কঠিন পাথরের রত্ন নয়, বরং নরম তুলোয় তৈরি এক অমূল্য ধন এই জামদানি। এতে শিল্পীর হাতের ছোঁয়ায় এমনই অসামান্য কারুকাজ খচিত হয়—যার সৌন্দর্যে বিমোহিত হতেই হয়। শাড়ির সৃজনশীলতার ইতিহাসে জামদানি এক অপার বিস্ময়!
শাড়ির ইতিহাস সাড়ে পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো। জামদানি শাড়ির ইতিহাসও কম পুরোনো নয়। শাড়ি শব্দের উত্স সংস্কৃত ‘শাটী’ শব্দ থেকে, অন্যদিকে জামদানির উল্লেখ পাওয়া যায় আনুমানিক ৩০০ খ্রিষ্টাব্দে কৌটিল্য রচিত ‘অর্থশাস্ত্র’ গ্রন্থে। খ্রিষ্টীয় চতুর্দশ শতাব্দীতে মরক্কোর বিখ্যাত পর্যটক মুহাম্মাদ ইবনে বতুতা তাঁর বর্ণনায় বাংলাদেশের সূক্ষ্ম সুতির কাপড়ের প্রশংসা করেন। তারপরে ষোড়শ শতকের শেষ দিকে ইংরেজ ব্যবসায়ী ও পর্যটক রালফ ফিচ এবং ঐতিহাসিক আবুল ফজল তাঁদের নিজ নিজ বিবরণে বাংলার মসলিন ও জামদানির সূক্ষ্মতার তারিফ করেছেন। আর মোঘল আমলেই সবচেয়ে বেশি প্রসার হয় জামদানিশিল্পের।
মোঘল আমল থেকে শুরু করে ইংল্যান্ডের রানি, কে না তারিফ করেছেন জামদানির নান্দনিকতার! আর এখন বাংলাদেশের যেসব নারী শাড়ি পছন্দ করেন, তাঁদের সংগ্রহে অন্তত একটি হলেও জামদানি শাড়ি থাকে। কারণ নান্দনিক ডিজাইন এবং দামে বেশি হওয়ার কারণে জামদানির সঙ্গে আভিজাত্য এবং রুচিশীলতা জড়িয়ে আছে এই শাড়ির তনুদেশে। আনন্দের ব্যাপার হলো, ঐতিহ্যবাহী নকশা ও বুননের কারণে ২০১৬ সালে জামদানিকে বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো।
জামদানি শাড়ি তাঁতিরা হাতে বুনন করেন বলে এগুলো তৈরি করা অনেক কষ্টসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ। একটি জামদানি শাড়ি তৈরি করতে দুইজন কারিগর যদি প্রতিদিন ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা শ্রম দেন, তাহলে ডিজাইন ভেদে পুরো শাড়ি তৈরি হতে সাত দিন থেকে ছয় মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। জামদানির মান মূলত কাজের এই সূক্ষ্মতার উপর নির্ভর করে। আর শাড়ি কতোটা সূক্ষ্ম হবে, তা নির্ভর করে এই সুতা এবং তাঁতির দক্ষতার উপর। সাধারণত যে শাড়িটা কাজ যত সূক্ষ্ম, স্বাভাবিকভাবেই তার দামও তত বেশি হয়ে থাকে। আবার সুতা যত চিকন, শাড়ি বুনতে সময়ও লাগে তত বেশি—দামও বেশি পড়ে।
মজার ব্যাপার হলো, একসময় নারীদের জামদানি কাপড় বুনতে দেওয়া হতো না। মনে করা হতো, মেয়েদের জামদানি বয়ন করা শেখালে বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি গিয়ে তাঁরা জামদানি বুনতে শুরু করবেন। এতে ব্যবসা বেহাত হয়ে যাবে। জামদানি কাপড় বোনার জন্য হাতে সুতা তৈরি করা হতো। স্থানীয় পদ্ধতিতে তৈরি সরল তাঁতযন্ত্রে এখনো হাতেই বোনা হয় জামদানি। জামদানি কাপড় তৈরির জন্য যে তাঁত ব্যবহার করা হয়, তার স্থানীয় নাম ‘পডি’। জামদানিতে নকশা তোলার জন্য মহিষের শিং দিয়ে তৈরি কাণ্ডুল ব্যবহার করা হয়; যদিও এখন প্লাস্টিকের কাণ্ডুল বাজারে পাওয়া যায়। জামদানি শাড়ির পাড়ের নকশার নামে শাড়ির নামকরণ করা হয়। জামদানি একান্তই ঢাকার, একান্তই বাংলাদেশের।
এমনিই অপূর্ব সব তথ্য আর ছবিতে ফুটে উঠেছে গবেষক মালেকা খানের জামদানি বিষয়ক বই ‘জামদানি : বাংলাদেশের বিশ্বনন্দিত ঐতিহ্য’-এ। ‘অনন্যা প্রকাশ’ থেকে প্রকাশিত গ্রন্থটি ইতিহাস সচেতন পড়ুয়াদের জন্য অবশ্যপাঠ্য।
