এগিয়ে নেওয়ার শক্তি, লাল-সবুজের পতাকা ওড়ানোর শক্তি। তাইতো পেয়েছেন ‘গ্লোবাল স্পোর্টস ফ্যান অ্যাওয়ার্ড ২০১৯’। যদিও ভিসা জটিলতায় তা গ্রহণ করতে পারেননি ইংল্যান্ডে উপস্থিত থেকে। এই অর্জন, ভালোবাসার সামনে যেন পরাজিত হয় শোয়েবের আর্থিক অবস্থাও। আগামীর লক্ষ্যটা তবে কী? নিঃসন্দেহে জানিয়ে দিলেন ক্রিকেটের ২২ গজের ময়দান। বাংলাদেশ ক্রিকেট এবং লাল-সবুজের পতাকার সঙ্গে অবিরাম গর্জে যেতে চান ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’ চিত্কারে।
