সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত
‘আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে’—রবীন্দ্রনাথ স্থির করে গিয়েছিলেন যে, প্রতি বছর দোলপূর্ণিমার উত্সবের দিনে শান্তিনিকেতনে বসন্ত উত্সব হবে। তিনি তার জীবদ্দশায় এই উত্সবে অনেক বার অংশ নিয়েছিলেন। এই উত্সবে বিশ্বভারতীর ছাত্রছাত্রীসহ শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং চীন, জাপান, বাংলাদেশসহ যেসব বিদেশি শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা করে গেছেন তারাও বিদেশ থেকে এসে এই উত্সবে যোগ দিয়ে আবির খেলায় মেতে উঠতেন। তাই কবি এই বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে রবীন্দ্রভক্তরা এসে এখানে সারা দিন আবির মেখে গানবাজনা ও নৃত্যের মধ্য দিয়ে বসন্ত উত্সব উদ্যাপন করতেন। গুরুদেব চেয়েছিলেন এই শুভ দিনটিতে বিশ্বের কাছে তার ইপ্সিত মহামিলনের বার্তা পৌঁছে দিতে। গত ২১ ফেব্রুয়ারি বিশ্বভারতীর বাংলাদেশ ভবনে বাংলাদেশ সরকার একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন।
কিন্তু আগামী ৯ মার্চ দোল উত্সবের দিনে বিশ্বভারতীতে এই উত্সব পালন না করার জন্য বিশ্বভারতীর বর্তমান উপাচার্য এক নির্দেশিকা জারি করেছেন। এ নিয়ে জোর জল্পনাকল্পনা চলছে। কারণ উপাচার্য যে অজুহাত দেখিয়েছেন তা হলো গত বছর উত্সবের পর এলাকাটি নোংরা হয়েছিল এবং কিছু খালি মদের বোতল পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু শান্তিনিকেতনের আশ্রমিক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এই কারণের জন্য উত্সব বন্ধ হোক তা চাইছেন না। ভারতের সংবিধান অনুযায়ী যিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী থাকবেন তিনিই হবেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য। প্রথমে জওহর লাল নেহেরু তারপর লালবাহাদুর শাস্ত্রী, ইন্দিরা গান্ধী, মোরারজি দেশাই, মনমোহন সিং সকলেই এখানে আচার্য হিসেবে সমাবর্তন উত্সবে যোগ দিয়ে গেছেন। দুই বছর আগে সমাবর্তন উত্সবে যোগ দিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদিও। তখন প্রচণ্ড বিশৃঙ্খলা হয়েছিল। প্রতি বছরই সমাবর্তন উত্সব হতো পৌষ মাসে; একাধিক বার পেশাগত কারণে সমাবর্তনে ইন্দিরা গান্ধীর ভাষণ শুনেছি। তিনি বলতেন–বিশ্বভারতী পরিচালনা করার সময় গুরুদেব আর্থিক অনটনে পড়েন তখন তিনি পিতাজিকে অনুরোধ করেছিলেন আর্থিক সাহায্যের জন্য। তখন জওহর লাল নেহেরু গুরুজিকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, দেশ স্বাধীন হবার পর বিশ্বভারতী পরিচালনার সব দায়দায়িত্ব ভারত সরকার নেবে। ১৯৪৮ সালে ভারতের সংসদে আইন করে বিশ্বভারতীর সব দায়ভার ভারত সরকার নিয়ে নেয়। সেই থেকেই বিশ্বভারতীর পরিচালনার সব ভার কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর হাতে।
গত বছরের বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হয় শান্তিনিকেতনের বোলপুর শহরে। এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যে অজুহাতই দিক না কেন, বীরভূম থেকে নির্বাচিত মমতা মন্ত্রিসভার দুই মন্ত্রী ড. আশীষ বন্দ্যোপাধ্যায় আর চন্দ্রনাথ সিংহ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন—বসন্ত উত্সব প্রথামাফিক দোলপূর্ণিমার দিনই হবে। ২০১৯ সালে দোলপূর্ণিমার দিন দেশ-বিদেশ থেকে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ এসেছিলেন এই বসন্ত উত্সবে যোগ দিতে। পশ্চিমবঙ্গের উচ্চ শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, বসন্ত উত্সবের দিন বসন্ত উত্সব হবে আর এ ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গ সরকার সব রকম সাহায্য করবে। দোলের দিন এই বসন্ত উত্সবের সঙ্গে অনেকের আবেগ জড়িয়ে আছে। সুতরাং বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ যা-ই মনে করুন না কেন, ৯ মার্চ দোলপূর্ণিমার দিন বসন্ত উত্সব থেকে পিছিয়ে এলে বাংলার একটি ঐতিহ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একেই তো গুরুদেবের শান্তিনিকেতন নিয়ে বেশ কিছু বিশৃঙ্খলা চলে আসছে। প্রায় ২৫ বছর আগে ১৯১৩ সালে পাওয়া গুরুদেবের নোবেল পুরস্কারটি চুরি হয়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গ তথা দেশের বাঘা বাঘা গোয়েন্দারা ঐ নোবেলটি খুঁজে পাবার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যান। দীর্ঘদিন তল্লাশি চালাবার পর সিবিআই হাত গুটিয়ে নিয়ে বলেন, ‘আমরা পারছি না।’ তখন পশ্চিমবঙ্গে বিরোধী দলনেতা ছিলেন সূর্যকান্ত মিশ্র। তিনি তৃণমূলকে কটাক্ষ করে বলেছিলেন—‘আপনারা তো জানেন, নোবেল কোথায় আছে। বের করে দিন না’। তারপরই বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যায়।
এদিকে রবীন্দ্রনাথের আদর্শ একের পর এক ভাঙছেন বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ ও কেন্দ্রে মোদি সরকার। সম্প্রতি শান্তিনিকেতনের উপাসনাগৃহে এবার হিন্দিতে রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া নিয়ে বিভিন্ন মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেন এমন ঘটনা ঘটল, সেই প্রশ্নও তুলেছেন অনেকেই। প্রবীণ আশ্রমিক তথা ঠাকুর পরিবারের সদস্য সুপ্রিয় ঠাকুর স্পষ্টভাবেই বলেছেন, কোনো দিনও উপাসনায় হিন্দি ভাষার ব্যবহার দেখিনি। আমার মনে হয়, এটা করা উচিত হয়নি। আর এক প্রবীণ আশ্রমিক সোমেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ও বলেছেন, আমার সত্তর বছরের জীবনে আমি কখনো উপাসনায় হিন্দি ভাষায় রবীন্দ্রসংগীত শুনিনি, আমার মনে হয় উপাসনার রীতি ভেঙে হিন্দি ভাষার প্রয়োগ করা ঠিক নয়।
শান্তিনিকেতনে উপাসনাগৃহে আচার্যের বসার জন্য নির্দিষ্ট বেদি রয়েছে। সেই বেদিতে বসেই আচার্য মন্দিরের উপাসনা পরিচালনা করে থাকেন, বিশ্বভারতীর হিন্দি ভবনের অধ্যাপিকা মঞ্জুরানী সিংহ উপাচার্য বিদ্যুত্ চক্রবর্তীর উপস্থিতিতেই হিন্দিতে নিজের পাঠ করেন এবং সংগীত ভবনের ছাত্রীরা ‘ধ্বনিল আহ্বান...’ এবং ‘ঐ আসন তলে...’ গান দুটির হিন্দি অনুবাদ পরিবেশন করেন। ঐ ছাত্রীরাও জানিয়েছেন, তারা বাংলাতেই গান দুটি গাওয়ার প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু তাদের গান দুটি হিন্দিতে গাইতে বলে জানিয়ে দিয়ে তার হিন্দি অনুবাদ তাদের ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাই এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিতর্ক শুরু হয়েছে। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বর্তমানে ভারতের শাসক দল নানা কৌশল অবলম্বন করে চলেছে। কৌশলের অন্যতম কারণ কী? রবীন্দ্রনাথ বাঙালি ছিলেন? নাকি বিশ্বকবি ছিলেন? এটা নিয়ে সারাদেশে আলোচনা হচ্ছে।
২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার আগে বিশ্বভারতীতে কোনো ছাত্র ইউনিয়ন ছিল না। ছাত্র ফেডারেশনের (কমিউনিস্টদের) একটি ছোটো সংগঠন ছিল। কিন্তু বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরে অখিল ভারতীয় বিদার্থী পরিষদ অখণ্ড ছাত্র সংগঠন বিশ্বভারতী দখল করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে আর মদত পাচ্ছে দিল্লি থেকে। এ অভিযোগ শিক্ষার্থী ও শিক্ষাবিদদেরও। তাই প্রাক্তন উপাচার্য রজতকান্ত রায় ও আরো কয়েকজন শিক্ষাবিদ অভিযোগ করেছেন যে, বিশ্বভারতীতে রবীন্দ্রচর্চা না করে হিন্দুত্ববাদের চর্চার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, এটা খুবই দুর্ভাগ্যের। কেউ কেউ উপহাস করে বলেন, গুরুদেব বেঁচে থাকলে জাতীয় সঙ্গীত থেকে গুজরাটের নামই তিনি বাদ দিয়ে দিতেন। এটা উপহাসের কথা হতে পারে কিন্তু যেভাবে বিশ্বভারতীর বিদ্যার্থী পরিষদের অভিযোগের ভিত্তিতে দিল্লি বাংলাদেশের কুষ্টিয়ার অপ্সরা, অনিকা মেমকে ভারত ছাড়ার নোটিশ দিয়েছেন। তার অপরাধ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য ছাত্রসংগঠনগুলো যখন সিএএ ও এনআরসি নিয়ে মিছিল করছিল তখন সেই মিছিলে এসে তিনি যোগ দিয়েছিলেন। তাকে যে নোটিশ দেওয়া হয়েছে তাতে বলা হয়েছে—পড়াশুনার জন্য ভারত সরকার তাকে ভিসা দিয়েছে, আন্দোলনে যোগ দেওয়ার জন্য নয়। আরো বলা হয়েছে ঐ নোটিশে যে, তিনি যদি ঐ নোটিশ মেনে ১৫ দিনের মধ্যে ভারত ত্যাগ না করেন তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভারতীয় বিদেশি আইনের আওতায়।
ঘটনার সূত্রপাত আরএসএস সদস্য স্বপন দাশগুপ্ত বিশ্বভারতীতে এসে সিএএর পক্ষে ভাষণ দিচ্ছিলেন তখনিই স্বপন বাবু শাসিয়ে গিয়েছিলেন—তিনি দিল্লিতে ফিরে গিয়ে ঐ বাংলাদেশি ছাত্রীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবেন। তিনি কথা রাখলে এই বাংলাদেশি ছাত্রীকে হয়তো দেশে ফিরে যেতে হবে। কলকাতা হাইকোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী শামিম আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, অপ্সরার বিষয়টি খুবই দুর্ভাগ্যজনক। তিনি দু-এক দিনের মধ্যেই কলকাতা হাইকোর্টে একটি মামলা রুজু করবেন। ভারতের সিএএ আইনের বিরুদ্ধে আমেরিকা, ইংল্যান্ড, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত ভারতীয় ছাত্রছাত্রীরা বিক্ষোভ দেখিয়েছেন, কিন্তু সেসব দেশ থেকে কোনো ভারতীয় ছাত্রছাত্রীকে বিতাড়িত করা হয়নি। অপ্সরাকে তাড়ানোর ব্যাপারে বাংলাদেশেও ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে বলে এখানকার শিক্ষাবিদমহল মনে করেন। বিশ্বভারতীতে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বহু ছাত্রছাত্রী এসে পড়াশুনা করেন।
৯ মার্চ দোল পূর্ণিমার দিনে বসন্ত উত্সব হবে কি না, তা এই লেখা পর্যন্ত জানা যায়নি। অপেক্ষা ছাড়া উপায় নেই। শুরু করেছিলাম গুরুদেবের কথায়—বসন্ত আরাধনা দিয়ে আর শেষ করছি গুরুদেবের কথায়—‘নীল দিগন্তে ফুলের আগুন লাগল’। সত্যি কি এবার বিশ্বভারতীর প্রাঙ্গণে আবিরে রাঙানো ফুলের আগুন লাগবে?
n লেখক : পশ্চিমবঙ্গের প্রবীণ সাংবাদিক
