সড়কবাতি নাই, বাড়িতেছে ছিনতাই

আপডেট : ০১ মার্চ ২০২০, ২১:৪৩

রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকার সড়কে ল্যাম্পপোস্ট আছে, বাতি নাই। নিকষ অন্ধকার নগরীর এমন বেশ কিছু এলাকার অলিগলিতে ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ বাড়িতেছে। গত শুক্রবার সন্ধ্যা হইতে শনিবার ভোর পর্যন্ত ডিবির সকল বিভাগ একসঙ্গে অভিযান চালাইয়া রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা হইতে ৪২ জন এই রকম চিহ্নিত ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করিয়াছে। তাহারা সকলেই পেশাদার ছিনতাইকারী এবং অনেকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় মামলাও আছে। তাহাদের নিকট হইতে ছিনতাই হওয়া ৮৫টি মোবাইল ফোনসেট, চাপাতি ও ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করা হইয়াছে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার গলিঘুপচিতে, অন্ধকার জায়গাগুলিতে এইরকম ছিনতাই নৈমিত্তিক ঘটনা। মানুষ প্রাণ হাতে নিয়া চলাচল করে, যে কোনো মুহূর্তে তাহাদের উপর হামলাইয়া পড়ে পেশাদার ছিনতাইকারীরা। তবে শুধু বাতিবিহীন অলিগলিতেই এই রকম ঘটনা ঘটিতেছে এমন বলা যাইবে না। গত বত্সরের জুলাইয়ে পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত মালিবাগ-মৌচাক-মগবাজার ফ্লাইওভার উদ্বোধনের দুই বত্সর পার না হইতেই পুরা ফ্লাইওভারটি রাতের বেলা আলোহীন হইয়া আছে। কোনো সড়কবাতি না থাকায় অন্ধকারেই ঝুঁকি নিয়া চলে যানবাহন। একই সঙ্গে ঝুঁকি বাড়িয়াছে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের। ফ্লাইওভারের উপর গলা কাটিয়া এক মোটরবাইক চালককে হত্যার ঘটনাও ঘটিয়াছে। উদ্বোধন সমাপান্তে ফ্লাইওভারটি সিটি করপোরেশনকে বুঝাইয়া দেওয়ার পর হইতেই রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বাতি ও তার চুরি হইতে থাকে। তবে সড়কে কেবল বাতি ও তার চুরির ঘটনাই ঘটিতেছে না। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে লাইট ভাঙিয়া ছিনতাইয়ের ফাঁদও পাতা হয়। যেমন, গাবতলী হইতে হাজারীবাগ পর্যন্ত বেড়িবাঁধ সড়কে একটি বাতিও জ্বলে না। লক্ষ্য করিলেই বুঝা যাইবে, লাইট ভাঙিয়া ছিনতাইয়ের ফাঁদ পাতিয়াছে সংঘবদ্ধ চক্রগুলি। স্থানীয়রা জানান, বিভিন্ন সময় ঢিল ছুড়িয়া লাইটগুলো ভাঙিয়া ফেলা হইয়াছে। উদ্দেশ্য, সন্ধ্যার পর ছিনতাই করা। দিনের আলো নিভিয়া গেলে বেড়িবাঁধ সড়কে বাড়ে গাড়ির চাপ। সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজটের। অনেক সময় কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয় এই যানজট। ভোগান্তি এড়াইতে অনেকেই গাড়ি হইতে নামিয়া হাঁটিয়া রওয়ানা হন। আর সেই সুযোগটাই নেয় ছিনতাইকারীরা। বেড়িবাঁধের পাশের বিভিন্ন গলির মুখে তাহারা ওত পাতিয়া থাকে। সুযোগ বুঝিয়া পথচারীদের ভয় দেখাইয়া গলির ভিতর নিয়া অনায়াসেই ছিনতাইকারীরা হাতাইয়া নেয় পথচারীদের টাকাপয়সা ও মূল্যবান জিনিসপত্র। আর প্রধান ছিনতাইকৃত দ্রব্য হইল মোবাইল ফোন। সেগুলি কোথায় যায় তাহা তদন্ত করিয়া ডিএমপি দেখিয়াছে, ছোটোখাটো যেই সকল মোবাইল ফোন সেটের যন্ত্রাংশের দোকান আছে তাহারাই এই সকল চোরাই ফোনসেট ক্রয় করে। বসুন্ধরা ও মোতালেব প্ল­াজার অনেক দোকানদার এই সকল ছিনতাইকারী চক্রের ইন্ধনদাতা। তবে তাহারা সরাসরি ফোনসেটগুলি মানুষের কাছে বিক্রয় করে না। বিক্রয় করা হয় আলাদা যন্ত্রাংশ হিসাবে। এইভাবে বিক্রয় করিলে যে লাভ হয় তাহা পূর্ণাঙ্গ সেট বিক্রয় করিলেও হয় না।

ফলে দেখা যাইতেছে, রাজধানীর সড়কগুলিতে তার ও বাতি চুরি, বাতি ভাঙিয়া ফেলা ও ছিনতাই, এবং সেগুলি বিক্রয়ের জন্য ছোটো ছোটো দোকানদারের যোগসাজশে অসংখ্য অপরাধ চক্র গড়িয়া উঠিয়াছে। আর তাহাদের দৌরাত্ম্যে একদিকে পথচারীদের জানমালের নিরাপত্তাহীনতা বাড়িয়াছে, আর অন্যদিকে ছিনতাইকারী চক্রগুলিকেও বেপরোয়া করিয়া তুলিয়াছে। ছিনতাইকারীরা এমনকি জীবন নাশ করিতেও দ্বিধা করিতেছে না। তাই আমরা চাইব, রাজধানীর সড়কগুলিতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করিতে হইবে, সেগুলির যেন তছরুপ না হয় সেই ব্যবস্থাপনাও জোরদার করিতে হইবে এবং প্রতিদিন তাহা তদারক করিতে হইবে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের যে ১০টি অঞ্চল রহিয়াছে, তাহার কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সতর্ক ও দায়িত্বশীল হইতে হইবে। বিদ্যুতের বিল বকেয়া থাকিলে পরিশোধ করিতে হইবে, সংযোগ কাটা থাকিলে নূতন করিয়া সংযোগ দিতে হইবে। সেই সঙ্গে নিয়মিত অভিযান চালাইয়া ছিনতাকারী ও অপরাধ চক্রগুলিকে নিরস্ত করাও আবশ্যক।