শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের অধীনে কারিগরি শিক্ষার মানোন্নয়নে সম্প্রতি শেষ হয়েছে ‘স্কিলস অ্যান্ড ট্রেনিং এনহ্যান্সমেন্ট প্রজেক্ট’ (স্টেপ)। কিন্তু প্রকল্প শেষ হতে না হতেই বেরিয়ে আসছে নানা অনিয়মের চিত্র। বিভিন্ন স্থানে যে ল্যাব করা হয়েছে তার অধিকাংশই মানহীন। কোথাও কোথাও পুরোনো ল্যাবরেটরির সঙ্গে নতুন কিছু যন্ত্রপাতি যোগ করেই নতুন ল্যাবরেটরি হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রকল্প কর্মকর্তাদের কমিশন দিতে গিয়েই ল্যাবের মান ঠিক রাখা যায়নি—এমন অভিযোগ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের। ইতিমধ্যে এ নিয়ে মন্ত্রণালয়ে একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে।
জানা যায় স্টেপ প্রকল্পে মোট বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৭৮২ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বরে এই প্রকল্প শেষ হয়। প্রকল্পের একটি উপাদান ছিল সরকারি-বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে এককালীন মঞ্জুরি প্রদান। প্রথমে একেকটি প্রতিষ্ঠানকে ৯ কোটি টাকা করে মঞ্জুরি দেওয়া হলেও সর্বশেষ দেওয়া হয় ৩ কোটি টাকা করে। যে টাকায় বিভিন্ন ধরনের ল্যাবরেটরি স্থাপন, শিক্ষক প্রশিক্ষণসহ একাধিক কাজ করা হয়েছে। তবে বাস্তবে নামেমাত্র ল্যাবরেটরি স্থাপন করেই প্রকল্পের বেশিরভাগ অর্থই ভাগ-বাটোয়ারা করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ল্যাবরেটরির মালামাল ক্রয়ের জন্য ৬টি প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ করানোর পর বড়ো অংকের কমিশন দিতে হয়েছে প্রকল্পের সিন্ডিকেটেড কর্মকর্তাদের। এরপরও যদি কেউ অন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ করেছেন, তাদের বিল আটকে দেওয়া হয়েছে।
জানা যায়, প্রকল্পটিতে নানা অনিয়ম ও মালামাল সরবরাহ সংক্রান্ত অভিযোগ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও অবগত রয়েছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পভুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সরেজমিন অনুসন্ধান ও ক্রয়কৃত মালামাল সম্পর্কে প্রতিবেদন তৈরির জন্য ৩৮ কর্মকর্তার সমন্বয়ে ১১টি কমিটি গঠন করা হয়েছে। অনুসন্ধান শেষে কমিটিগুলো বর্তমানে প্রতিবেদন তৈরির কাজ করছে।
সূত্র জানায়, এস এম ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র জাল থাকায় দিনাজপুর টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রায় কোটি টাকার কাজে সর্বনিম্ন দরদাতা হওয়া সত্ত্বেও কাজ দেওয়া হয়নি। অথচ ঐ সরবারহকারীই সিন্ডিকেটের সঙ্গে অনৈতিক অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে মৃনাল কম্পিউটার নামক প্রতিষ্ঠানের কাজ পায়। জাল কাগজপত্রও ঘুষের বিনিময়ে ঠিক করেছে ঐ সিন্ডিকেট।
এমনকি সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে পুরোনো ল্যাবরেটরির সঙ্গে নতুন কিছু যন্ত্রপাতি যোগ করেই ঐ সিন্ডিকেট নতুন ল্যাবরেটরি হিসেবে দেখিয়েছে। অথচ এজন্য বড়ো অংকের বিল তুলে নিয়েছে।
জানা যায়, এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে শিক্ষকদের বিদেশে প্রশিক্ষণে পাঠানোর নামে মোটা অংকের টাকা গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি ঘুষের বিনিময়ে এক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষককে অন্য প্রতিষ্ঠানের নামেও প্রশিক্ষণে পাঠিয়েছে।
অভিযোগে জানা যায়, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (এনআইইটি), ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ এবং ওয়েস্টার্ন আইডিয়াল ইনস্টিটিউট নামের তিনটি প্রতিষ্ঠান সিন্ডিকেটের কথামতো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান দিয়ে কাজ না করানোয় প্রকল্প শেষ হওয়ার পরও তাদের বিল দেওয়া হয়নি। ওয়েস্টার্ন আইডিয়াল ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ ইঞ্জিনিয়ার মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, প্রকল্প থেকে প্রথমে তাদের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছিল এবং টাকা ভাগাভাগি করতে বলেছিল। কিন্তু আমরা শিক্ষার্থীদের জন্য একটি মানসম্পন্ন ল্যাব স্থাপনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম। এজন্য সম্পূর্ণ নিয়ম মেনে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে মেসার্স এম এইচ ইন্টারন্যাশনালকে কাজ দেই। স্টেপ প্রকল্প থেকে নানা বাধা দেওয়ার পরও তারা যথাসময়েই ল্যাব স্থাপন করে। এরপর প্রকল্প অফিস থেকে বড়ো অংকের কমিশন দাবি করে। কিন্তু সেটা না দেওয়ায় আমাদের বিল আটকে রেখেই প্রকল্প সমাপ্ত করা হয়েছে। এখন সরবরাহকারীরা আমাদের নামে উকিল নোটিশ পাঠিয়েছে, বিলের জন্য চাপ দিচ্ছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের সচিব মুনশী শাহাবুদ্দীন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, গত ডিসেম্বরে প্রকল্প শেষ হলেও এখন পর্যন্ত প্রকল্প সমাপনী প্রতিবেদন পাইনি। যদি প্রকল্পের কোনো কাজে কেউ অনিয়ম-দুর্নীতি করে থাকেন, তবে তার পার পাওয়ার সুযোগ নেই। প্রয়োজনে আমরা অনিয়মের বিরুদ্ধে আইনি সহায়তা নিব।
