মোহাম্মদ আব্দুল আলিম
আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যত্। একদিন শিশুরাই দেশ ও সমাজ এবং পরিবারে আশার আলো জ্বালাবে। বর্তমান বিশ্বে অধিকহারে চর্চিত হচ্ছে ভার্চুয়াল বিনোদন কিন্তু সমভাবে চর্চিত হচ্ছে না প্রাকৃতিক বিনোদন। যার কারণে শিশুরাও প্রাকৃতিক বিনোদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যার ফলস্বরূপ শিশুর উত্কর্ষতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
শিশু হলো ভূমিষ্ঠকালীন ব্যক্তির প্রাথমিক রূপ। যে এখনো যৌবনপ্রাপ্ত হয়নি কিংবা বয়ঃসন্ধিক্ষণে প্রবেশ করেনি তাকে শিশু বলা হয়। বিনোদন বলতে আমরা বুঝি যা আনন্দ প্রদান করে। মানুষ বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে আনন্দ উপভোগ করে থাকে। বেশির ভাগই পরিচিত হলো—গল্পবলা, সংগীত, খেলাধুলা, ভ্রমণ, নাটক, চিত্র, নৃত্য ইত্যাদি।
বর্তমান সমাজে বিনোদন বলতে আমরা বুঝি শুধু চিত্তবিনোদন। কেননা যখন বিপুল পাঠ্যবই আর ঘন ঘন পরীক্ষার চাপে শিশুরা শারীরিক ও মানসিকভাবে পিষ্ট হয়। তখন অভিভাবক পড়াশোনার চাপ থেকে সন্তানকে একটু স্বস্তি দিতে বা শিশুর বিনোদনের প্রয়োজন মনে করে টিভির সামনে বসিয়ে দেন বা তাদের হাতে মাল্টিমিডিয়া মোবাইল ধরিয়ে দেন তথা ভার্চুয়াল জগতে প্রবেশ করিয়ে দেন। এতে শিশুরা কিছুক্ষণের জন্য বিনোদন পায় তবে এর মাধ্যমে শিশুর শারীরিক ও মানসিক কোনো উপকার হয় না। যার কারণে তাদের শারীরিক ও মানসিক উত্কর্ষতা বৃদ্ধি না পেয়ে বরং হ্রাস পায়। শিশুদের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বাংলাদেশে ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলেছে। ১৫-১৯ বছর বয়সি জনগোষ্ঠী যারা বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর আট শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে, তাদের মধ্যে প্রায় ৩.৩ শতাংশ নিয়মিতভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করে।
ইন্টারনেট ব্যবহারের ভালো দিক থাকলেও, শিশুদের জন্য এতে বেশকিছু ঝুঁকিও রয়েছে। কিছু ঝুঁকি তাদের শুধু ক্ষতিই করবে না বরং তাদেরকে অনৈতিক কাজে জড়িয়ে ফেলবে। এসবে জড়ানোর ফলে সে একা হয়ে যায়। সামাজিকতার বাইরে চলে যায়। এসবের কারণে তারা বড়ো হয় চার দেয়ালের মাঝে। যার ফলস্বরূপ শিশুর মেধাবিকাশে বাধাগ্রস্ত হয়। সামাজিক জীব হিসেবে বেড়ে উঠতে দিতে হলে এবং শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বৃদ্ধি করতে হলে শিশুদের মাঠে খেলতে দিতে হবে এবং অন্য শিশুর সঙ্গে মিশতে দিতে হবে। কবিতা, গান, বিতর্ক প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করতে হবে। অল্প বয়স থেকেই নানারকম সামাজিক কাজে শিশুদের যুক্ত করা যেতে পারে। পরিচ্ছন্নতা অভিযান, শীতবস্ত্র সংগ্রহ ও বিতরণ, গাছ লাগানো ইত্যাদি সহশিক্ষামূলক বিনোদনে যুক্ত হওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। আর বিনোদন মানুষের অসহায়ত্ব দূর করে। শিশু মনোবিজ্ঞানীরাও তাই বলেন। শিশুরা বিস্তৃত পরিবেশে নিজেকে প্রকাশ করতে পারে তেমনি নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারে, খেলাধুলার নানা শৃঙ্খলা ও নিয়ম তাকে শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয় শেখায়। কোনো সমস্যা থেকে উত্তরণের পথও সে জানতে পারে খেলাধুলার মাধ্যমে। তাই শিশুদের যদি সব সময় ঘরে আবদ্ধ রেখে ভার্চুয়াল বিনোদনের মধ্যে রাখা হয় তথা শুধু টিভি, অনলাইন বা কম্পিউটার বিনোদনের মধ্যে রাখা হয় তাহলে সে বিচ্ছিন্ন জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে। পরবর্তীতে জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে অক্ষম হয়ে পড়বে। তার জন্য প্রয়োজন প্রাকৃতিক বিনোদন।
শিশুরা সবচেয়ে বেশি আনন্দ পায় যখন তারা বন্ধুদের সঙ্গে থাকে এবং পরস্পর খেলা করে। কিন্তু দুঃখের বিষয় বর্তমানে মাঠ পাওয়া দুষ্কর। রিপোর্ট অনুযায়ী ৬৭ শতাংশ শিশুর বাড়ির কাছাকাছি খেলাধুলা করার কোনো সুযোগ নেই, ৩৭ শতাংশ শিশু ঘরের মধ্যে খেলাধুলা করে, ২৯ শতাংশ শিশু কোনো খেলাধুলাই করে না। মাঠ না থাকার অজুহাতে শিশুদের বিনোদনে বাধা দেওয়া যাবে না। কেননা শিশু একটা খেলনা ছুড়ে ফেলল; ছুড়ে ফেলল মানে সে অবহেলা করল, তা নয়। এর মানে হলো, খেলনাটা কত দূরে পড়ে, কীভাবে পড়ে, কীভাবে শব্দ হয়, এই জিনিসগুলো শিশুকে বিনোদন দেয়। খেলা মানে শুধু দৌড়-ঝাঁপ নয়, সে খেলনা দিয়ে খেলতে পারে, পুতুল দিয়ে খেলতে পারে, নাটকে অভিনয় করতে পারে, এ সবই হচ্ছে একটি শিশুর জন্য খেলা। আর খেলাই হলো শিশুর বিনোদন। তা খেলার মাঠেও হতে পারে বা কোনো পার্কেও হতে পারে বা কোনো দর্শনীয় স্থানেও হতে পারে। বর্তমান সময়ে শহরে শিশুদের জন্য নানা ধরনের প্রাকৃতিক বিনোদনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
শিশুকে আগামী দিনের কর্ণধার হিসেবে গড়ে তুলতে হলে তাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকা প্রয়োজন। আর শিশুদের শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে প্রাকৃতিক বিনোদন প্রয়োজন। তাই সমাজ ও দেশকে আরো সুন্দর হিসেবে গড়ে তুলতে হলে শিশুদের ভার্চুয়াল বিনোদন নয় বরং প্রাকৃতিক বিনোদন প্রয়োজন।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
